kalerkantho


আহারে ভিনদেশি বাহার

ইটিং আউট যেন ব্যস্ত নাগরিকের অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর অভ্যাসকে বেগবান করছে ঢাকার বুকে গড়ে ওঠা ভিনদেশি নানা খাবারের রেস্তোঁরা। নান্দনিক ইন্টেরিয়রের পাশাপাশি মনোলোভা খাবার আর আড্ডা সবই পাবেন এসব রেস্তোঁরায়। বিস্তারিত জানালেন পিন্টু রঞ্জন অর্ক

১৪ আগস্ট, ২০১৭ ০০:০০



আহারে ভিনদেশি বাহার

মডেল : তন্বী ও লুকাস, ছবি : তারেক আজিজ নিশক

একসময় ঢাকার রেস্তোরাঁয় বিদেশি খাবার বলতে ছিল চায়নিজ, থাই আর ভারতীয়। এখন দেশের মাটিতে বসেই বিশ্বের নানা অঞ্চলের খাবারের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ মিলছে।

মেক্সিকান, ভিয়েতনামি, ইতালিয়ান,  কোরিয়ান, স্প্যানিশসহ নানা দেশের বাহারি সব খাবার যোগ করছে নতুন মাত্রা। গড়ে উঠেছে বিভিন্ন বিদেশি খাবারের রেস্তোরাঁ। নামিদামি ব্র্যান্ডের চেইনশপ। পরিবার, বন্ধুবান্ধব মিলে সময় কাটানো আর মজাদার খাবারের স্বাদ নিতে অনেকেই যাচ্ছেন এসব রেস্তোরাঁয়। ধানমন্ডির গ্লোরিয়া জিনসে খেতে আসা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী নাজনীন তমা জানালেন, ‘বন্ধু-বান্ধব মিলে আড্ডা দেওয়ার জায়গা কোথায়। তাই সবাই মিলে খেতে আসি। খাবারের পাশাপাশি আড্ডা চলে। ’ গুলশানের সিগনেচার রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড কফি রিপাবলিকের সিইও এস এম শাহাব উদ্দিন বললেন, ‘ভালোমানের রেস্তোরাঁয় যাওয়া এখন ঢাকার শিক্ষিত, সচ্ছল মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিনোদনমাধ্যম। কর্মজীবীরা ছুটির দিনে আউটিংয়ের পরিবর্তে পরিবার-পরিজন নিয়ে রেস্তোরাঁয় খেতে আসেন। ফলে আমাদের রেস্তোরায় নিত্যনতুন মেন্যু ও অফার যোগ হয়। ’

বাহারি পদ আর স্বাদ
টেস্ট অব লঙ্কায় মিলবে শ্রীলঙ্কার নানা মুখরোচক খাবার। রেস্তোরাঁর ইনচার্জ রাশেদ মাহমুদ বলেন, ‘আপ্পাম বা হোপার—রুটির ভেতর ডিম, নারিকেলের দুধ দিয়ে তৈরি এই জনপ্রিয় খাবার পাওয়া যাবে এখানে। কাঁকড়া ও নারিকেলের হরেক রকম পদও পাবেন। ’ বনানী ই-ব্লকের এই রেস্তোরাঁয় ১০০০ টাকার মধ্যে মোটামুটি শ্রীলঙ্কান অনেক রকম খাবারের স্বাদ নিতে পারবেন।
রাজধানীবাসীকে লেবানিজ কাবাব, বিরিয়ানি, রুটির স্বাদ দিচ্ছে আল-আমার। ধানমণ্ডি ২৭ নম্বরে রেস্তোরাঁটির অবস্থান। হোমুস, গ্রিল,  লেবানিজ ব্রেডও বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া আছে প্রায় ৪০০০ টাকার একটি প্ল্যাটার, যা আটজন খেতে পারবে।
নেপালি মোমো ইদানীং দারুণ জনপ্রিয়। ক্যাফে ফাইভ এলিফ্যান্ট, লা-বাম্বা, হট-হাট, টেকিয়াসহ বেশ কিছু রেস্তোরাঁয় পাবেন নেপালের জনপ্রিয় এ খাবারটি। ১৫০ থেকে ৪৫০ টাকায় মোমো পাওয়া যাবে।

