kalerkantho

সম্পদের তথ্য গোপন

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

১৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০



সম্পদের তথ্য গোপন

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচন আগামী সোমবার। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থী গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী। তিনি নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় নিজের নামে কিছু স্থাবর সম্পদ দেখালেও নির্ভরশীলদের মধ্যে স্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের কারো নামে স্থাবর সম্পদ নেই বলে দাবি করেছেন।

কিন্তু প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যানুসন্ধান করে গিয়াস উদ্দিনের স্ত্রী মোছাম্মৎ দিলতাজ বেগমের নামে বিপুল স্থাবর সম্পদের তথ্য মিলেছে। উপজেলার ঘুনিয়া ও পুকপুকুরিয়া মৌজায় স্ত্রীর নামে থাকা এসব সম্পদের বিপরীতে দুটি নামজারি জমাভাগ খতিয়ানও কালের কণ্ঠ’র হাতে এসেছে। গিয়াস উদ্দিন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন দীর্ঘদিন ধরে।

উপজেলা ভূমি অফিস সূত্রে জানা গেছে, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ঘুনিয়া মৌজায় সৃজিত বিএস ৪৬৪ নম্বর খতিয়ানে বিএস ১৫৪, ৯৫০ ও ৯৫৭ দাগের আন্দরে ২ একর ৪০ শতাংশ জমি রয়েছে। এ খতিয়ানে জায়গার মালিকের ঘরে নাম রয়েছে ঘুনিয়া এলাকার মৃত মতিয়র রহমানের ছেলে আলী আকবর ও পুকপুকুরিয়া এলাকার গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর স্ত্রী দিলতাজ বেগমের। এর মধ্যে দিলতাজ বেগম ১ একর ২০ শতাংশ জমির মালিক।

একই ইউনিয়নের পুকপুকুরিয়া পানখালী মৌজায় সৃজিত বিএস ৫১৮ নম্বর খতিয়ানে বিএস ৯১০, ৩১৬ ও ৩১০ নম্বর দাগের আন্দরে ৩৯.২৫ শতাংশ জমি রয়েছে। এ জায়গার মধ্যে গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর নামে রয়েছে ১২ শতাংশ ও বাকি ২৭.২৫ শতাংশ জায়গা তাঁর স্ত্রী দিলতাজ বেগমের নামে।

গিয়াস উদ্দিন ও নির্ভরশীলদের মধ্যে স্ত্রী ও সন্তানদের নামে আরো বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে বলে এলাকায় প্রচার রয়েছে। এর মধ্যে উপজেলার সুরাজপুর-মানিকপুর ইউনিয়নের সুরাজপুর মৌজায় বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি রয়েছে। আবার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের রাজার বিল মৌজা, উচিতার বিল মৌজা ও চকরিয়া পৌর এলাকায়ও বিপুল স্থাবর সম্পদের মালিক তারা। ফাঁসিয়াখালী ভেণ্ডিবাজার এলাকায় নিজের বাড়ির সামনে খোদ ছেলের নামে আইয়ুব চৌধুরী ফিলিং স্টেশন থাকলেও এসব স্থাবর সম্পদের তথ্য রহস্যজনক কারণে গোপন করেছেন প্রার্থী।

ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের দিগরপানখালী ফকিরাবাজার এলাকার বাসিন্দারা অভিযোগ করেছে, ফকিরাবাজারে একটি কবরস্থান রয়েছে। শত বছর আগে থেকে স্থানীয় লোকজন এটিকে কবরস্থান হিসেবে জেনে আসছে। কেউ মারা গেলে সেখানে দাফন করে আসছে। কিন্তু গিয়াস উদ্দিন ওই কবরস্থানের প্রায় ২০ শতাংশ জায়গা জবরদখলে নিয়ে সেখানে স্ত্রীর নামে স্থায়ী মার্কেট নির্মাণের চেষ্টা করলে প্রতিহত ও আদালতে মামলা করা হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আদালত নিয়োজিত উকিল এসে সরেজমিন পরিদর্শন করেন এবং তা কবরস্থান হিসেবে প্রত্যয়ন করেন। এরপর আদালত সেখানে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। কিন্তু চতুর গিয়াস উদ্দিন সেখানে বাজার বসিয়ে দিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছেন। এ ঘটনার পর গিয়াস উদ্দিনের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা রুজু হয়। বর্তমানে মামলাটি বিচারিক পর্যায়ে রয়েছে। স্থানীয় লোকজন ওই জায়গা যে কবরস্থান, তা জানতে এবং পবিত্রতা রক্ষা করতে দেয়ালিকাও করেছে।

এদিকে নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হলফনামায় মামলার বিবরণীতে তাঁর নামে দুটি মামলা চলমান রয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। মামলা দুটি বিচারাধীন বলে দাবি করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, বনাঞ্চল উজাড় এবং ইট পোড়ানো নিয়ন্ত্রণ আইনের মামলায় নিম্ন আদালত তাঁকে ছয় মাসের কারাদণ্ড ও ১০ হাজার টাকা জরিমানা করলেও হলফনামায় তা গোপন করেছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ একাধিক নেতা জানান, ‘কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের উচিতার বিল মৌজাসহ কয়েকটি মৌজার সংরক্ষিত বনাঞ্চল ধ্বংসের হোতা গিয়াস। এসব মৌজায় সংরক্ষিত বনের শতবর্ষী মাদার ট্রি, সেগুনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা নিধনের পর কয়েক শ পাহাড় সাবাড় করে মাটি বিক্রি করেছেন। গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন, কর কমিশনসহ সরকারি সংস্থাগুলো নিরপেক্ষভাবে এসব বিষয় অনুসন্ধান করলে সঠিক তথ্য বেরিয়ে আসবে।

এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য গিয়াস উদ্দিন চৌধুরীর ব্যবহৃত মুঠোফোনে কল করলেও তিনি ধরেননি।

প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী আওয়ামী লীগ নেতা ফজলুল করিম সাঈদী বলেন, ‘গিয়াস উদ্দিন হলফনামায় বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য গোপন করেছেন। এর মধ্যে নিজের ও নির্ভরশীলদের নামে থাকা বিপুল স্থাবর সম্পদের তথ্য গোপন করেন। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু নির্যাতনের অভিযোগে এবং কবরস্থান দখলের অভিযোগে মামলা থাকলেও তা হলফনামায় দেখাননি। বিষয়গুলো জানার পর আমি নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি।’

সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তা ও চকরিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. সাখাওয়াত হোসেন এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে বিষয়টি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের সময় উত্থাপন করা উচিত ছিল বলে মনে করেন তিনি।

 

 



মন্তব্য