আব্দুল করিমকে চেনেন? মফস্বল সম্পাদক শামীম ভাইয়ের এমন প্রশ্নে কোনো চিন্তা না করে দ্রুতই বললাম, 'হ্যাঁ, চিনি'। এভাবে ঝটপট বলার কারণও আছে। চেনার মতো আব্দুল করিম যে একজনই! মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিম, ৫০ শহীদের 'পাহারাদার' আব্দুল করিম। 'অফিস আদেশে' পরদিন সাতসকালেই ছুটে চলা। প্রায় ৩৫ কিলোমিটারের পথ বাড়ি থেকে। পথে পথে অবরোধের বাগড়া। একবার তো মোটরসাইকেলের চাবিই কেড়ে নেওয়া হলো। আমি সাংবাদিক, করিম ভাইয়ের কাছে যাচ্ছি, বলে-কয়ে নিস্তার। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার বায়েক ইউনিয়নের কোল্লা পাথর গ্রাম। গ্রামের মাঝামাঝি স্থানে সড়কের পাশ ধরে উঁচু ঢিবিতে ৫০ শহীদের কবর। সামনের খোলা মাঠে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে চেয়ার পেতে বসে আছেন এক ব্যক্তি। তিনিই আব্দুল করিম। শহীদদের 'পাহারায়' এভাবে বসে থাকাটা ৪২ বছর ধরেই রুটিনকাজ আব্দুল করিমের। কেউ তাঁকে করিম চাচা, কেউ করিম ভাই বলে ডাকেন। শুরুতেই যথারীতি স্বভাবসুলভ আপ্যায়ন। এরপর চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বলতে শুরু করলেন, 'জুন মাসের ৬ তারিখ। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আর্টিলারি শেলে মন্দভাগ রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় শহীদ হন হাবিলদার তৈয়ব আলী। চতুর্থ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ২ নম্বর সেক্টরের ২ নম্বর সাব সেক্টরের ক্যাপ্টেন গাফফার আমাকে ডেকে নিয়ে লাশ দাফনের জন্য জায়গা খুঁজে বের করতে বলেন। আমি বলি, আমাদের পারিবারিক একটি কবরস্থান আছে, সেটি খুব নিরাপদ। ক্যাম্পের কয়েকজন এসে জায়গা পছন্দ করেন। আমি আমার বাবা-মায়ের হাতে লাশ বুঝিয়ে দিই। গ্রামবাসীর সহযোগিতায় আমাদের পারিবারিক কবরস্থানে তৈয়ব আলীকে দাফন করা হয়।' সেই থেকে শুরু। এক, দুই, তিন করতে করতে পঞ্চাশ। তবে এটি আর এখন পারিবারিক কবরস্থান নেই। একে একে এখানে এনে দাফন করা হয় ৫০ বীর সেনানীকে। আর এই বীর সেনানীদের দেখে রাখার কাজটি একাই করে যাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল করিম। প্রতিদিন সমাধিস্থল পরিষ্কার করা, আগন্তুকদের কাছে এর ইতিহাস তুলে ধরা, আপ্যায়ন ইত্যাদিতে দিনভর ব্যস্ত সময় কাটান তিনি। এ ছাড়া সমাধিস্থলের উন্নয়নে দেশের বিশিষ্টজনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষাও নিয়মিত কাজ আব্দুল করিমের। সমাধিস্থলের তদারকি করতে গিয়ে স্বাধীনতার পর থেকে বেকার জীবন কাটানো আব্দুল করিম জানালেন, শহীদদের দেখভালে বাকি সম্পত্তিটুকু বিক্রিতেও আপত্তি নেই। তবে বেঁচে থাকতে শহীদদের স্মৃতি রক্ষায় আরো কিছু সরকারি উদ্যোগ দেখে যেতে চান তিনি। দাবি জানান সমাধিস্থলের কাছে বঙ্গবন্ধু, সাতজন বীরশ্রেষ্ঠ ও জাতীয় চার নেতার ভাস্কর্য নির্মাণের। আর চান যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দেখে যাওয়ার স্বপ্নের কথা, 'তা না হলে তো বাংলাদেশের মাটি অপবিত্র হয়ে থাকবে।' কোল্লা পাথরের শহীদ সমাধিস্থলটুকু