kalerkantho

অন্য কোনোখানে

লটকনের দেশে

মো. জাভেদ হাকিম   

১৭ জুলাই, ২০১৭ ০০:০০



লটকনের দেশে

কাজল ভাই আগেই শিবপুরের সৃষ্টিগড় বাসস্ট্যান্ডে আমাদের—মানে ভ্রমণ সংঘ ‘দে-ছুট’-এর সদস্যদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ঈদের ছুটিতে ঢাকা শহর ফাঁকা থাকলেও কাঁচপুর ব্রিজ থেকেই যানজটের যন্ত্রণায় পেয়ে বসে।

যেখানে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা লাগার কথা, সেখানে পৌঁছতে সময় লাগল তিন ঘণ্টারও বেশি। বেচারা কাজল ভাই, রোদে পুড়ে চেহারা লাল। তবুও আমাদের পেয়ে বেজায় খুশি। কুশল বিনিময় শেষে যেতে চাইলাম লটকনের বড় পাইকারি বাজার মরজালে। কিন্তু কে শোনে কার কথা! এক রকম জোর করেই নিয়ে চললেন তাঁর বেয়াইয়ের বাড়িতে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও যেতে হলো। গাড়ি রেখে বাড়িতে ঢুকতেই চোখ সবার কপালে উঠল। আরে, এ তো ঐতিহ্য আর আধুনিকতার মিশেলে তৈরি করা এক বনেদি বাড়ি। বাড়ির আঙিনায় হরেক রকমের ফল ও ফুলের গাছ। কাঁচা-পাকা লটকন আর বিশাল বিশাল সাইজের কাঁঠাল ঝুলছে গাছে গাছে। সঙ্গীদের কেউ কেউ লটকন আর কাঁঠালে হাত দিয়ে ফটোসেশনে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কাজল ভাইয়ের বেয়াই আব্দুল কাইউম ভুঁইয়া প্যারা মেডিক্যাল ডাক্তার। ভদ্রলোক বেশ অতিথিপরায়ণ। নানা পদের পিঠা আর সদ্য পাড়া লটকন হাজির নাশতা হিসেবে। সেসবের স্বাদ নিয়ে ছুটি লটকনের রাজ্য বটেশ্বর গ্রামে। সেখানে আছেন তরুণ কলেজ শিক্ষক কবির ভাই। তিনিও ঘুরে বেড়াতে বেশ পছন্দ করেন। ট্রাভেলার্স নরসিংদীর অ্যাডমিন তমালের সূত্রে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। কবির ভাইয়ের নিজস্ব লটকনের বাগান আছে সেই বটেশ্বর গ্রামে। সেটিই দেখতে যাচ্ছি আমরা।

পুরো নরসিংদীর সব জায়গাই নানা ফল আর সবজির জন্য বেশ বিখ্যাত। তবে নরসিংদীর দুটি উপজেলা বেলাব ও শিবপুরে মূলত লটকনের বেশি ফলন হয়ে থাকে। তার মধ্যে বটেশ্বর, লাখপুর, আজলিতলা, উয়ারী ও মরজাল গ্রাম বেশ প্রসিদ্ধ।

ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক থেকে বাঁ দিকের মরজালের সরু পথে গাড়ি ঢুকতেই চোখে ধরা দেয় এক অন্য রকম প্রকৃতি। যতই এগোতে থাকি ততই যেন মুগ্ধতা বাড়তে থাকে। পিচঢালা সরু সড়কের দুই পাশে শুধু নানা ধরনের ফল আর সবজিক্ষেতের লুটোপুটি। জয়নগর চৌরাস্তার মোড় থেকে বটেশ্বর গ্রামের পথ ধরে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, ধীরে ধীরে যেন ডুবে যাচ্ছি শত শত গাছে ঝুলে থাকা লটকনের স্তূপে। আধা ঘণ্টার মধ্যেই কবির ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলো। তিনি মোটরসাইকেলে কিছুটা পথ এগিয়ে এসে তিন রাস্তার মোড় বটেশ্বর বাজারে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। প্রথমেই যেতে হলো তাঁর বাড়িতে। সেখানে পিঠা-পুলি, কাঁঠাল, লটকন দিয়ে করলেন আপ্যায়ন। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম, ঈদের সময় এ অঞ্চলে অতিথিদের ফুল-পাতা-পিঠা দিয়েই আপ্যায়নের রেওয়াজ।

