অধ্যাপক বিমল কান্তি দের শুরুর গল্পটা ছিল এ রকম, 'সময়টা হবে ১৯৭২-৭৩ সাল। তখন আমি সরকারি আনন্দ মোহন কলেজে প্রভাষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা একজন সাহসী বীর সেনা কর্মকর্তার আহ্বানে আমি ১০-১৫ জন গণবাহিনীভুক্ত মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষাৎকারভিত্তিক কিছু তথ্য সংগ্রহ করি। ওই সময়ে ওইটুকুই ছিল আমার প্রথম কাজ। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে টুকটাক লেখালেখি ও পড়ালেখা চললেও এরপর ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত আমি বলতে গেলে এ ব্যাপারে অনেকটা নীরবই ছিলাম।' তারপর ১৯৮৬ সালে অদ্ভুতভাবেই তিনি জড়িয়ে পড়লেন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের খুঁজে বেড়ানোর কাজে। ১৯৮৬ সালে ময়মনসিংহ জেলার দ্বি-শতবার্ষিকী উৎসবের প্রাক্কালে জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী 'ময়মনসিংহের জীবন ও জীবিকা' নামের একটি গ্রন্থ প্রকাশের সিদ্ধান্ত হয়। বিষয় নির্বাচন কমিটির সভায় বিমল কান্তি দে নিজেই প্রস্তাব করেন ময়মনসিংহ জেলার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি প্রবন্ধ রচিত হওয়া দরকার। ওই সভায় সর্বসম্মতিক্রমে এ প্রস্তাব পাস হলে বিমল কান্তি দেকেই দায়িত্ব দেওয়া হয় প্রবন্ধটি লেখার। এরপর প্রবন্ধ লেখার জন্য কয়েক মাস বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে বিভিন্ন লোকের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে এবং চিঠির মাধ্যমে পাওয়া তথ্য নিয়ে রচনা করেন ১০৮ পৃষ্ঠার আয়তনের লিখিত প্রবন্ধ। প্রবন্ধটির নাম ছিল 'বৃহত্তর ময়মনসিংহে মুক্তিযুদ্ধ-৭১'। ওই প্রবন্ধের শেষ দিকে তিনি ১১ নম্বর সেক্টরে উপাধি পাওয়া বীর মুক্তিযোদ্ধাদের একটি তালিকা দেন- যা ছিল লোকমুখে শ্রুত। কিছুদিন পর আবিষ্কৃত হলো সেই তালিকায় ভুল আছে কিছু। সেই ভুল শুদ্ধ করতেই সব ছেড়েছুড়ে তিনি হয়ে গেলেন মুক্তিযোদ্ধাদের সন্ধানে ছুটে চলা এক অক্লান্ত পথিক। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সরকারি গেজেট খুঁজে বের করবেন। সেখানে কত বিচিত্র অভিজ্ঞতা। প্রায় দুই বছর চেষ্টার পর বিমল কান্তি দে ঢাকার স্বাধীনতা ভবন থেকে উদ্দিষ্ট গেজেটের একটি কপি সংগ্রহ করতে সক্ষম হন। কিন্তু কপি পেয়ে তিনি আরো বিভ্রান্তিতে পড়েন। কারণ ওই কপিতেও অনেক কিছু ছিল অসম্পূর্ণ ও ভুল। এ ব্যাপারে বিমল কান্তি দে বলেন, সরকারি তালিকায় তিনি দেখেন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ ল্যান্স নায়েক মুন্সী আব্দুর রবের সার্ভিস নম্বর গেজেটে মুদ্রিত নেই। ৬৮ জন বীর-উত্তমের মধ্যে চারজনের সার্ভিস নম্বর উল্লেখ করা হয়নি। বাংলাদেশ নেভির মতিউর রহমান বীর-উত্তমের সার্ভিস নম্বর মুদ্রিত হয়েছে ০২৩০। অথচ প্রকৃত নম্বর ৬২৩০। গণবাহিনীর আটজন বীর-উত্তম উপাধি পেয়েছেন। অথচ তাঁদের মধ্যে সাতজনের পূর্ণ পরিচয় নেই। গণবাহিনীভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের যাঁরা বীরবিক্রম উপাধি পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ১৮ জনের পিতার নাম মুদ্রিত হয়নি, ২২ জনের কোনো ঠিকানা লেখা হয়নি। গণবাহিনীতে যাঁরা বীরপ্রতীক পেয়েছেন, তাঁদের ৭৯ জনের পিতার নাম এবং ৮০ জনের ঠিকানা লেখা হয়নি। এসব জটিলতা ও অস্পষ্টতা নিয়ে দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় ১৯৯২ সালের ১৫ ডিসেম্বর 'বীর