মুক্তিযুদ্ধে কাজ করেছেন সংগঠক হিসেবে। তারপর পেশাগত জীবনে শুরুতে আইনজীবী। সেখান থেকে প্রশাসন ক্যাডারে গিয়ে উপসচিব হিসেবে অবসর নিলেন শেখ ফজলে এলাহী; কিন্তু অবসর নিলেন না মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করা থেকে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস এবং বিরল তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও গবেষণার কাজ করে যাচ্ছেন দিন-রাত। শেখ ফজলে এলাহী কলেজ জীবন থেকেই সাহিত্য ও গবেষণার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তাঁর লেখার হাতেখড়ি অধুনালুপ্ত দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার চাঁদের হাটে ১৯৬৪ সালে। হবিগঞ্জ থেকে ১৯৬৫ সাল থেকে মাসিক অভিমত পত্রিকা বের হয় সরকারি উদ্যোগে। ওই পত্রিকার নিয়মিত লেখক ছিলেন শেখ ফজলে এলাহী। লিটল ম্যাগাজিন, কলেজ ম্যাগাজিনে লেখা ছেপেছে। ওই সময় তিনি ছোট গল্প ও কবিতা লিখতেন। বৃন্দাবন কলেজের অধ্যাপক আবদ-আল-করীমের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে এসে তিনি আত্মনিয়োগ করেন নাটক এবং একই সঙ্গে গবেষণাধর্মী রচনায়। তাঁর প্রথম গবেষণাধর্মী রচনা প্রকাশিত হয় ১৯৭৭ সালে নিজ গ্রামের ইতিহাস নিয়ে। লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজনীতিতেও জড়িয়ে পড়েন। তিনি অন্যদের সঙ্গে হবিগঞ্জে ছাত্র ইউনিয়ন (মেনন) গ্রুপ গড়ে তোলেন এবং নিজে মনোনীত হন জেলা শাখার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে। ছাত্র হিসেবে তিনি বরাবরই মেধাবী ছিলেন। তিনি অর্থনীতি ও আইন উভয় বিষয়ে স্নাতকোত্তর এবং পরিণত বয়সে আইন বিষয়ে অর্জন করেন পিএইচডি। কর্মজীবন শুরু করেন আইনজীবী হিসেবে। ১৯৮৩ সালে যোগদান করেন বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ক্যাডারে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে হবিগঞ্জের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ এবং বিমানবন্দর থেকে তাদের উৎখাত করে সিলেট মুক্ত করার লক্ষ্যে হবিগঞ্জে সর্বপ্রথম সৈনিক, ইপিআর, পুলিশ, মুজাহিদ, আনসার ও ছাত্রদের সমন্বয়ে গঠিত হয় একটি আধা সামরিক বাহিনী। কর্নেল এম এ রবের সহযোগিতায় এই বাহিনী গড়ে তোলেন হবিগঞ্জের তদানীন্তন এমসিএ এ কে এম লতিফুর রহমান ওরফে মানিক চৌধুরী। রণাঙ্গনে এই বাহিনী পরিচালনা করেন তদানীন্তন মেজর (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল) সি আর দত্ত। পরবর্তী সময় এই বাহিনীর সঙ্গে ক্যাপ্টেন আজিজুর রহমানের অধিনায়কত্বে যোগ দেয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একটি দল। তাদের সম্মিলিত আক্রমণে সিলেট শহর শত্রুমুক্ত হয় ১৯৭১ সালের ৭ এপ্রিল। তবে বিমান বাহিনীর সহায়তা নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনী পাল্টা আক্রমণ শুরু করলে, বিমান আক্রমণ ঠেকানোর কোনো অস্ত্র না থাকায় তাদের পিছু হটতে হয়। এই বাহিনী গঠনের কারণে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হবিগঞ্জে অত্যাচারের স্টিমরোলার চালায় গণহত্যা, লুণ্ঠন, অপহরণ, ধর্ষণ, জেল-জুলুম ইত্যাদির মাধ্যমে। হবিগঞ্জের এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কোনো নির্ভরযোগ্য ইতিহাস লিখিত