kalerkantho


অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনা লালন করেছে সংবাদ

তোয়াব খান

১১ জানুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক চেতনা লালন করেছে সংবাদ

প্রগতিশীলদের ছাতা হিসেবে কাজ করেছে ‘সংবাদ’। আমার মনে পড়ছে হ্যারল্ড ইভান্স নামের লন্ডনের এক নামি সাংবাদিকের কথা। তিনি ‘সানডে টাইমস’-এর সম্পাদক ছিলেন দেড় যুগেরও বেশি। তিনি বলেছিলেন, লন্ডনে সাংবাদিক তৈরি হয় ফ্লিট স্ট্রিটে আর তাঁর সংলগ্ন ক্যাফেগুলোতে। আর এখানে ঢাকার বেলায় আমরা সম্ভবত বলতে পারি, সংবাদ গড়েছে সাংবাদিক। আরেকটি কথা অবশ্য বলা দরকার, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বাম গণতান্ত্রিক চেতনা লালন ও সম্প্রসারণ করেছে সংবাদ

 

পঞ্চান্নর শেষ আর ছাপ্পান্নর শুরুর দিক। আমি সংবাদে শিক্ষানবিশ সাব এডিটর। আমার বয়স তখন ২২। মাত্রই ‘সংবাদ’ মুসলিম লীগ কর্তৃপক্ষের হাত থেকে আহমদুল কবির সাহেবদের হাতে এসেছে। তিনি তখন ব্যবস্থাপনা পরিচালক। আরো তিনজন ডিরেক্টর ছিলেন—নাসির উদ্দীন সাহেব, সৈয়দ নূরউদ্দীন আর জহুর হোসেন চৌধুরী। প্রথমজন জেনারেল ম্যানেজার, দ্বিতীয়জন বার্তা সম্পাদক, আর সম্পাদক ছিলেন জহুর হোসেন। একদিনের ঘটনা—আমি অফিসে গিয়ে দেখি তেমন কেউ নেই, শিফট ইনচার্জ বা এ রকম কেউ। নূরউদ্দীন সাহেব আসেন কি আসেন না ঠিক নেই। এটা ছাপ্পান্ন সালের ২৩ মার্চের পরের দিন। ২৩ মার্চ তো পাকিস্তান দিবস। পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র চালু করা হয়। একজন প্রখ্যাত আমলা চৌধুরী মোহাম্মদ আলী ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। এ শাসনতন্ত্র মানতে চাইল না পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ। বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল করাচিতেও। করাচি তখন রাজধানী। রেডিওতে খবর শুনলাম অফিসে আসার পথে। তারপর অফিসে এসে এপিপির (অ্যাসোসিয়েট প্রেস অব পাকিস্তান) প্রেস নোট পড়লাম। সব কিছু গুছিয়ে নিয়ে আমি একটি প্রতিবেদন লিখলাম। এর মধ্যে নূরউদ্দীন সাহেব এলেন অফিসে। তিনি পিয়নদের একজনকে বললেন একটি ‘লোকসেবক’ পত্রিকা কিনে আনতে। এটি কলকাতার পত্রিকা। কংগ্রেস পার্টি বের করত। ‘আজাদ’ কলকাতা থেকে চলে আসার পর ওদের প্রেসটি থেকে ‘লোকসেবক’ প্রকাশ করত, ঢাকায় পাওয়া যেত। ‘লোকসেবক’ নিয়ে আসার পর নূরউদ্দীন সাহেব কাঁচি দিয়ে কয়েকটি সংবাদ কেটে তা প্রেসে পাঠিয়ে দিলেন। বললেন এতেই পাতা ভরে যাবে। তারপর হঠাৎ কী মনে করে আমার দিকে তাকালেন। জানতে চাইলেন, আমি কী করছি? প্রতিবেদনটি তাঁকে দেখালে তিনি সম্ভবত খুশি হলেন। বললেন, কালকে আমার সঙ্গে দেখা করবেন। যা-ই হোক, সে কালকে তাঁর দেখা পাইনি। তবে সংবাদে আমার চাকরি পাকা হয়ে গিয়েছিল। আমার বেতন ধরা হয়েছিল ষাট টাকা। অবশ্য পরের মাসে বিশ টাকা বাড়িয়ে আশি টাকা করা হয়েছিল। তবে বেতন যে মাস শেষে পাওয়া যাবে—এমনটি হলফ করে বলা চলত না। সংবাদে এমন সময় অনেকবার এসেছে, পাওনা আদায়ের দাবিতে কর্মীরা সকালে ধর্মঘট ডেকেছে, সন্ধ্যায় কর্তৃপক্ষ ১০-১৫ টাকা করে বরাদ্দ দিত এবং আবার কাজ চালু হতো।