পদক প্রসঙ্গে' শিরোনামে একটি প্রবন্ধও লেখেন। সরকারি ওই তালিকা সূত্রেই তিনি বীরপ্রতীক তারামনের নাম পান। বহু শ্রমের বিনিময়ে তারামনকে তিনি জাতির সামনে উপস্থিত করেন। এরপর খুঁজে পান পদকবঞ্চিত আরেক বীরপ্রতীক বশির আহম্মেদকে। খুঁজে পান তারামনের ধর্ম পিতা মহিব হাবিলদারকে। সন্ধান পান অতুলনীয় বীর দ্বি-মুকুটপ্রাপ্ত অনারারি ক্যাপ্টেন আফতাব আলী বীরপ্রতীককে। আর তাঁদের সন্ধানে একটানা প্রায় ১০ বছর ঘুরে বেড়িয়েছেন পথে-প্রান্তরে। ১১ নম্বর সেক্টরের প্রায় পুরো যুদ্ধাঞ্চলটিই তিনি ঘুরেছেন। বিভিন্ন এলাকার মানচিত্র সংগ্রহ করে সেখানকার গ্রামের নাম ও অবস্থান জেনেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রের ম্যাপ সংগ্রহ করেছেন। চিঠি লিখেছেন কয়েক হাজার। নাম না জানলেও তিনি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানে চিঠি দিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। চিঠি লেখার বিষয়ে তিনি বলেন, 'আমি চেয়ারম্যান অমুক ইউপি, সাধারণ সম্পাদক অমুক জেলা প্রেসক্লাব, প্রধান শিক্ষক অমুক স্কুল, এমনিভাবে চিঠি দিয়েছি।' যেখানেই তিনি কাঙ্ক্ষিত মানুষটির নাম শুনেছেন, সেখানেই ছুটে গেছেন। গিয়ে হয়তো আবার দেখেছেন আরে এ মানুষটি তো সেই মানুষ নয়। আবার যার কাছে গিয়েছেন সে হয়তো বলেছে অমুক জানে। তখন তিনি আবার সেই নতুন মানুষটির সন্ধানে পথে বেরিয়েছেন। রাত কাটিয়েছেন অজানা-অচেনা মানুষের ঘরে। বৃহত্তর ময়মনসিংহের সীমান্তের আঁকাবাঁকা পথে কিংবা ব্রহ্মপুত্রের চর ধরে হেঁটেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ট্রেনে, বাসে, মোটরসাইকেলে পথ চলেছেন। তাতে যেমন তারামন বিবিকে আবিষ্কারের আনন্দ আছে, আবার আছে না পাওয়ার কিছু হতাশাও। যেমন দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে তিনি খুঁজছেন আব্দুল মজিদ আর ভূঁইয়া নামের দুই বীরপ্রতীককে। কিন্তু তাঁদের দেখা তিনি এখনো পাননি। আব্দুল মজিদের একটি ঠিকানা পেয়ে সেখানে গিয়ে তিনি কথা বলেছেন। কিন্তু যথার্থ সাক্ষী পাননি। আর তাই মাঝেমধ্যে মনে হয়, হয়তো এ মানুষটি গেজেটের কাগজেই থেকে যাবেন। তেমনি খুঁজে পাওয়া যাবে না বীরপ্রতীক ভূঁইয়াকে। সম্প্রতি জনতা ব্যাংকের অর্থানুকূল্যে ও সৌজন্যে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা স্মারক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সেই গ্রন্থের তথ্যানুযায়ী এখনো ৫৫ জন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাকে শনাক্ত করা যায়নি। 'তাঁদের পূর্ণ পরিচয় সংগ্রহের ব্যাপারে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের কি কিছুই করার নেই?' মাঝেমধ্যে এমন আফসোস আর হতাশা ভর করে। কিন্তু মুহূর্তেই হতাশা ভুলে, আর কে কী করল, না করল- না ভেবে নেমে পড়েন আবার কাজে। জীবনের শেষ বেলা এখন, বয়স হয়েছে, তবু থামেন না। আগের মতো আর চিঠি লেখা লাগে না, এখন মোবাইল ফোনেই চালিয়ে যান সন্ধানের কাজ। আর এর ফাঁকে সুযোগ পেলেই নতুন প্রজন্মকে শোনান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। যেন তাদের মধ্যেও মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি সেই ভালোবাসা প্রবাহিত হয়। যখন তিনি থাকবেন না তখনও যেন কেউ একজন থাকে, যে দিনের পর দিন পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়াবে বীর শহীদদের সন্ধানে। তারপর জাতির সামনে তাঁদের তুলে ধরে বকেয়া সম্মান পাইয়ে দেবে ঠিকঠাক।