ল্যাটিন আমেরিকার নানা পদের সুস্বাদু খাবার খেতে যেতে পারেন সাত মসজিদ রোডের সিল্যান্ত্রোতে। কাঠের ট্রেতে খাবার পরিবেশন করা হয়। কাসাদিয়া, এনচিলাদা, পেরুভানো চিকেন, টাকোস, নাচোসসহ নানা পদের স্প্যানিশ, মেক্সিকান ও মেডেটেরেনিয়ান খাবার পাবেন। সিল্যান্ত্রোর অপারেশন ম্যানেজার মিরাজ হোসাইন বলেন, ‘আমাদের এখানে প্ল্যাটার আইটেম আর কাসাদিয়াটা মানুষ বেশ পছন্দ করে। ’ খাওয়া যাবে ৪০০ থেকে ২৫০০ টাকার মধ্যে। খেতে বসেছেন হাসপাতালের বিছানায় বা হুইলচেয়ারে। খাবার তুলে দিচ্ছেন নার্স, ডাক্তার। সাত মসজিদ রোডে হাসপাতালের থিমে গড়ে ওঠা ক্রিস কার্ডিয়াক গ্রিল ক্লিনিক ক্যাফেতে পাবেন এমন পরিবেশ। ইন্টেরিয়র, খাবার পরিবেশনের ডিশ আর ওয়েটারের সাজপোশাক সব কিছুতেই যেন ক্লিনিকের আমেজ। একই ভবনের দিল্লি দরবার রেস্টুরেন্টে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের খাবারের স্বাদ পাবেন।
সুরা, ডায় জেং জিয়াম, কোরিয়ানা, অ্যারিরানসহ বেশ কয়েকটি কোরিয়ান খাবারের রেস্তোরাঁ আছে ঢাকায়। গুলশান, বনানী ও উত্তরায় এগুলোর অবস্থান। বুলগোগি—গরুর মাংসের একটি পদ, জাপচি—স্বচ্ছ রাইস নুডলস, কিমচি-সালাদ ধরনের, সুশিসহ নানা পদই মিলবে। খাওয়া শেষে কোরিয়ান রীতি অনুযায়ী সুজং গোয়া নামের দারুচিনির চা পরিবেশন করা হবে। এসব রেস্তোরাঁয় খেতে হলে জনপ্রতি কমপক্ষে হাজার টাকা গুনতে হবে।
যে খাবারটি খাবেন সেটি কিভাবে বানানো হচ্ছে এটি দেখতে হলে যেতে হবে লাইভ কিচেনে। বনানীর ১৯ নম্বর রোডে এই রেস্তোরাঁটির সামনে খোলা রাস্তা, ওপরে ফোটানো ছাতা! উন্মুক্ত রান্নাঘরের সামনে বসে ঘ্রাণে অর্ধ ভোজনের অভিজ্ঞতা পাবেন এখানে। সার্ভিসম্যান রাজীবুল হাসান জানালেন, ‘বার্গার ডাবল ডেকার, শেইক রোসা, থাই নুডলস চেখে দেখার মতো। ফ্রেশ জুসের ৫০ ধরন রয়েছে। একত্রে ৬০ জন বসতে পারে। ’ ধানমণ্ডিতেও লাইভ কিচেনের একটি শাখা রয়েছে। ’
সামুদ্রিক খাবার যাঁরা ভালোবাসেন, তাঁরা যেতে পারেন ক্লাউড বিস্ট্রোতে। পান্থপথের চৌরাস্তার পাশেই এর অবস্থান। পরিচালক জিকরুল আহসান বলেন, ‘শহরের মাঝামাঝি এলাকায় সামুদ্রিক খাবারের স্বাদ দিতেই আমাদের রেস্তোরাঁর যাত্রা শুরু। সাশ্রয়ী মূল্যে ভালো মানের খাবার দিতে চেষ্টা করি আমরা। সি ফুড যারা পছন্দ করেন না তাদের জন্য চাইনিজ নানা আইটেমও আছে। ’ হোটেলটির সি ফুড প্ল্যাটার, ফিশারম্যান বাস্কেট, সল্ট অ্যান্ড পিপার স্কুইড, ফিস অ্যান্ড চিপস, এশিয়ান স্টাইল চিলি ক্র্যাব, সি ফুড স্যুপ, টেম্পুরা প্রন, সি ফুড গ্রিন কারি, সি ফুড রেড কারি ভোজনরসিকদের কাছে জনপ্রিয়।