সংবাদ জনমনে বিরাট প্রভাব ফেলতে না পারলেও সাংবাদিকতার একটি ধারা তৈরি করেছিল। আহমদুল কবির সাহেবের আমল থেকেই সংবাদ সেক্যুলার গণতান্ত্রিক ধারা গ্রহণ করেছে এবং ধরে রেখেছে। এখানে আহমদুল কবির সম্পর্কে একটু বলি। আমার মতে তিনি একজন নতুন ধারার শিল্প-উদ্যোক্তা। কোকা-কোলায় যখন বিশ্ববাজার সয়লাব তখন তিনি ভিটাকোলা তৈরি করে এদেশের বাজারে ছাড়লেন। উডপেনসিল ছিল না আমাদের এখানে। তিনি উডপেনসিল বানানো শুরু করলেন।

যা-ই হোক, ফিরে আসি সংবাদে। গোটা পাকিস্তানেরই প্রগতিশীল মানুষের একধরনের অভয় আশ্রম ছিল সংবাদ। এবং এখানেই সংবাদের গুরুত্ব। একবার পশ্চিম পাকিস্তান থেকে মেজর ইসহাক এলেন। তিনি রাওয়ালপিন্ডি কনসপিরেসির (পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের মদদপুষ্ট সেনা অভ্যুত্থান চেষ্টা, ১৯৫১ সাল) মামলার কারণে অভিযুক্ত। মেজর ইসহাক জানতেন সংবাদ অফিসে গেলে এতদঞ্চলের গণতান্ত্রিক-প্রগতিশীল মানুষদের হদিস পাওয়া যাবে। তাই তিনি ঢাকায় এসে প্রথমেই চলে এসেছিলেন সংবাদ অফিসে। কিন্তু পত্রিকাটির সমস্যা ছিল এবং সেটি আর্থিক। মিডিয়া আসলে একটি বিনিয়োগঘন মাধ্যম। আগে সিসার টাইপে কাজ করতে হতো। সাত দিন গেলে টাইপ ভেঙে যেত। ভাঙা টাইপে ভাঙা হরফ ছাপা হতো। কারণ নিয়মিত নতুন টাইপ কেনার টাকা ফান্ডে থাকত না। ভাঙা টাইপে এমনকি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামও এলোমেলো করে দিত। তাই পাঠককে প্রায়ই হতাশ হতে হতো।

তবে সংবাদ একটি বেগবান শক্তি হিসেবে হাজির হতো ক্রান্তিকালে। এমন অনেক ক্রান্তিকালে সংবাদ আন্দোলনের গতিকে বেগবান করেছে। ছাপ্পান্ন সালে পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র ঘোষিত হলো। আবার ওই বছরই মিসরের জাতীয়তাবাদী নেতা জামাল আবদেল নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করলেন। খেপে গেল আমেরিকা ও তার বন্ধুরা। ফ্রান্স, ব্রিটেন আর ইসরায়েল জোট বেঁধে আক্রমণ চালাল মিসরে। বিক্ষুব্ধ পাকিস্তানের মানুষ। পুরানা পল্টনের মুক্তাঙ্গন এলাকায় ছিল ব্রিটিশ ইনফরমেশন সার্ভিসের অফিস। বিক্ষুব্ধ জনতা সেটি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সে আন্দোলনে সংবাদ গতি দিয়েছে। তারপর পাক-মার্কিন সামরিক চুক্তি নিয়ে সোহরাওয়ার্দী আর ভাসানীর মধ্যকার সংকটে সংবাদ ভাসানীর পক্ষে সোচ্চার ছিল। এটি ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধী একটি অবস্থান। এ ছাড়া সাম্রাজ্যবাদবিরোধী অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক আন্দোলনে একটি সুস্পষ্ট ভূমিকা রাখতে সংবাদ সচেষ্ট ছিল। 

