kalerkantho


অন্য কোনোখানে

লাভার এক বৃষ্টি বিকেলে

সজল জাহিদ   

১৯ জুন, ২০১৭ ০০:০০



লাভার এক বৃষ্টি বিকেলে

ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি, কালিম্পং হয়ে যখন লাভা বাজারে পৌঁছলাম, তখন দুপুর গড়িয়ে বিকেল। কিন্তু মেঘে ঢেকে থাকা আকাশ আর পুরো ন্যাওরাভ্যালি জঙ্গলে জেঁকে বসা কুয়াশা দেখে মনে হলো যেন সন্ধ্যা হয়ে গেছে!

যতটা সম্ভব কম খরচে সেদিনের রাতের ঠিকানা খুঁজে পেতে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট ইট-পাথরের বাড়িগুলোয় ঢু মারতে থাকলাম। কিন্তু বেশ কিছু লজ থাকা সত্ত্বেও শুধু পর্যটন মৌসুম না হওয়ার কারণে কোথাও থাকার তেমন কোনো জায়গা পেলাম না। সাধারণত এই সময়টায় এখানে কেউ বেড়াতে আসে না। স্থানীয়রা পর্যটকদের জন্য বরাদ্দকৃত ঘরগুলো অন্য কাজে ব্যবহার করছে। সে কারণে খালি বা পর্যটকদের দেওয়ার মতো কোনো পরিচ্ছন্ন বা উপযোগী ঘর দিতে পারল না। আবার ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে এখানে খাবার হোটেলও নেই!

এখন তাহলে উপায়? থাকব কোথায়, আর খাব বা কী? সেই চিন্তায় বেশ খানিকটা হতাশ হয়ে ভেজা রাস্তার এক পাশে বসেই পড়লাম। আর সব সময়ের জন্য ব্যাগে রাখা নিরাপত্তা সরঞ্জাম থেকে বের করলাম কেক আর কোক। আপাতত এ দিয়েই না হয় পেট মহাশয়কে ঠাণ্ডা করি? তারপর কোনো না কোনো উপায় খুঁজে বের করবই ইনশাল্লাহ। বেশ সময় নিয়ে আয়েশ করে কেক আর কোক দিয়ে দুপুরের লাঞ্চ শেষ করলাম। এরপর থাকার জায়গা খুঁজে বের করতে আবার হাঁটা শুরু করলাম।

এবার লাভা বাজার থেকে একটু নিচে নেমে যেতে শুরু করলাম। একটু সামনে এগিয়ে কয়েকটি জায়গায় খুঁজতেই একজন নিজে থেকেই এগিয়ে এলেন। জিজ্ঞেস করলেন, ‘রুম চাই?’ শুনে মনে মনে ভাবলাম, বাহ বেশ তো! এ তো মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। তাঁকে বলায় তিনি কাঠের দোতলায় একটি রুম দেখালেন। সঙ্গে বেশ বড় বাথরুম, গরম পানি, টিভি (যদিও সেটা অচল ছিল)। বাড়তি হিসেবে ঘরের জানালা দিয়ে পাহাড়ের সারিও দেখা যায়। মনে মনে খুশি হলেও খানিকটা ভয়ও পাচ্ছিলাম। ভাড়া না আবার কত চেয়ে বসে? কিন্তু অবাক করে দিয়ে ৬০০ টাকা ভাড়া চাইলেন। বাঙালির স্বভাব তো, দরদাম তো একটু করতেই হয়, নইলে কি আর মান থাকে? শেষমেশ ৪০০ টাকাতেই রফা করলাম। বাড়তি হিসেবে কেয়ারটেকারকে দিলাম ৫০ টাকা। এরপর গরম পানিতে একটা আরামদায়ক গোসলের পর হালকা বিশ্রাম সেরে নিলাম। টিপটিপ বৃষ্টিটা তখনো ঝরছে। কিন্তু এমন মোহময় পাহাড়ি বিকেল আমাকে রুমে আটকে রাখবে সে সাধ্যি আছে কার? তাই বেরিয়ে পড়লাম ওই বৃষ্টি উপেক্ষা করেই।