গুলশান-২-এর টপকাপিতে চীনা, থাই, ভারতীয় ও টার্কিশ খাবার পাবেন। জেনারেল ম্যানেজার নজরুল ইসলাম জানান, ‘দিনের বেলায় পাওয়া যাবে ৪০টি পদ, রাতে ৪৫ পদ। টার্কিশ খাবার পদের মধ্যে থাকে পিলাফ (পোলাও), কেবাব, প্লিসিস (মুরগির পদ)। চায়নিজের মধ্যে আছে স্যুপ, ফ্রায়েড রাইস, চিলি চিকেন ও বিফ। থাই টম ইয়াম স্যুপ আর ভারতীয় খাবারের মধ্যে আছে কয়েকটি নিরামিষ পদ। ’
হরেক রকম খাবারের জন্য ভোজনপ্রেমীদের কাছে বেশ পরিচিত গুলশানের ব্যাটন রুজ। ব্যবস্থাপক কামরুল হাসান বলেন, ‘এখানে রাতের খাবারের আয়োজনে থাকে ১০১ পদ আর দুপুরে ৫১ পদের খাবার। রয়েছে চায়নিজ, ভারতীয় ও ইতালীয় খাবার। ’ গুলশান-২ এর হোটেল লংবিচ স্যুইটসের কজি সিজলার রেস্তোরাঁয় ৬০ রকমের খাবার থাকে। এর মধ্যে লবস্টার, অস্ট্রেলিয়ান বিফ স্টেক, ইতালিয়ান পাস্তা, থাই স্যুফ দারুণ জনপ্রিয়। ’ জানালেন হোটেলটির সেলস এন্ড মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ মাসুম ইবনে শিহাব।

কোরিয়ান, জাপানিজ, চায়নিজ এই তিন ধরনের খাবার নিয়ে বনানীর ১১ নম্বর রোডে কোরিয়ান সিউল রেস্তোরাঁ। এখানে কোরিয়ান খাবার চিকেন ফ্রাইড, শ্রিম্প টেম্পুরা, বিফ বারবিকিউ, বিবিম বাব, চায়নিজ খাবার রাইস ডিস, মিক্স ভেজিটেবল এবং জাপানিজ সেসামি বেশ চলে। গুলশান এভিনিউয়ের হেরিটেজ রেস্তোরাঁয় দুপুরে ভারতীয়, চায়নিজ ও বাংলা খাবার মিলিয়ে ৩৫ পদের খাবার পরিবেশিত হয়।
ঢাকার অলিগলিতে আছে নানা ধরনের কফি শপ। জনপ্রিয় কফি শপ নর্থ এন্ড কফি রোস্টার্সে ২২ রকম স্বাদের কফি পাবেন। দোকানের মালিক রিক হাবার্ড বলেন, ‘এখানে এসে কেউ যেন আয়েশ করে কফি পান ও ভালো সময় কাটাতে পারে, তার ব্যবস্থা রেখেছি। ’
ফাস্ট ফুড-জাতীয় আমেরিকান খাবার ঢাকার অলিগলি সবখানেই পাওয়া যাবে। কয়েক মাস আগে চালু হওয়া বার্গার কিং বেশ আগ্রহ তৈরি করে। ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় বার্গার খাওয়া যাবে। রোস্টেড স্পাইসি চিকেন খেতে হলে যেতে পারেন গুলশান-১-এর কেনি রজার্স রোস্টার্সে। ডাবল পেটি বার্গার, কম্বো বার্গার, চিকেন বা বিফ বার্গারসহ হরেক রকম বার্গার পাবেন মিরপুর ও বারিধারায় ইন্দোনেশিয়ান বিখ্যাত চেইন শপ বাবা রাফিতে। এখানে সাশ্রয়ী মূল্যে বার্গার কাবাবের পাশাপাশি আইসক্রিমও পাবেন।

