kalerkantho


৭ই মার্চের ভাষণ : কথার শিল্প

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

১৬ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



৭ই মার্চের ভাষণ : কথার শিল্প

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ ঢাকার রেসকোর্স মাঠে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে অসাধারণ ভাষণটি দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সক্রিয় পর্যায়টির সূচনা ঘোষণা করেছিলেন, এ বছর জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংগঠন বা ইউনেসকো তাকে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। ইউনেসকো বলেছে, এটি বৈশ্বিক স্মৃতির এক প্রামাণ্য দলিল, অর্থাৎ মানবতার স্মৃতিতে এটি চিরজাগরূক থাকার মতো একটি বক্তৃতা। মাত্র ১৮-১৯ মিনিটের এই বক্তৃতা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বক্তৃতাগুলোর অন্যতম, যা বঙ্গবন্ধুর ওজস্বী বাগ্মিতার জন্যই শুধু নয়, একটি জাতিকে অনুপ্রাণিত করে, আন্দোলিত করে স্বাধীনতা ও মুক্তি অর্জনের পথে নামতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের জন্যও যা চিরস্মরণীয়। এই বক্তৃতাটি যখন দিচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু, ৭ই মার্চের সেই অপরাহ্নে মঞ্চের ৪০-৫০ ফুট দূরত্বে বসে আমি তা শুনছিলাম। আমি ইউনেসকোর স্বীকৃতিতে মোটেও বিস্মিত হইনি; যা বরং একটুখানি হলেও বিস্ময় জাগিয়েছে তা এই স্বীকৃতিটি এত দেরিতে আসায়। এর পেছনে যাঁরা কাজ করেছেন, তাঁদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা। এখন অন্তত একাডেমিক একটি আগ্রহ থেকেও, বিদেশিরা ভাষণটি শুনবে। আমার মতো তারা হয়তো শিহরিত হবে না। কিন্তু ভাষণটির গুরুত্ব অনুধাবন করে নিশ্চয় এর পেছনের-সামনের ইতিহাসটি জানতে তারা আগ্রহী হবে। পৃথিবীর ইতিহাস ও পুঁজি-বাস্তবতা আমাদের জানায়, একটি জাতির প্রতি বিশ্বে আগ্রহ জন্মায় তখনই, যখন সেই জাতি নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে থাকে, তার অর্থনৈতিক ও অন্যান্য অর্জন তার সীমান্ত ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বের অঙ্গনে অভিঘাত রুখতে থাকে। বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের চওড়া পথে পা রেখেছে। এখন এমনিতেই অনেক মানুষ বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। তার ওপর যদি বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি বিদেশের মানুষকে এর অন্তর্নিহিত সত্যগুলোর প্রতি মনোযোগী করতে পারে, তাহলে তাদের সমীহ আরো বেশি হবে।

আমি রেসকোর্সে বসে ভাষণটি শুনেছি বলে বলতে পারি, এ ছিল কথার এক অনুপম শিল্প। মানুষকে জাগানোর শক্তি এর তুলনাহীন। সেদিন মাঠে লাখ লাখ লোক ছিল। তারা সবাই বাড়ি ফিরেছে চোখে স্বাধীনতার স্বপ্ন নিয়ে। এবং ঘরে ঘরে অচিরেই তারা দুর্গ গড়ে তুলেছে। তা না হলে শত্রুরা আরো ধ্বংসলীলা চালাত, আরো প্রাণ সংহার করত।

