মুক্তিযুদ্ধের সময় গোপীকান্ত সরকারের বয়স ৯ বছর। খাজুরা টিপিএম প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র। যশোরের বাঘারপাড়া থানার পেছনে পড়া সেকেন্দ্রারপুর গ্রামে তাঁদের বাড়ি। ডানপিঠে গোপীকান্ত স্কুলে গেলেও সারা দিন নিজের তৈরি ঘুড়ি উড়িয়েছেন এ মাঠ ও মাঠজুড়ে। হলুদ শর্ষে ক্ষেতের ভেতর দিয়ে দৌড়ে খেজুর গাছে উঠেছেন। পাটকাঠির নল দিয়ে রস চুরি করে খেয়েছেন। এ সময়ই যুদ্ধের দামামা। শুরু হলো মুক্তিযুদ্ধ। শিশু গোপীকান্ত সেই মুক্তিযুদ্ধ খুব কাছ থেকে দেখেছেন। দেখেছেন রাজাকাররা নিরীহ মানুষের বাড়িঘর আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। প্রতিবেশীকে ধরে নিয়ে গুলি করে মেরেছে। গ্রামের তরুণরা বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে নাম লেখাচ্ছে। গোপীকান্ত রাজাকারের নৃশংসতা দেখে ফুঁসে উঠেছেন। মনে হয়েছে, গুলতি দিয়ে ওদের মাথা ফাটিয়ে দেন। কিন্তু শিশু বয়স তাঁকে করতে দেয়নি কিছুই। মনে কষ্ট নিয়ে নীরবে কেঁদেছেন। দেশ স্বাধীন হয় একসময়। সময়ের নিয়মে বড় হয়ে গোপীকান্ত খাজুরা শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়ে শুরু করেন কর্মজীবন। ১৯৯৬ সালে কলেজ থেকে শহীদ সিরাজুদ্দীনের একটি জীবনীগ্রন্থ বের হয়। গোপীকান্ত মন দিয়ে গ্রন্থটি পড়েন। সিরাজুদ্দীনের সাংবাদিকতা, মুক্তিযুদ্ধের সাহসিকতা তাঁকে মুগ্ধ করে। তিনি সিরাজুদ্দীনের ঘোরে বুঁদ হয়ে থাকেন। আর সেটাই তাঁর ভেতরের অনেক বছরের ঘুমন্ত সত্তাকে জাগিয়ে বের করে আনে আরেক গোপীকান্তকে। সিদ্ধান্ত নেন মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে গবেষণা করবেন। খাজুরা অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লিখবেন। শহীদ মুক্তিযোদ্ধাসহ অন্য শহীদদের তালিকা তৈরি করবেন। রাজাকারের তালিকা করবেন। মুক্তিযুদ্ধের আলো জ্বালাবেন। তাঁদের স্মরণ করার জন্য এলাকাবাসীকে নিয়ে গড়ে তুলবেন স্মৃতিস্তম্ভ। পরিকল্পনার মালা গেঁথে নিজের বাইসাইকেল নিয়ে বের হন গোপীকান্ত। এর পর থেকে তাঁর সাইকেলের চাকা আর থামেনি। বাঘারপাড়া উপজেলার ১৮৮টি গ্রাম। সব গ্রামই তিনি সাইকেলে ঘুরেছেন। কলেজের ক্লাস শেষে খাতা-কলম ব্যাগে ভরে সাইকেলে করে তিনি গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস হাতড়ে বেড়িয়েছেন। গ্রামভিত্তিক শহীদদের তালিকা তৈরি করেছেন। যেমন- প্রেমচারা গ্রামের শহীদ সিরাজুল ইসলাম মাস্টার, সাখাওয়াত হোসেন, আবুল হোসেন, আফসার বিশ্বাস ও রহম আলী; গাইদঘাট গ্রামের শহীদ সুরত আলী ও মুক্তার আলী; পিয়ারপুর গ্রামের শহীদ রজব আলী, চাঁদ আলী ও চাঁদ আলীর স্ত্রী; আড়োকান্দি গ্রামের শহীদ মো. মান্নান, ভবানীপুর গ্রামের শহীদ নিয়ামত আলী ও শামসুর। অন্যান্য গ্রামের শহীদের তালিকাও তিনি করেছেন। রাজাকারদেরও তালিকা তৈরি করেছেন। নারী নির্যাতন, ধর্ষণের তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এখন তাঁর কাছে দুই শতাধিক শহীদ আর শতাধিক রাজাকারের নামের তালিকা রয়েছে। রাজাকারের নৃশংসতার তথ্যও রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে মিত্রবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। তারাও এ দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করেছে। গোপীকান্ত মিত্রবাহিনী নিয়েও কাজ করেছেন। একাত্তরের ৭ ডিসেম্বর খাজুরা মনিন্দ্রনাথ মিত্র মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে রাজাকারদের সঙ্গে যুদ্ধে মিত্রবাহিনীর ছয়জন সৈনিক শহীদ হন। ২০০৯ সালে গোপীকান্ত মিত্রবাহিনীর স্মরণে ওই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করার পরিকল্পনা করেন। এলাকার প্রগতিশীল কৃষক আইয়ুব হোসেনসহ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কথা বলেন। এরপর তাঁর উদ্যোগে ২০১০ সালে নির্মিত হয় দেশের একমাত্র মিত্রবাহিনীর স্মৃতিস্তম্ভ। এই স্মৃতিস্তম্ভসহ একটি মুক্তিযুদ্ধের জাদুঘর নির্মাণের পরিকল্পনা তাঁর রয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছেন। ২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর ৭ ডিসেম্বর খাজুরা মুক্ত দিবস উপলক্ষে ওই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তিনি এলাকাবাসীকে সঙ্গে নিয়ে অনুষ্ঠান করে আসছেন। গোপীকান্তের বয়স এখন ৫১ বছর। এখনো তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সন্ধানে সাইকেলে চেপে বাঘারপাড়ার দৌলতপুর, আগড়া, মালঞ্চী, খানপুর, শ্রীরামপুর, দয়ারামপুর, গরিবপুর, রায়পুর, আযমপুর, শতখালী, প্রেমচারা, বড়ক্ষুদ্রা, সাতনাদুরিয়া, গাইদঘাট, পিয়ারপুর, আড়কান্দী, উত্তর চাঁদপুর, নিমটা, কাঠুরাকান্দী, হলদা, ভবানীপুরসহ গ্রামের পর গ্রাম ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এ জন্য কেউ তাঁকে এক টাকা সাহায্য করেনি। নিজের পকেটের টাকা খরচ করে তিনি তাঁর গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর তাঁর জীবনের ওপর হুমকি আসে। শারীরিকভাবে তাঁকে লাঞ্ছিতও করা হয়। গোপীকান্তের ঝুলিতে ওই রাজাকারদের নৃশংসতার এমন কাহিনী রয়েছে, যা শুনলে মানুষের গা শিউরে ওঠে। রাজাকার কমান্ডার ডা. ইব্রাহিম তাঁর বাহিনী নিয়ে গিয়ে চণ্ডিপুর গ্রাম থেকে মুক্তিযোদ্ধা আজিজকে ধরে এনে খাজুরা ক্যাম্পে আটকে রাখে। এই ক্যাম্পে আজিজের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। এরপর তাঁকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়। তারপর রাজাকাররা আজিজের লিঙ্গ কেটে সেই লিঙ্গ তাঁর মুখের মধ্যে ভরে লাশ ভেলায় করে চিত্রা নদীতে ভাসিয়ে দেয়। এমন নৃশংসতার কাহিনী রয়েছে আরো। রায়পুর ক্যাম্পের রাজাকাররা রামকৃষ্ণপুরের জগদ্বন্ধু তরফদার ও তাঁর স্ত্রীকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে এসে কাতলামারী মহাশ্মশানে গুলি করে হত্যা করে। এরপর দুজনকে উলঙ্গ করে একজনের লাশ আরেকজনের ওপরে রেখে 'পাকিস্তান জিন্দাবাদ' বলে রাজাকাররা চলে যায়। এই অক্লান্ত পথচলার পাথেয় কি শুধুই মুক্তিযুদ্ধের প্রতি ভালোবাসা, শহীদদের প্রতি দায়বদ্ধতা? শুনুন গোপীকান্তের মুখেই, 'নিজের দায় থেকে আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে কাজ করছি। তালিকা তৈরি করতে গিয়ে বিড়ম্বনার মধ্যে পড়তে হয়। রাজনৈতিক কারণে স্থানীয়ভাবে সহযোগিতা পাওয়া যায় না। প্রতিষ্ঠিত রাজাকারসহ তাদের সন্তান-আত্মীয়স্বজনের রোষানলে পড়তে হয়। অনেকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। মুক্তিযুদ্ধের প্রতি অনীহা দেখায়। খারাপ ব্যবহারও করে। কিন্তু আমি এসব বিষয়কে তুচ্ছ মনে করে মুক্তিযুদ্ধের গবেষণাকাজ চালিয়ে যাচ্ছি।' চালিয়ে যান গোপীকান্ত। অক্লান্তে চলে তাঁর সাইকেল। এর দুই চাকায় ভর করে চলে মুক্তিযুদ্ধের গৌরব-আবেগ-হাহাকার সব!