সংবাদপত্রে সাংবাদিকদের আর্থিক অবস্থান তথা দুর্গতি নিয়ে কিছু বলার আগে আজকের দিনে বহুল আলোচিত ওয়েজ বোর্ড তথা সাংবাদিক বেতন বোর্ড নিয়ে কিছু বলা প্রয়োজন। আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারির আগেই একটি প্রেস কমিশন গঠিত হয়েছিল। সে কমিশন সাংবাদিকদের জন্য ওয়েজ বোর্ড গঠনের সুপারিশ করেছিল। ১৯৬০ সালে ওয়েজ বোর্ড ঘোষণা করা হয়। ওয়েজ বোর্ডের রোয়েদাদে তিনটি ক্যাটাগরিতে সংবাদপত্রগুলোকে ভাগ করা হয়েছিল। ত্রিশ হাজারের বেশি যাদের সার্কুলেশন, তারা ছিল এ-ক্যাটাগরিতে। বি-ক্যাটাগরিতে ছিল এর চেয়ে কম যাদের, আর সি-ক্যাটাগরিতে মফস্বলের পত্রিকাগুলো তালিকাভুক্ত। সর্বনিম্ন বেতন ধরা হয়েছিল ২৭৫ টাকা, এ-ক্যাটাগরির কাগজের জন্য। এখন এটি কম মনে হলেও তখন কিন্তু সিএসপি অফিসারদের এন্ট্রি বেতন ওই ২৭৫ টাকাই ছিল। কিন্তু দুঃখের ব্যাপার, সংবাদ ওয়েজ বোর্ড বাস্তবায়ন করতে পারেনি। আর্থিক সমস্যা সংবাদের পেছনে লেগেই ছিল। তদুপরি সামরিক শাসনের জাঁতাকলে পড়ে অনেক সংবাদকর্মী সংবাদ ছেড়ে চলে যাচ্ছিল। তবে এ সময় আমার জন্য একটি ভালো ঘটনা ঘটে। লাহোরে আইপিআই (ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট) একটি সেমিনার ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে ছয়জনের যোগ দেওয়ার সুযোগ হয়। ‘ইত্তেফাক’ থেকে শহীদ সিরাজুদ্দীন হোসেন, ‘পাকিস্তান অবজারভার’ থেকে ওয়াহিদুল হকও ছিলেন সে দলে। সংবাদ থেকে কে জি ভাইয়ের (কে জি মুস্তাফা) যাওয়ার কথা ছিল; কিন্তু তিনি তখন পাকিস্তান অবজারভারে যোগ দিয়েছেন, তদুপরি আইয়ুব খানের সরকার তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেলে পুরেছে। এই প্রেক্ষিতে নূরউদ্দীন সাহেব আমাকে লাহোর পাঠালেন। ওই প্রশিক্ষণ কর্মসূচিটি কিন্তু আমাদের সংবাদপত্রজগতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে।

লাহোর সেমিনারে বিশেষজ্ঞ সাংবাদিক হিসেবে অনেকেই ছিলেন। এই মুহূর্তে অমিতাভ চৌধুরীর কথা মনে পড়ছে। তিনি ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম বিষয়ে আমেরিকায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। কলকাতার ‘যুগান্তর’-এ তাঁর ‘নখদর্পণ’ শীর্ষক ধারাবাহিক প্রতিবেদন খুব আলোড়ন তুলেছিল। প্রচারসংখ্যায় সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল যুগান্তর। তাঁর দামোদর ভ্যালি করপোরেশন রিপোর্টের পরে চেয়ারম্যানের চাকরিও চলে গিয়েছিল। বাজেট ধরা হয়েছিল ২০০ কোটি টাকা; কিন্তু খরচ হয়ে গিয়েছিল প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। অমিতাভ চৌধুরী দেখিয়েছিলেন, কোথায় কোথায় কী কী কারণে টাকা নষ্ট হয়েছে। কারা নষ্ট করেছে। কতটা পরিকল্পিত ছিল এগুলো ইত্যাদি। যা-ই হোক, আমরা ঢাকায় ফিরে নতুন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরি করা শুরু করলাম। ইত্তেফাক ছেলেধরা বিষয়ে প্রতিবেদন করল, সংবাদ করল নিষিদ্ধ পল্লী নিয়ে। সংবাদ যেমন কর্মী গড়েছে, আবার গড়ার বড় বড় কারিগরও পেয়েছে। কবি হাবিবর রহমান, কে জি মুস্তাফা, শহীদুল্লা কায়সার, সানাউল্লাহ নূরী, রণেশ দাশগুপ্তের মতো মানুষ পেয়েছে সংবাদ। নূরউদ্দীন সাহেবও কম যেতেন না। ফলোআপ সংবাদ করার ব্যাপারটি নূরউদ্দীন সাহেবই শিখিয়েছেন আমাদের। যেমন এখানে চল ছিল দুর্ঘটনার সংবাদ ছাপার। নূরউদ্দীন সাহেব বললেন, এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর খবরও ছাপানো দরকার। পরে আমরা মূল খবরের অনুষঙ্গ বা পরবর্তী অগ্রগতির খবরও ছাপাতাম।