এই গ্রামের প্রতিটি বাড়ির আঙিনায়ই রয়েছে লটকনগাছ। আছে লটকনের পরিকল্পিত বাগান। কোনো কোনো গাছে তো ৩১৫ কেজি পর্যন্ত লটকন ধরে। এসব গ্রামের বেশির ভাগ পরিবারই লটকন বিক্রির ওপর নির্ভরশীল।

‘দে-ছুট’-এর সদস্যরা কবির ভাইয়ের বাগানসহ বিভিন্ন বাগান ঘুরে দেখতে থাকে। সঙ্গে থাকা কবির ভাই বলতে লাগলেন, গোলাকৃতির এই ফল মাত্র এক দশক আগেও অনেক জেলার মানুষের কাছে জংলি ফল হিসেবেই পরিচিত ছিল। এখন এটি অর্থকরী ফসলে পরিণত হয়েছে। থোকায় থোকায় এই ফল একেবারে গাছের গোড়া থেকে মগডাল পর্যন্ত ধরে থাকে। পাকা ফল হলদে ও অনেকটা জাফরান রঙের, আর কাঁচা অবস্থায় প্রায় সবুজ রঙের হয়ে থাকে।

লটকন ফল জুন থেকে আগস্ট—এই তিন মাস গাছে ধরে। এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ‘সি’। অন্যান্য ফলের চেয়ে লটকনে আয়রনের পরিমাণও বেশি।

লটকন ফলের জন্য ময়মনসিংহ, গাজীপুর, নরসিংদী—এই তিন জেলা বেশ খ্যাত। তবে নরসিংদীর লটকন আকার ও স্বাদে অন্য দুই জেলার চেয়ে বেশ বড় ও সুস্বাদু। দেশের মোট উৎপাদনের ৮০ শতাংশই উত্পন্ন হয় এই নরসিংদীতে। আর মরজাল হলো লটকনের বৃহৎ পাইকারি বাজার। লটকন কেনার জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে পাইকাররা আসেন। বর্তমানে লটকন দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা হয়। দিন শেষে গাছের লটকন চেখে আর পছন্দমতো লটকন কিনে কাজল ভাইয়ের বাড়ি রায়পুরার পথ ধরি। সেখানে পৌঁছে দেখি আরেক এলাহি কাণ্ড। নানা রকম খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। সেসবের মধ্যে পছন্দের কাঁঠালপাতার পিঠা থাকায় বেশ পুলকিত হলাম। ভর সন্ধ্যায় পেঁচানো সিঁড়ি বেয়ে যখন আড্ডার জায়গায় উঠি, তখন মনে হলো, যতটুকু ক্লান্তি ছিল তা যেন নিমেষেই উধাও। চারপাশে শুধু গাছগাছালি আর সবজির ক্ষেত। যেন বিশাল সবুজ ভূখণ্ডের মধ্যে আমরা কয়েকটি মানবসন্তান। ধীরে ধীরে সবুজ যেন গ্রাস করতে থাকে আমাদের।

ছবি : মুস্তাফিজ মামুন

 

কিভাবে যাবেন

ঢাকার সায়েদাবাদ বা উত্তরা থেকে নরসিংদীর মরজাল বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পরিবহনভেদে জনপ্রতি ভাড়া পড়বে ৮০ থেকে ১১০ টাকা। কমলাপুর থেকে ট্রেনেও মরজাল রেলস্টেশনে নামা যাবে। মরজাল থেকে অটো বা রিকশায় ঘুরে বেড়ান লটকনবাগানে।


মন্তব্য