kalerkantho


আপনার শিশু

সন্তানের বন্ধু হোন

মেরীনা চৌধুরী

২২ অক্টোবর, ২০১৮ ০০:০০



সন্তানের বন্ধু হোন

একটি ছবি দিয়ে শুরু করি। মা-বাবার সঙ্গে সন্তানের সুন্দর সম্পর্ক। সবাই মিলে একসঙ্গে কোয়ালিটি টাইম কাটান। ভালো রেজাল্ট বা র্যাংকের বোঝা নেই। বাচ্চারাও পড়াশোনা করে ভালো লাগা থেকে। শাসন নেই অথচ ডিসিপ্লিন আছে। কিন্তু এই আদর্শ পরিস্থিতি থেকে যোজনকয়েক দূরে বাস্তব চিত্র। আধুনিক জীবনযাত্রার ফলে বড়দের জীবন থেকে প্রায় এক শ গুণ জটিল হয়ে গেছে শিশুদের জীবন। ওদের মা-বাবা ঘরে-বাইরে সর্বদাই ব্যস্ত। প্রচণ্ড শাসন বা মাত্রাতিরিক্ত আদর দিয়ে কনফিউজড করে তোলেন শিশুমনকে। এ ছাড়া আছে মা-বাবার চাহিদার চাপ। তাঁরা চান তাঁদের সন্তান হোক সেরা। উদ্দেশ্য বড় হয়ে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, বিজ্ঞানী-অধ্যাপক হওয়া। সে জন্য ছোট থেকে তাদের ছুটতে হয় নামজাদা স্কুলে। পিঠে বইয়ের বোঝা। কোনো শারীরিক কসরত নয়, খেলা নয়, শুধু বই মুখস্থ করা। আর বিনোদনের জন্য রয়েছে মোবাইল, টিভি, কম্পিউটার।

একটি শিশুর জীবনের প্রথম পাঠ মা-বাবার কোলে। সেটাই তার প্রথম স্কুল। সেখান থেকেই সে পায় ভবিষ্যৎ জীবনের দিকনির্দেশনা। এর ওপর নির্ভর করেই গড়ে ওঠে তার সুন্দর ভবিষ্যৎ। এ ক্ষেত্রে প্রথম ও প্রধান বিষয়টি হলো মা-বাবার সচেতনতা। শিশু বয়স থেকেই তার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে, দিতে হবে সাহচর্য। বজায় রাখতে হবে বাড়ির সুস্থ পরিবেশ। ছোটদের সামনে মা-বাবার নিজেদের মধ্যে ঝগড়াঝাঁটি বা পরিবারের অন্যান্য সদস্যের সমালোচনা করা উচিত নয়। ছোট হলেও তারা সব বুঝতে পারে এবং তাদের কোমল হূদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করে। সুতরাং এসব বিষয়ে মা-বাবাকে সতর্ক হওয়া জরুরি।

আর স্কুলেও রেহাই নেই; সেখানেও হোমওয়ার্ক, ক্লাসওয়ার্ক অর্থাৎ পড়াশোনার চাপ, বন্ধুদের মধ্যে রেষারেষি, কেরিয়ারের ইঁদুর দৌড় আরো কত কী! পড়াশোনার পাশাপাশি ক্রিকেট, টেনিস; মেয়ে হলে গান, আঁকতে শেখা, নাচ ইত্যাদি। এসবের টানাপড়েনে শিশুটির এমন অবস্থা হয় যে স্বাধীনভাবে নিজের মনে যে খেলবে সে সময়টুকু মেলে না। এর একটা নেতিবাচক প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই শিশুর মনের ওপর পড়ে। এই অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে আপনাকে বুখতে হবে, আপনি শুধু শিশুটির মা-বাবা নন, বন্ধুও। দূর থেকে শাসন বা নির্দেশ জারি করে আপনার কাজ শেষ হয়ে যায় না। সন্তানকে কাছে টেনে তার মনোজগতে কী ঘটছে-না ঘটছে, বুঝে নিতে হবে তার প্রিয় বন্ধুর মতোই। শুধু শিশুটির পড়াশোনা বা একাডেমিক পারফরম্যান্স নিয়ে আলোচনা নয়, ওর পছন্দ-অপছন্দ, ভালো লাগা, স্কুলের টিচার, বন্ধুরা, ভবিষ্যতের প্ল্যানিং—সবই হতে পারে আপনার গল্প-আড্ডার বিষয়; শিশুর ছোট-বড় সমস্যাতেও বাড়িয়ে দিন সাহায্য ও সহানুভূতির হাত। নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে গড়তে সাহায্য করুন এই পৃথিবী সম্পর্কে ধারণা। সন্তানের মনের কাছাকাছি পৌঁছানোই ভালো মা-বাবা হওয়ার প্রধান শর্ত। পর্যাপ্ত সময় দিন তাকে।

আপনি যতই কর্মব্যস্ত থাকুন না কেন, শৈশব থেকে বয়ঃসন্ধি—সন্তানের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে মা-বাবার সাহচর্য আবশ্যিক। শুধু আদর বা শাসন নয়, সন্তানকে সুসন্তান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য দরকার দুইয়ের সংমিশ্রণ।

 

লেখক : প্রাক্তন শিক্ষক, ম্যাপল লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল



মন্তব্য