৭ই মার্চের ভাষণটি প্রকৃত অর্থেই ছিল আমাদের স্বাধীনতার পথনির্দেশক। এই ভাষণে বঙ্গবন্ধু একদিকে একাত্তরের মার্চ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের একটি সারাংশ দিয়েছেন, অন্যদিকে বাঙালি কেন প্রতিরোধ গড়ে তুলল পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে, কেন পাকিস্তানিদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে তারা যুদ্ধে নামবে, তার একটি যৌক্তিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ভাষণে তিনি একদিকে পাকিস্তানি শাসকদের কাছে কয়েকটি শর্ত উত্থাপন করেছেন, যেকোনো আলোচনার আগে অবশ্যপালনীয় হিসেবে, অন্যদিকে তাদের বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাদের কোনো অপকর্ম আর সহ্য করা হবে না। তিনি তাঁর স্বজাতিকে প্রস্তুতি নিতে বলছেন স্বাধীনতা ও মুক্তিসংগ্রামের। এই ভাষণের যেসব অর্থ পাকিস্তানিরা পড়ল, তা তাদের কাছে এ বিষয়টি পরিষ্কার করে দিল, বাঙালি এখন ‘হুকুম দেবার’—শুধু হুকুম পালনের নয়—অবস্থানে পৌঁছে গেছে। বঙ্গবন্ধু অফিস-আদালত, ট্রেন-বাস ও নৌযোগাযোগ, ব্যাংক-বীমা ও সরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে কিছু নির্দেশনা দিলেন, যেগুলো মার্চজুড়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে পালন করা হলো। একটি ১৮ মিনিটের ভাষণে এত বিষয় সন্নিবেশিত হলো, এত ভিন্ন সুর তাতে বাজল এবং রেসকোর্সে উপস্থিত প্রতিটি মানুষের কাছে বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি বাণী খুব পরিষ্কারভাবে পৌঁছে গেল—এ বিষয়টি আমাকে এখনো বিস্মিত করে। অথচ এটি ছিল একটি কাজকেন্দ্রিক বক্তৃতা। এটি বঙ্গবন্ধু দিয়েছিলেন এমন এক সময়ে, যখন বাঙালি বুঝতে পেরেছিল, তাদের নিয়তি আলাদা। পথ ও গন্তব্য আলাদা এবং অপেক্ষা করছিল সব বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব তাদের জানাবেন এখন তাদের কী করণীয় এবং করণীয়গুলো পালনের ও সম্পাদনের পথগুলো কী। বঙ্গবন্ধু সেই কর্তব্য করলেন বটে, কিন্তু একই সঙ্গে বাঙালির চোখে স্বাধীনতার স্বপ্নটি তুলে দিলেন; এবং এখানেই তিনি থেমে থাকেননি, তিনি বাঙালির হাতে প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় অস্ত্রটিও তুলে দিলেন—এবং তা ছিল আত্মবিশ্বাস।

ইউনেসকোর স্বীকৃতি কোনো দিনই আসত না, যদি ভাষণটি শুধু একটি রাজনৈতিক বক্তৃতা হতো, অথবা এতে উসকানি অথবা প্রতিহিংসার কিছু থাকত। আমি বক্তৃতাটি শুনেছি, আমার অনেক বন্ধুও শুনেছে। সেই রাতে এবং তারপর অনেক রাতে ও দিনে ভাষণটি নিয়ে আমাদের আলোচনা হয়েছে। আমাদের মনে হয়েছে, এটি দিয়েছেন এমন এক নেতা ও পথপ্রদর্শক, তিনি কোনো দলের নন, সারা দেশের। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ‘আমাদের’ ওপর গুলি করার জন্য, ‘আমাদের’ হত্যা করার জন্য। কোথাও তিনি দলের কথা বলেননি, বলেছেন বাঙালির কথা। মানুষকে ঘরে ঘরে দুর্গ গড়তে বলেছেন, যার যা আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত হতে বলেছেন, কোথাও বলেননি কোনো দলের কথা। তিনি সেদিন সব বাঙালির প্রাণের মানুষ হিসেবে ভাষণটি দিয়েছিলেন। ইউনেসকো এই বড় ছবিটিকে সমীহ করেছে। একইভাবে তিনি একপক্ষীয় স্বাধীনতা ঘোষণা করেননি, যদিও সেটি করার জন্য তাঁর ওপর দলের অনেক মানুষ থেকে চাপ ছিল। যদি তিনি তা করতেন, তাহলে পাকিস্তানিরা তাদের বর্বরতার একটি বৈধতা পেয়ে যেত।

ইউনেসকো এবং বিশ্ব দেখেছে, একটি জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার রক্ষার সংগ্রাম কতটা শান্তিপূর্ণ ও অহিংস ছিল, এবং এই ভাষণটি সেই বৈশিষ্ট্য ধারণ করেও মানুষকে স্বাধীনতার জন্য স্বপ্ন দেখিয়েছে। বিশ্বের সব নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর জন্যও ভাষণটি শান্তিপূর্ণ সংগ্রামের একটি নির্দেশনা। প্রকৃত অর্থেই এক বৈশ্বিক প্রামাণ্য দলিল। একে স্বীকৃতি দেওয়া মানে মানবতার আত্মপ্রকাশের এবং স্বপ্ন নির্মাণের শক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়া।

 

দুই.

