kalerkantho


অন্য কোনোখানে

হঠাৎ করেই কৃষ্ণবাবুর বাড়িতে

মো. জাভেদ হাকিম   

২০ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



হঠাৎ করেই কৃষ্ণবাবুর বাড়িতে

জমিদার কৃষ্ণপ্রসাদ রায় চৌধুরীর বাড়ি

হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত, যে জায়গার টিকিট পাওয়া যাবে সেই জায়গায়ই ছুটব। বৃহস্পতিবারের রাত। খোঁজ লাগাই বাস কাউন্টারগুলোতে। জয়পুরহাট, সিলেট, বড়লেখা, বান্দরবান—যেকোনো এক জায়গার হলেই হয়। নাহ, কপাল খারাপ। কোনো টিকিটই জুটল না। অগত্যা কী আর করা, রাত ১১টায় তানভীরকে রেখেই মোস্তাকের মোটরসাইকেলে ছুটি মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত পুছুম ঝরনার পথে।

জ্যামের জন্য কাঁচপুর ব্রিজে আমাদের মোটরসাইকেলের চাকা কিছুটা মন্থর হয়ে আসে। কোনোমতে ব্রিজ থেকে নেমেই দেখি সিলেট মহাসড়কের পুরাই ফাঁকা। গান গাইতে গাইতে একটানে নরসিংদীর ইটাখোলা এলাকায়।

চায়ের তৃষ্ণা পেতেই পথের ধারের চায়ের স্টলে ‘টি ব্রেক’। তাতে কাজ হলো। চাঙা দেহে যাত্রা শুরু হলো আবার। বাইকের যাত্রী তিনজন হওয়ায় রনিকে প্রায় বাইকের তেলের ট্যাংকের ওপরে বসেই চালাতে হচ্ছে। গভীর রাত। সুনসান নিরিবিলি হাইওয়ে। হঠাৎ হঠাৎ বহু চাকার লরিগুলো সাক্ষাৎ যমদূতের মতো ভোঁ করে এসে শাঁ করে আমাদের পাশ দিয়ে চলে যায়। ভৈরব পৌঁছার ঠিক ১০-১২ মিনিট আগে বাইকের পেছনের চাকাটা পাংচার হয়ে যায়। ঘুটঘুটে অন্ধকার। আশপাশে জনবসতি নেই। কেমন যেন ভুতুড়ে পরিবেশ। টর্চের আলোতে চাকা নিয়ে গবেষণার নিষ্ফল চেষ্টা, অতঃপর বাইক চড়ল পিকআপে! ভৈরব গিয়ে দেখি ভলকানাইজিংয়ের দোকানগুলোও বন্ধ। এ সময় এসব খোলা থাকার কথাও নয়। এক চা ওয়ালার কাছে বাইক বুঝিয়ে দিয়ে পাশের এক আবাসিক হোটেলে হাজির হই। আমাদের ধাক্কাধাক্কিতে বিরক্তি চোখেমুখে নিয়ে দেখা দেন ম্যানেজারবাবু। সকালের লাখ টাকার ঘুমটার ১২টা বাজালাম বোধ হয়। কী আর করা, কাস্টমার বলে কথা! মুচকি হেসে বয়কে রুম বুঝিয়ে দিতে বলেন।

রুমে ঢুকে ঘড়ি দেখি। ভোর হতে আরো তিন ঘণ্টা বাকি। ঘুম বাদ দিয়ে যাত্রাপথের চুলচেরা বিশ্লেষণে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। বাইকের যে হাল, পুছুম ঝরনা পর্যন্ত কি যাওয়া যাবে কিংবা যাওয়াটা কি আদৌ ঠিক হবে? অবশেষে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পর্যন্ত যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই।

সকালের প্রথম ও প্রধান কর্মটি হয়ে দাঁড়ায় চাকা মেরামত। অতঃপর ডিম-পরোটা আর ডাবের পানি দিয়ে হয় নাশতা পর্ব। মোটরবাইক এবার ছোটা শুরু করল ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলার চর সোনারামপুরের উদ্দেশে। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতুতে খানিক বিরতি। প্রমত্তা মেঘনা নদীর ওপর রেল ও সড়ক সেতু দুটি পাশাপাশি। অসাধারণ সব দৃশ্য। সেতু থেকে নেমেই বাঁয়ে মোড় নিয়ে ঢুকে যাই আশুগঞ্জ বাজারের দিকে। সুবিধামতো স্থানে বাইক রেখে খেয়ায় নদী পার হয়ে সোজা চর সোনারামপুর ঘাটে। সামনে ঝুপড়ি ঘরের ঘিঞ্জি বসতি আর সেসবের পেছনে বিশাল সব অট্টালিকার সারি। প্রথম দর্শনে ভালো লাগল না। কিছুদূর হেঁটে চরের মাঝামাঝি গিয়ে আবিষ্কার করি এক ভিন্ন পরিবেশ। তপ্ত রোদে সাদা বালি চিকচিক করছে। তাতেই হেঁটে বেড়াই। এক পাশে সাদা বালি, আরেক পাশে সবুজ ঘাসের গালিচা। চরের উত্তর-পূর্ব কোণে রয়েছে বিদ্যুতের বিশাল টাওয়ার আর শেষাংশে শ্রমজীবী ও জেলেদের পরিবার।