মুক্ত হাওয়ায় ভূরিভোজন
বাহারি খাবারের সঙ্গে বাড়তি পাওনা পাখির চোখে শহর দেখার সুযোগ। নিচে তাকালে কোথাও চোখ জুড়ানো সবুজের সন্নিবেশ, কোথাও কর্মব্যস্ত নগরজীবন। ছাদের ওপরে খাবার আয়োজন বলে গাড়ি শব্দ, হকারের চিত্কার, রিকশার টুংটাং আর পথচলতি মানুষের কোলাহল থেকে নিমেষেই মুক্তি মেলে। তাই নাগরিক কোলাহলে ক্লান্ত মনকে শান্তির পরশ দিতে চাইলে যেতে পারেন রুপটপ রেস্তোরাঁয়।
বিমানবন্দর সড়কে রিজেন্সি হোটেলের ১৪ তলার ওপর গ্রিল অন দ্য স্কাই লাইনের অবস্থান। হোটেলটির পাবলিক রিলেশান ম্যানেজার আরিফা আফরোজ বলেন, ‘একদিকে নিকুঞ্জের সবুজাভ দৃশ্য, অন্যপাশে ঢাকা এয়ারপোর্টে বিমানের ওঠা-নামা, সঙ্গে খাবার এ সবই এখান থেকে উপভোগ করা যাবে!’
ধানমণ্ডি ৫/এ সড়কে বিকল্প টাওয়ারের সপ্তম তলায় রুফটপ রেস্তোরাঁ অরিগানো। খেতে বসে সামনে তাকালেই চোখে পড়ে ধানমণ্ডি লেক। রেস্তোরাঁটির সব খাবারই ইউরোপিয়ান ঘরানার। একই ভবনে আরেক পাশে রুফটপ রেস্তোরাঁ চিজউইক। বিশ্ববিদ্যালয়-পড়ুয়া কয়েক বন্ধু মিলে খেতে এসেছেন। তাঁদেরই একজন সামসুল আরেফিন বললেন, ‘চোখের সামনে ধানমণ্ডি লেক, কোলাহল কম, তাই বন্ধুরা মিলে মাঝেমধ্যেই চলে আসি। ’ ধানমণ্ডির ৯/এ সড়কের র্যাংগস কেবি স্কয়ার ভবনের ১৩ তলায় ক্যাফে দ্রুম। সাজসজ্জায় সবুজের আধিক্য চোখে পড়ার মতো। পাখির চোখে দেখা ব্যস্ত ধানমণ্ডির সাত মসজিদ রোডের দৃশ্য রসনাতৃপ্তিতে যোগ করবে নতুন মাত্রা।
পুরানা পল্টন এলাকায় বাইতুল টাওয়ারে আছে বার্ডস আই। ঢাকা শহরের বিশাল অংশই এখান থেকে চোখে পড়ে। ঝড়-বৃষ্টি এলেও চিন্তা নেই। গ্লাস রুমে বসে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে খেতে খেতে উপভোগ করা যায় একই দৃশ্য।
উত্তরার বাসিন্দারা যেতে পারেন লেক টেরেসে। ৭ নম্বর সেক্টরের লক ড্রাইভ রোডে এর অবস্থান। রেস্তোরাঁর পাশেই লেক। একপাশ খোলা, অন্যপাশে ছাউনি। ছাদ থেকে পাশের লেক বেশ পরিষ্কার দেখা যায়। দিনে ও রাতে আলোর ভিন্নতায় তৈরি হয় ভিন্ন আবহ। বিমানবন্দরের অবস্থান কাছে হওয়ায় বিমান ওঠা-নামা দেখা যাবে। এখানে মূলত ইন্দোনেশিয়ান, মালয় ও থাই খাবার বেশ জনপ্রিয়।
বনানীতে রুফটপ রেস্টুরেন্টের মধ্যে অনন্য অফট্রাক। প্রতিদিন সন্ধ্যায় লাইভ মিউজিকের ব্যবস্থা আছে। শুনতে পারবেন ওপরে খোলা ছাদের নিচে বসেও। প্রাকৃতিক রঙের চেয়ার-টেবিল ও টবে রাখা সবুজ বৃক্ষের উপস্থিতি চোখকে প্রশান্তি দেবে। গানের তালে তালে কফির চুমুক ভালোই লাগার কথা। হাজার দুয়েক টাকায় দুজনের চার পদের খাবার পাবেন।
খাবারের সঙ্গে বিনোদনের ব্যবস্থা আছে প্লাটিনাম সুইট আবাসিক হোটেলের প্লাটিনাম টেরেসে। বনানী-১১ রোডের রুফটপ রেস্তোরাঁটিতে বারবিকিউ চিকেন, শিক কাবাব, হারিয়ালি ফিস কাবাবের বেশ চাহিদা। শুক্রবার সন্ধ্যায় লাইভ মিউজিক শুনতে শুনতে ব্যুফে ডিনার। শনিবার সন্ধ্যায় স্ন্যাকস খেতে খেতে সিনেমা। আর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জ্যাজ মিউজিকের সঙ্গে ডিনারের সেট মেনু।


মন্তব্য