kalerkantho


কাজের মানুষ

বস যখন প্রশিক্ষক

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বস যখন প্রশিক্ষক

প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা যাচাই পদ্ধতি। আপনি যে প্রশিক্ষণ দিলেন তা কতটা কার্যকর হলো সেটা বোঝার জন্য প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারতে হবে। এই পদ্ধতিতেই বোঝা যাবে আপনি প্রশিক্ষক হিসেবে কতটা সফল হলেন। এ এক আশ্চর্য গবেষণারও বিষয়। আপনি প্রশিক্ষণের আগে যা মনে করেছিলেন আসলেই তা ঘটল কি না সেটা বোঝা যাবে এবং দীর্ঘ পরিক্রমায় একসময় প্রশিক্ষক হিসেবে আরো দক্ষ ও নির্ভুল হয়ে উঠতে পারবেন

সাফল্যের জন্য প্রয়োজন প্রচেষ্টা। প্রচেষ্টায় হয় কর্মদক্ষতা। সেই সঙ্গে বসের সুনজরও চাই। আর কর্মদক্ষতা বজায় রাখার জন্য নিয়মিত বিরতিতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। বিশ্বাস করুন আর না-ই করুন, সাফল্যের পথে শর্টকাট বলে কিছু নেই। প্ররিশ্রম করতে হবে, প্রশিক্ষণ নিতে হবে। উত্তরোত্তর উচ্চতর দক্ষতায় নিজেকে ঋদ্ধ করতে হবে।

একজন আদর্শ ব্যবস্থাপক পক্ষান্তরে একজন ভালো প্রশিক্ষকও হয়ে থাকেন। দলের সদস্যদের মান উন্নয়নে তিনি শুধু তাদের বাইরের প্রশিক্ষণকেন্দ্রেই পাঠান না, নিজেও সার্বক্ষণিক প্রশিক্ষক হিসেবে মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকেন।

ভালো প্রশিক্ষক হতে হলে আপনাকে অনেক দক্ষতাই অর্জন করতে হবে। তার মধ্যে বাছাই করা ১০টি দক্ষতার কথা এখানে উল্লেখ করা হলো :

এক.

প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা যাচাই করা। কখন, কোন বিষয়ে, কোন কোন সদস্যের কোন মাত্রার প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন, তা বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে। পেশাদারি ভাষায় যাকে টিএনএ বা ট্রেনিং নিড অ্যানালিসিস বা প্রশিক্ষণের চাহিদা বিশ্লেষণ বলা হয়। এটি একটি বিশেষায়িত প্রক্রিয়া, যা অবিরাম চলতে থাকে। নিয়মিত বিরতিতে দলের সদস্যদের পারফরমেন্স যাচাই করে কার কোন ক্ষেত্র দুর্বল হয়ে পড়ছে  তার দিকে নজর দেওয়া হয় এবং প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা করা হয়।

 

দুই.

প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা করার দক্ষতা। আপনার বিভাগের কোন কর্মকর্তার টিএনএ করার পর রিপোর্ট অনুযায়ী তার জন্য প্রশিক্ষণ আয়োজন করতে হবে। এই প্রশিক্ষণ কী ধরনের তা নির্ধারণ করার যোগ্যতা আপনার থাকা দরকার। অবশ্যই বিভাগীয় ব্যবস্থাপক হিসেবে আপনার পাশাপাশি মানবসম্পদ বিভাগও আপনাকে সহযোগিতা করবে। তবে আপনাকেই সবার আগে লক্ষ্য স্থির করতে হবে, তবেই মানবসম্পদ বিভাগ প্রশিক্ষণ পরিকল্পনায় আপনাকে সহযোগিতা করতে পারবে। বিষয়টি এক অর্থে যৌথ উদ্যোগও বটে। আপনি যতটা নিখুঁতভাবে আপনার চাহিদা নিরূপণ করতে পারবেন, প্রশিক্ষণও ততটা কার্যকর হতে পারবে।

 

তিন.

একজন ভালো প্রশিক্ষককে জানতে হয় শেখানোর সবচেয়ে কার্যকর কৌশল। ধারণা করা হয়, একটি এক দিনের প্রশিক্ষণে একজন ভালো প্রশিক্ষার্থীও ৩০ শতাংশের বেশি হূদয়ঙ্গম করতে পারেন না। ফলে পুরো বিষয়টায় দক্ষতা অর্জন করতে যেমন মাধ্যম নির্বাচন করা জরুরি, তেমনি জরুরি কৌশল নির্বাচন। যেমন, বাক্য গঠন, বাক্য বর্ণনা, উদাহরণ, হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ, অফিসের বাইরে কোথাও নিয়ে যাওয়া, শুধু বলা নয়, ছবিতেও দেখানো ইত্যাদি পদ্ধতি বাছাই করা দরকার, যাতে অল্প সময়ে প্রশিক্ষণার্থী বুঝতে পারেন যে দক্ষতার উন্নয়নে তাঁকে কী করতে হবে।

 

চার.