আবার গুদারা পার হয়ে নাসিরনগর। পথে এক গ্যাস স্টেশনে মোটরবাইক রেখে সিএনজিতে চেপে বসি। বিস্তীর্ণ হাওরের মধ্যে পিচঢালা পথ! কাঁচা-পাকা ধানের মৌ মৌ ঘ্রাণ আর যত দূর চোখ যায় শুধু ফসলের মাঠ।

প্রথমে ঢু মারি গোকর্ণ সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশে নবাব স্যার সৈয়দ শামসুল হুদার বাড়িতে। অযত্ন-অবহেলায় জীর্ণ সেটা। দায়িত্বশীল কাউকে না পাওয়ায় বাড়িটি সম্পর্কে কিছু জানা গেল না। ওদিকে জুমার নামাজের তাড়া, তাই এগিয়ে যাই তিতাস নদীর পারে হরিপুরের দিকে। নামাজ আদায় করে জমিদার কৃষ্ণপ্রসাদ রায় চৌধুরীর বাড়িতে ঢুকি।

নয়নাভিরাম তিতাস নদীর তীর ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছিল এই স্থাপনা। এটার দৃষ্টিনন্দন নির্মাণশৈলীই বলে দেয়, জমিদারবাবু খুব শৌখিন মানুষ ছিলেন। ২০ একর নিয়ে গড়া দোতলা বাড়িতে আছে ২০০ কক্ষ। এখনো বাড়িটি হরিপুর গ্রামে শির উঁচু করে জানান দেয় জমিদারি আভিজাত্য। জমিদারের বংশধরদের কেউ আর এখানে থাকেন না। তবে বেশ কিছু হিন্দু পরিবারের দেখা মিলল। সংস্কারের অভাবে দেয়াল থেকে পলেস্তারা খসে পড়েছে। প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের শেষ ছবি ‘ঘেটুপুত্র কমলা’র শুটিং হয়েছিল এখানেই। বেশ কিছুটা সময় বাড়িটার ভেতরে-বাইরে ঘুরলাম। তিতাস নদীতে বাঁধানো ঘাট আছে একটা, জমিদার বাড়ির সংলগ্ন। তিতাসের পানিতে গোসলের লোভ সামলাতে পারলাম না। নেমে পড়লাম।

বেলা প্রায় ৩টা, পেটে পড়েছে টান। পেটপূজার জন্য হাজির হলাম হরিপুর বাজারে। হোটেলটা সাধারণ হলেও খাবার অসাধারণ। খাবার শেষে খাঁটি দুধের দই চাখতে ভুললাম না।

বাইকের চাকা আবার ঘুরল। এবার যাচ্ছি সরাইলের দক্ষিণ আরিফাইল গ্রামে। এখানে আছে মোগল আমলের একটি মসজিদ। তৈরির সময়কাল ১৬৬২ সাল। স্থানীয়দের কাছে ‘আইড়ল মসজিদ’ নামেই পরিচিত এটি। আছরের নামাজ আদায় করে কিছুক্ষণের জন্য দাঁড়াই মসজিদ লাগোয়া বিশাল দিঘির সামনে। এরপর অসাধারণ কিছু সুখস্মৃতি নিয়ে ঘরে ফিরি।                                     

ছবি : লেখক

 

কিভাবে যাবেন

বাস, ট্রেন—দুইভাবেই যাওয়া যাবে। বাস ছাড়ে মহাখালী ও সায়েদাবাদ থেকে। সরাইলের আবদুল কুদ্দুস মাখন (বিশ্ব রোড) চত্বর পর্যন্ত বাস ভাড়া ২০০-৩০০ টাকা। এখান থেকে নাসিরনগর ও সরাইল যেতে হলে সিএনজি নিতে হবে। পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার জন্য ভাড়া ৬০০ থেকে ৯০০ টাকা


মন্তব্য