সংবাদ একবার সরকারকে বেদম নাড়িয়ে দিয়েছিল। ঢাকার কেরানীগঞ্জের গ্রামের ঘটনা। সাত দিনে সেখানে কলেরায় ২০০ জন মানুষ মারা যায়। খবরটি ছাপা হওয়ার পর স্বাস্থ্য দপ্তর খুবই চটে গেল। তারা বলল, মাত্র চারজন মারা গেছে। নারায়ণগঞ্জের এসডিও আরো এককাঠি সরেস। তিনি বললেন, মাত্র একজন মারা গেছে। আমরা পরের দিন দুই শ মৃত ব্যক্তির নাম ছাপিয়ে দিয়েছিলাম। গভর্নর জেনারেল আজম খান খুবই খেপে গিয়েছিলেন স্বাস্থ্য দপ্তরের কর্তাব্যক্তিদের ওপর। তিনি বললেন, ওরা তো নামও ছেপে দিয়েছে। তাহলে আপনারা কিভাবে বলছেন, মাত্র চারজন মারা গেছে? স্বাস্থ্য দপ্তরে রীতিমতো স্বাস্থ্যহানির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল।

আরেকবার খবর ছাপা হলো চালের কেজি ২ টাকায় উঠেছে। খবরটি কিন্তু মারাত্মক। যেখানে চালের মণই ১০ টাকা, সেখানে কেজি ২ টাকা! তো কাজী আনোয়ারুল হক ছিলেন চিফ সেক্রেটারি। তিনি আমাদের ডেকে পাঠালেন। তিনি সাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হক সাহেবের ছেলে। আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন। বললেন যে একটু সামলে কাজ করুন। জানেন তো সামরিক সরকার অনেক কিছুই করতে পারে। জনস্বার্থের পক্ষেই ছিল সংবাদ বরাবর। সংবাদের সাহিত্য পাতা ভালো ছিল বলতে গেলে সব সময়। প্রগতিশীলদের ছাতা হিসেবে কাজ করেছে সংবাদ। আমার মনে পড়ছে হ্যারল্ড ইভান্স নামের লন্ডনের এক নামি সাংবাদিকের কথা। তিনি ‘সানডে টাইমস’-এর সম্পাদক ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, লন্ডনে সাংবাদিক তৈরি হয় ফ্লিট স্ট্রিটে আর তাঁর সংলগ্ন ক্যাফেগুলোতে। আর এখানে ঢাকার বেলায় আমরা সম্ভবত বলতে পারি, সংবাদ গড়েছে সাংবাদিক। আরেকটি কথা অবশ্য বলা দরকার, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও বাম চেতনা লালন ও সম্প্রসারণ করেছে সংবাদ।

চৌষট্টিতে আমি সংবাদ ছেড়ে যাই। আসলে ছাড়তেই হচ্ছিল। যখন ঢুকেছিলাম, আমি ছিলাম হাত-পা ঝাড়া মানুষ। সাংবাদিকতা ছিল নেশার মতো। ধোলাইখালের কাছে মাহুতটুলীতে থাকতাম। প্রবল ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যেও অফিসে আসছিলাম। বাতাস আমাকে ধাক্কিয়ে ধোলাইখালের ব্রিজের এধার থেকে ওধারে নিয়ে গিয়েছিল। তার মধ্যেই ভিজে ভিজে হাজির হয়ে গিয়েছিলাম সংবাদে। একটা ঘোরের মধ্যে কাজ করতাম। কিন্তু পরে বিয়ে করেছি। একটি কন্যাসন্তানের জনক হয়েছি। সংসার তো আর চালাতে পারছিলাম না। সন্তানের কথা ভাবতে হচ্ছিল। তাই সংবাদ ছাড়তে হলো।

[শ্রুতলিখন : আবু সালেহ শফিক]

লেখক : সাংবাদিক

 