প্রায় ৬৫ শতাংশ জমির ওপর। ১৯৭২ সালে এর পুরোটাই সরকারকে লিখে দিয়েছেন আব্দুল করিমের বাবা। যুদ্ধের পরপরই কুমিল্লার জেলা প্রশাসক (বর্তমান নির্বাচন কমিশনার) কাজী রাকিব উদ্দিন ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মহকুমা প্রশাসক স ম রেজা কোল্লা পাথর আসেন। এ সময় তাঁরা জায়গাটি সরকারকে দিয়ে দেওয়ার জন্য আব্দুল করিমের বাবা আব্দুল মান্নানের কাছে অনুরোধ করেন। বাবার একমাত্র সন্তান আব্দুল করিমও সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। এরপর ধীরে ধীরে সমাধিস্থলের সৌন্দর্য বাড়ানো হয়। এখন চারপাশে বাউন্ডারি ঘেরা এ সমাধিস্থল। ২০০৮ সালের ১৯ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয় একটি রেস্ট হাউস। একই বছরের ৫ মার্চ উদ্বোধন হয় মসজিদ। যে ৫০ জন শহীদ শুয়ে আছেন এখানে তাঁদের অনেকেই রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন খেতাবপ্রাপ্ত। অবশ্য কবরের সংখ্যা এখানে ৫১টি। শরীয়তপুর জেলার নড়িয়ার প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম ভারতের আগরতলার একটি হাসপাতালে মারা যাওয়ার সময় বলে যান তাঁকে যেখানেই কবর দেওয়া হোক না কেন, তাঁর পাশে যেন স্ত্রীর জন্য জায়গা রাখা হয়। সে কারণে এখানে নজরুল ইসলামের পাশে আরেকটি কবরের জায়গা রাখা হয়েছে। আব্দুল করিম স্মৃতি হাতড়ে জানালেন, 'লাশের সংখ্যা যখন ২৬-২৭টি হয়ে গেল তখন আমি নিজ খরচায় ভারত থেকে টিনের প্লেটে তাঁদের নাম লিখিয়ে আনি। সেগুলো কবরের পাশে লাগিয়ে দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পরও এখানে শায়িত অনেকের নাম-ঠিকানা শনাক্ত হয়। তবে আজও দুজনের নাম-ঠিকানা পাওয়া যায়নি। যাঁদের কবরের সামনে অজ্ঞাত লেখা আছে।' কোল্লা পাথরে শায়িত ৫০ বীর সেনানী হলেন (কবরের ক্রমানুসারে) ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর দর্শন আলী, ঢাকা আর কে মিশন রোডের জাকির হোসেন (বীরপ্রতীক), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার জয়দেবপুরের আব্দুল জব্বার, সিলেটের গহরপুরের তৈয়ব আলী, বগুড়ার সারিয়াকান্দির আব্দুস সাত্তার (বীরবিক্রম), কুমিল্লার লাকসামের বিজরার মো. আক্কাস আলী, কসবার কোল্লা পাথরের ফখরুল আলম, কসবার কামালপুরের ফারুক আহমেদ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর কুড়িঘরের নুরু মিয়া, ময়মনসিংহের মহাদানের মোজাম্মেল হক, নোয়াখালীর মধ্যম কাচার আব্দুস সালাম (বীরবিক্রম), ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার কুড়িপাইকার নোয়াব আলী, ফরিদপুরের পাঁচগাঁওয়ের মুসলিম মৃধা, শরীয়তপুরের নড়িয়ার নজরুল ইসলাম, কসবার মন্দভাগের আব্দুল অদুদ, কুমিল্লার মুরাদনগরের তমিজ উদ্দিন, হোমনার আবুল কাসেম, ব্রাহ্মণপাড়ার চান্দলার মোশারফ হোসেন, রামপুরের মাইনুল ইসলাম (বীর-উত্তম), কসবার বায়েকের আব্দুল কাইয়ুম, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের হুমায়ুন কবির, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের আব্দুল খালেক, বগুড়ার