দুই পাশের পাহাড়ি ঘরবাড়িগুলোকে পাশ কাটিয়ে ধীরে ধীরে রাস্তা ধরে নিচে নেমে যাচ্ছি। একটু নেমে যেতেই চোখে পড়লও লাভার বর্ণিল মনেসট্রি বা মঠ। গেট খোলাই ছিল, তাই কিছু না ভেবেই ঢুকে পড়লাম। প্রবেশ পথেই পেয়ে গেলাম স্থানীয় এক ছেলেকে। পড়াশোনা করে শিলিগুড়িতে, কলেজ বন্ধ থাকায় বেড়াতে এসেছে। ওর সঙ্গে ঘুরে ঘুরে দেখলাম লাভার দৃষ্টিনন্দন মঠ, পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে অপূর্ব কারুকার্যময় স্থাপনা। এরপর সেই বৃষ্টির মধ্যেই হেঁটে হেঁটে রওনা হলাম মঠের চূড়ার উদ্দেশ্যে। পিচ ঢালা পথ বৃষ্টিতে ভিজে হয়ে উঠেছে পিচ্ছিল। পাহাড়ের পিঠ কেটে বানানো হয়েছে অপূর্ব সেই রাস্তা। দূরে পাহাড়ে ওঠার সিঁড়িগুলো দাঁড়িয়ে আছে ধাপে ধাপে। ছেলেটা জানাল, আকাশ মেঘলা না থাকলে ওখান থেকেই দেখা যায় বরফে মোড়া কাঞ্চনজঙ্ঘা!

ওখান থেকে দূরে দেখা যাচ্ছিল সিকিমের পাহাড়, গ্রাম, রাস্তা, ছোট ছোট গাড়ির ছুটে চলা। ছোট-মাঝারি আর বড় বড় সব পাহাড়ের সারি দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়ের সঙ্গে বন্ধু হয়ে। হেঁটে যাচ্ছিলাম, আর দূর থেকে সেই সব পাহাড় শ্রেণি দেখে মনের আক্ষেপে পুড়ছিলাম।

প্রায় ১০-১৫ মিনিট হেঁটে পৌঁছে গেলাম মনেসট্রির চূড়ায়। ওখানে গিয়ে পেয়ে গেলাম একটা কফি শপ। অবাকই হলাম। ভাবতেই পারিনি এখানে লাভার মতো এই প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রামের এই পাহাড় চূড়ায় দেখা পেয়ে যাব কোনো কফি শপের, যেখানে পাওয়া যাবে ধোঁয়া ওঠা, চনমনে উষ্ণ কফি! আহ! আমাকে আর পায় কে? অনেক দিন আগে দেখা স্বপ্নটা যেন বাস্তবে ধরা দিল। সেই স্বপ্নটা ছিল অনেকটা এমন—ছাতা মাথায় কোনো এক পাহাড়ের চূড়ায় বসে ঝুম বৃষ্টি দেখতে দেখতে ঠোঁটে ছোঁয়াচ্ছি ধোঁয়া ওঠা গরম কফির মগ। সেই স্বপ্নের মধ্যে ছিল এক ধরনের অপার্থিবতা।

ঠিক সেই অপার্থিবতা যেন নেমে এসেছিল এই পার্থিবতায়, যখন হাতে নিয়েছিলাম এক মগ ধোঁয়া ওঠা কফি, মাথায় রেখেছিলাম ছাতা আর লাভার পাহাড়ের চূড়ায় হেঁটে বেড়িয়েছিলাম ঝুম বৃষ্টিতে! আহ, সেই মুহূর্তটুকু যেন পরিণত হয়েছিল স্বর্গীয় এক মুহূর্তে!

মনে মনে কৃতজ্ঞ হয়েছিলাম বিধাতার কাছে, এই জন্মের কাছে, পৃথিবী, পাহাড়, বৃষ্টি আর এমন বর্ণিল আর নান্দনিক একটা জীবনের কাছে। জীবনটা সত্যি সুন্দর।

ছবি : লেখক

 

 

কিভাবে যাবেন

দার্জিলিং জেলার একটি প্রত্যন্ত পাহাড়ি গ্রাম ‘লাভা’। প্রথমে যেতে হয় ঢাকা থেকে শিলিগুড়ি হয়ে কালিম্পং। তারপর ওখান থেকে লাভা। দল ভারী হলে শিলিগুড়ি থেকে সরাসরি রিজার্ভ জিপে করেও যাওয়া যায়। চার, ছয় ও আটজনের দল হলে খরচটা অনেক কমে যাবে।


মন্তব্য