না হওয়ায় শেখ ফজলে এলাহী নিজ জেলার মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করতে উদ্যোগী হন। হবিগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের একজন সংগঠক হিসেবে তিনি হবিগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধকে নিজে প্রত্যক্ষ করেছেন বিধায়, মুক্তিসংগ্রামে হবিগঞ্জের প্রকৃত ইতিহাস লিপিবদ্ধ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছে এবং এ বইটি বর্তমানে যুদ্ধাপরাধের একটি মামলার সাক্ষ্য হিসেবে স্থান লাভ করেছে। মুক্তিযুদ্ধে হবিগঞ্জ জেলা বইটি রচনায় বিভিন্ন তথ্য ও ছবি সংগ্রহে তাঁকে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে টানা দুই বছর। অত্যন্ত পরিশ্রম ও যত্নের সঙ্গে রচিত এই বইটি পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে প্রকাশিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধে হবিগঞ্জ জেলা গ্রন্থে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ ও সিলেট মুক্ত করার জন্যে গঠিত বাহিনীর যুদ্ধাভিযানের দৈনন্দিন অগ্রাভিযান ও পশ্চাদপসরণের বিবরণ, ৯ মাসব্যাপী পাকিস্তানি দখলদারির সময় হবিগঞ্জ জেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচালিত বিভিন্ন অভিযান ও প্রতিরোধ যুদ্ধের বিবরণ, আজমিরীগঞ্জের বদলপুরে কমান্ডার জগৎজ্যোতি পরিচালিত কিংবদন্তির যুদ্ধ, কালেঙ্গা গভীর জঙ্গলের বীরত্বপূর্ণ অ্যামবুশ, নলুয়ায় পাকিস্তানি সেনা নিধনের ঘটনা, রেমা চা-বাগানের বীরত্বপূর্ণ লড়াইসহ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সঙ্গে বিভিন্ন স্থানে যুদ্ধে হবিগঞ্জের যেসব মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হয়েছেন, তাঁদের জীবনীসহ শাহাদতের প্রেক্ষাপট ও ঘটনার বিবরণ, পদবিপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনী ও পদকপ্রাপ্তির নেপথ্যে তাঁদের অসীম সাহসিকতার বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। সেই সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের বর্তমান করুণ অবস্থা এবং তাঁদের প্রতি অমনোযোগ ও উদাসীনতার কথা। এসব বিবরণের মধ্যে রয়েছে জগৎজ্যোতি দাশ বীর-উত্তম, আব্দুল খালেক বীরবিক্রম, রমিজ উদ্দিন বীরবিক্রমের জীবনী ছাড়াও তাঁদের আত্মত্যাগের ঘটনাবলি। যাঁরা এমন কাজ করেন, তাঁরা সাধারণত মুক্তিযুদ্ধের প্রতি আবেগ আর ভালোবাসা থেকেই করেন। ফজলে এলাহীর ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা এ রকম; কিন্তু এর সঙ্গেও সংযুক্তি আছে একটা। ইতিহাস বিকৃতিই তাঁকে টেনে এনেছে গবেষণার দিকে, 'চোখের সামনে দেখেছি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি করা হচ্ছে। রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে এই স্বাধীন দেশে সুযোগ-সুবিধা নিচ্ছে। আর প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা অনাহার-অর্ধাহারে ধুঁকে ধুঁকে মরছে। তখন বিবেকের তাগিদেই মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস সংরক্ষণ ও রচনার কাজে মনোনিবেশ করেছি।' নিজের জায়গা থেকে সেই কাজটা করে ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াচ্ছেন ফজলে এলাহী, সেই মুক্তিযুদ্ধের সময়ের শক্তি আর সাহস নিয়ে।