আজিজুর রহমান, ব্রাহ্মণপাড়ার তারু মিয়া, চট্টগ্রামের সন্দ্বীপের বেলায়েত হোসেন (বীর-উত্তম), কসবার বাউরখন্দের রফিকুল ইসলাম, আখাউড়ার নিলাখাদের মোরশেদ মিয়া, কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজারের আশুরঞ্জন দে, আখাউড়ার তুলাই শিমুলের তাজুল ইসলাম, ধাতুর পহেলার মো. শওকত, কসবার নিয়ামতপুরের আব্দুস সালাম, আখাউড়ার আমির হোসেন, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জের জাহাঙ্গীর আলম, কসবার সৈয়দাবাদের পরেশ চন্দ্র মলি্লক, কুমিল্লার হোমনার জামাল উদ্দিন, কসবার শিকারপুরের আব্দুল আওয়াল, মাইজখারের আবেদ আহম্মেদ, কুমিল্লার দেবীদ্বারের ফাতেয়াবাদের সিরাজুল ইসলাম, হোমনার ফরিদ মিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরের মতিউর রহমান, কুমিল্লার বুড়িচংয়ের রাজাপুরের সাকিল মিয়া, চাঁদপুর হাইমচরের ইলাহী বক্স পাটোয়ারি (বীরপ্রতীক), বাঞ্ছারামপুর জগরারচরের আব্দুর রশিদ, কসবার মজলিশপুরের শহিদুল হক, মান্দাইলের আনোয়ার হোসেন, কুমিল্লার দেবীদ্বারের উজানীচরের আব্দুল বারী, নোয়াখালীর মাইজদীর সাজেদুল হক ও অজ্ঞাতপরিচয় দুজন। প্রত্যেকের কবরের সামনেই তাঁদের নাম-ঠিকানা লেখা আছে। এ ছাড়া সমাধিস্থলে প্রবেশ করতেই চোখে পড়বে শহীদদের নাম-ঠিকানাসংবলিত ফলক। কোল্লা পাথরে শায়িত ওই বীর সেনানীরা এখন যেন আব্দুল করিমের পরমাত্মীয়। শহীদদের পরিবারের লোকজনের খোঁজখবরও রাখেন তিনি। এ ছাড়া প্রতিবছরই কোনো না কোনো সময়ে বিশেষ করে স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসে শহীদদের পরিবারের লোকজন এখানে এসে শ্রদ্ধা জানিয়ে যান। এ ছাড়া দেশি-বিদেশি অনেক পর্যটক আসেন এখানে। তাঁদের পরম মমতায় আপ্যায়নের কাজটা নির্দ্বিধায় করে যান মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুল করিম। নিজে থাকেন সমাধিস্থলের পাশেই পৈতৃক ভিটায়। আট মেয়ে ও তিন ছেলের বাবা আব্দুল করিম নিজের অবর্তমানে সমাধিস্থলের এই সমাদরটা থাকবে কি না এই নিয়ে দুশ্চিন্তা করেন মাঝেমধ্যে। 'আমি জানি না আমার ছেলেরা এই পাড়াগাঁয়ে থাকবে কি না। আমার মৃত্যুর পর কে এটাকে দেখাশোনা করবে বুঝতে পারছি না। শুনেছিলাম আশপাশে থাকা আরো ১১৫০ শহীদের কবর এখানে আনা হবে। এ প্রকল্পেরও কোনো খোঁজ পাচ্ছি না।' ১৯৯২ সালের ২৪ জুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া সমাধিস্থল পরিদর্শন করে এর উন্নয়নের আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু আশ্বাস আশ্বাসই থেকে গেছে। মানুষের ভালোবাসা আর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে পাওয়া সামান্য কিছু ভাতা নিয়েই দিন কাটে আব্দুল করিমের। হতাশ হয়ে পড়েন কখনো কখনো। কোনো রকম স্বীকৃতি না পাওয়ার দুঃখ ভর করে; কিন্তু তখন আবার চোখ বুলান সমাধিস্থলের পাশে রাখা পরিদর্শন বইতে। বিখ্যাত মানুষরা এখানে এসে কত প্রশংসার কথা লিখে গেছেন তাঁর নামে। অদূরে শুয়ে থাকা শহীদরা তাঁরাও তো প্রতি মুহূর্তে ভালোবাসায় ভেজাচ্ছে তাঁকে। তাঁর বুকটা ভরে ওঠে। তখন জীবনটাকে পূর্ণ আর ধন্য মনে হয়।