জ্ঞানে ও দক্ষতায় প্রশিক্ষককেও হতে হবে সমসাময়িক। যেমন, আপনি যদি বিক্রয় বিভাগের ব্যবস্থাপক হন, তাহলে আপনাকে জানতেই হবে আপনার পণ্য আপনার ক্রেতার কাছে বিক্রি করতে হলে তার আধুনিকতম পদ্ধতি কী। একসময় কাস্টমারদের পছন্দ-অপছন্দের দিকে নজর রেখে পণ্য বিক্রয়ের কৌশল সাজানো হতো। এখন পদ্ধতি পাল্টাতে শুরু করেছে, এখন কাস্টমার যাকে পছন্দ করেন তার পছন্দ-অপছন্দের ওপর দৃষ্টি রেখে পণ্য বিক্রয়ের কৌশল সাজানো হচ্ছে। আপনাকে জানতে হবে আপনার বিভাগের এমন অনেক কিছু যা আপনার দলের সদস্যদের আরো চৌকস করে তুলবে।

 

পাঁচ.

প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা যাচাই পদ্ধতি। আপনি যে প্রশিক্ষণ দিলেন তা কতটা কার্যকর হলো সেটা বোঝার জন্য প্রশিক্ষণ-পরবর্তী কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারতে হবে। এই পদ্ধতিতেই বোঝা যাবে আপনি প্রশিক্ষক হিসেবে কতটা সফল হলেন। এ এক আশ্চর্য গবেষণারও বিষয়। আপনি প্রশিক্ষণের আগে যা মনে করেছিলেন আসলেই তা ঘটল কি না সেটা বোঝা যাবে এবং দীর্ঘ পরিক্রমায় একসময় প্রশিক্ষক হিসেবে আরো দক্ষ ও নির্ভুল হয়ে উঠতে পারবেন। তবে যাচাইয়ের এই দীর্ঘ যাত্রায় আপনাকে ক্লান্ত হলে চলবে না।

 

ছয়.

প্রচুর বই পড়ুন, সংশ্লিষ্ট ম্যাগাজিন পড়ুন, সিনেমা দেখুন, যথাযথ বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে সময় কাটান, মতবিনিময় করুন। সারা বিশ্বে কী ঘটছে সেদিকেও নজর রাখুন। ইন্টারনেট এখন এই সুযোগ অবারিত করে দিয়েছে।

 

সাত.

জ্ঞান শেয়ার করাতেই জ্ঞানের সার্থকতা। যা শিখলেন, যা জানলেন সেটা অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করুন। মাঝেমধ্যে প্রশিক্ষক হিসেবে নানা প্রশিক্ষণকেন্দ্রে আপনার অর্জিত জ্ঞান আর দক্ষতা নিয়ে আলোচনা করুন। দলের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করুন। যত চর্চা তত স্থায়ী। যা শিখলেন তা ভুলে গেলেই শেষ। ভোলা যাবে না কিছুতেই।

 

আট.

প্রশিক্ষণ আর প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন পেশা। আপনাকে এর পার্থক্য বুঝতে হবে। মানবসম্পদ বিভাগকে মূলত প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনার কাজ করতে হয়, যেখানে আপনাকে দায়িত্ব পালন করতে হবে প্রশিক্ষকের। এ দুই কর্মপদ্ধতির ভারসাম্য রাখতে হবে আপনাকে। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাপনায় আপনি যদি ১০ শতাংশ সময় দেন, প্রশিক্ষণে দিতে হবে ৯০ শতাংশ। উল্টো হলে কিন্তু চলবে না।

 

নয়.

প্রশিক্ষণ চালু রাখুন অবিরাম। কিছু প্রশিক্ষণ আছে যা সরাসরি কর্মদক্ষতার সঙ্গে জড়িত নয়। কিন্তু পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যেমন—কর্মোদ্দীপনা, সময়ানুবর্তিতা, শৃঙ্খলা, সততা ইত্যাদি। এ বিষয়ক প্রশিক্ষণগুলো নিয়মিত বিরতিতে চলতে থাকতে পারে। ফলে চর্চার চাকাও থাকবে চলমান।

 

দশ.

আপনার নিজেরও কি প্রশিক্ষণের প্রয়োজন নেই? আপনি নিশ্চয়ই নিজেকে শ্রেষ্ঠ মনে করেন না! সুতরাং একজন ভালো প্রশিক্ষক হওয়ার জন্য আপনিও নিয়মিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করুন। দেশে, দেশের বাইরে অনেক নামকরা প্রশিক্ষক রয়েছেন। তাঁদের কাছে প্রশিক্ষণ নিন। তাঁদের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলুন। এগিয়ে চলার পথকে করে তুলুন আরো সুগম, আরো শানিত, আরো ক্ষীপ্র। সাধনায় থাকুন নিমগ্ন। সাফল্য আসবেই আসবে।



মন্তব্য