আমোদ একটি পারিবারিক কাগজ

১৯৫৫ সালের ৫ মে থেকে ছাপা শুরু। স্থান মফস্বল শহর কুমিল্লা। শহরের পুরাতন চৌধুরীপাড়ার এটি একটি পারিবারিক কাগজ। নাম সাপ্তাহিক ‘আমোদ’। চার পৃষ্ঠার কাগজটির মূল্য ছিল এক আনা। স্বামী-স্ত্রী-সন্তান ও নাতিদের সহযোগিতায় এবং আত্মীয়স্বজন, শুভাকাঙ্ক্ষীসহ অন্য সদস্যদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এখনো পত্রিকাটি বেঁচে আছে। ৬০ বছরের অধিক সময় ধরে একটি পারিবারিক কাগজ টিকে থাকার ঘটনা বিস্ময়কর বটে। আমোদ পরিবার সূত্রে জানা যায়, মরহুম ফজলে রাব্বী একজন ক্রীড়াপ্রেমী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি  খেলাধুলা নিয়েই বেশি মেতে থাকতেন। একটি ক্রীড়া পত্রিকা বের করার পরিকল্পনা করলে অনেকে বলেছিলেন, ‘পাগল নাকি! কুমিল্লার মতো শহরে ক্রীড়া পত্রিকা?’ ভদ্রলোকের জেদ ছিল। ঠিকই আমোদকে ক্রীড়া পত্রিকা হিসেবে প্রকাশ করেন।

ফজলে রাব্বী মারা যান ১৯৯৪ সালে। তারপর তাঁর স্ত্রী শামসুন্নাহার রাব্বী পত্রিকাটির হাল ধরেন। এক স্মৃতিচারণায় শামসুন্নাহার বলেন, ‘বিয়ের পর থেকেই তিনি (ফজলে রাব্বী) আমাকে সাংবাদিকতায় তালিম দিতে শুরু করেন। ছেলে বাকীন রাব্বী এবং মেয়ে আকিলা রাব্বী রিভা, ফাহমিদা রাব্বী রুহি, তারিকা রাব্বী রুনী, ছেলের বউ শাহানা রাব্বী ও নাতি জাহিন রাব্বীকেও তিনি একইভাবে তালিম দিয়ে গেছেন। বাকীন বিগত ২২ বছর ধরে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছে আমোদের।’

১৯৮৫ সালে ইউনেসকো এশিয়ার মধ্যে যে পাঁচটি সফল আঞ্চলিক পত্রিকার তালিকা প্রকাশ করে তার মধ্যে আমোদের নাম আছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আগ পর্যন্ত আমোদই কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, নোয়াখালী, কিশোরগঞ্জ প্রভৃতি এলাকার একমাত্র মুখপত্র হিসেবে কাজ করেছে। আমোদ পরিবারের অন্যতম সদস্য এবং ফজলে রাব্বীর মেয়ে আকিলা রাব্বী রিভা এক স্মৃতিচারণায় বলেন, ‘(বাবা) প্রায়ই আমাকে পত্রিকার জন্য ছবি তুলতে পাঠাতেন। ১৯৭২ সালে দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রথমবারের মতো কুমিল্লা এসে অভয় আশ্রম মাঠে সভা করেন। সে সভায় আমি ছবি তুলতে যাই আমোদের পক্ষ হয়ে। তখন দেশে আর কোনো নারী ছবি তোলার পেশায় ছিলেন কি না তা আমার জানা নেই। সভার ছবি তুলে আমি বঙ্গবন্ধুকে সালাম দিলে তিনি আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলেন, এ যে দেখছি ওম্যান ফটোগ্রাফার। এরপর তিনি আমাকে সস্নেহে তাঁর কাছে ডেকে নিয়ে আদর করলেন।’

 ১৯৫৬ সালের ৫ এপ্রিল আমোদে প্রকাশিত একটি রিপোর্ট ছিল এমন—

‘রিকসাচালক কর্তৃক পুলিশ সুপারের বিদায় সংবর্ধনা

গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রিপুরা জেলার পুলিশ সুপার জনাব ছৈয়দ আলী বসির সাহেবের কুমিল্লা ত্যাগকালে স্টেশনে সমবেত রিকসাচালকগণ জনাব বসিরকে মাল্যদান করেন এবং বসির সাহেব জিন্দাবাদ ধ্বনি করিতে থাকেন। প্রতি উত্তরে জনাব বসির বলেন, আমি রিকসাচালকদের ভালর জন্য বিশেষ চেষ্টামান ছিলাম। শেষে তিনি রিকসাচালকদের মঙ্গল কামনা করেন এবং ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নেন।’

 

আপেল মাহমুদ



মন্তব্য