একটু আগে আমি লিখেছি। ইউনেসকোর স্বীকৃতি বঙ্গবন্ধুর ভাষণের আগের ও পরের ইতিহাস জানতে আগ্রহী হবে। আগের ইতিহাসটা মোটামুটি লেখা হয়ে গেছে, যদিও প্রতিবছর আরো নতুন তথ্য ও বিষয়বস্তু আমরা এই জ্ঞানচর্চায় সংযুক্ত করব। ভাষণটির পরের ইতিহাসটি বরং অনেকটা উপেক্ষিত। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর তাঁকেই যখন ইতিহাস থেকে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা শুরু হলো, তাঁর কোনো ভাষণকেই তো আর ছেড়ে দেওয়ার কথা নয়। ব্যাপারটা সে রকমই হলো। যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা চায়নি, পাকিস্তানের জন্য যাদের ভালোবাসা এখনো অন্তহীন, যারা একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর অহংকারের পরিবর্তে অন্য একটি দেশের পদানত থাকাটাকে বেশি ভালোবাসে, তারা ৭ই মার্চের ভাষণকে কখনো গুরুত্ব দিতে চায়নি—একে খাটো করে দেখতে, একে তাচ্ছিল্য দেখাতে চেয়েছে সব সময়। এটি দুর্ভাগ্যের বিষয়। কিন্তু এর চেয়ে বেশি লজ্জারও। পৃথিবীতে আর কোনো দেশ নেই, জাতি নেই, যারা স্বাধীনতাকে, স্বাধীনতার স্থপতি ও রূপকারদের বিতর্কিত করেছে।

শুধু বাংলাদেশ ছাড়া।

এই সেদিনও এক বড় দলের বড় নেতা ৭ই মার্চের ভাষণ নিয়ে তাচ্ছিল্য করলেন। ইউনেসকোর স্বীকৃতি নিশ্চয় তাঁর মনটাকে তিক্ত করেছে।

স্বাধীনতা না এলে এই নেতা কোথায় থাকতেন, কে জানে!

 

তিন.

আমি এদের নিয়ে অবশ্য ভাবি না। আমি ভাবি বরং বঙ্গবন্ধুর সৈনিক বলে যাঁরা নিজেদের পরিচয় দেন, তাঁদের অনেকের কথা। তাঁরা কয়জন বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণের তাত্পর্য বোঝেন, সেই অনুযায়ী নিজেদের কাজকর্ম ও জীবন সাজান, বলা মুশকিল। বঙ্গবন্ধুর ভাষণে মানুষের জন্য ভালোবাসা ও সহমর্মিতা ছিল; বাঙালির সংগ্রামে নিজের জীবন যে বিলাতে হতে পারে, তারও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন (আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি), নেতৃত্বের নৈতিক শক্তির একটা প্রকাশ ঘটিয়েছেন। এসব তাঁর কয়জন অনুসারী গভীরভাবে উপলব্ধি করেন? বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ইউনেসকোর স্বীকৃতি পাওয়ায় সারা দেশে আনন্দ উৎসব হয়েছে। কাগজে এসেছে, এসব অনুষ্ঠানে কোথাও কোথাও অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কলহ হয়েছে, চাঁদাবাজিও হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ভাষণ সারা দিন সারা রাত মাইকে বাজিয়ে বঙ্গবন্ধুর প্রতি সম্মান দেখানো হয় না। ভাষণটিকে আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে নিয়ে সবার মধ্যে আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর কাজে নেমে পড়লে তাঁকে প্রকৃত সম্মান দেখানো হয়।

৭ই মার্চের ভাষণটি একটি বিশ্ব সংস্থা যখন স্বীকৃতি দেয়, তখন কোনো কোনো দল অখুশি হয়। এটি কেন হবে? আমাদের সব অর্জনই তো সমান আনন্দ আর অহংকার নিয়ে উদ্‌যাপন করা উচিত। বিশেষ করে ওই ভাষণটি, যা কোনো দল নয়, সব বাঙালির মুক্তির জন্য ছিল একটি পথনির্দেশক এবং কথার শক্তিতে শক্তিশালী, সমৃদ্ধ এক সৃষ্টিশীল কাজ।



মন্তব্য