kalerkantho


ঐতিহ্য

চম্পা বিবির সমাধিসৌধ যেন কালের জীর্ণ কায়া

নওশাদ জামিল   

২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১১ ০০:০০



চম্পা বিবির সমাধিসৌধ যেন কালের জীর্ণ কায়া

ছোট কাটরা চত্বরে শায়েস্তা খান নির্মিত চম্পা বিবির সমাধিসৌধ। ছবি : শেখ হাসান

একদিকে বুড়িগঙ্গার থৈ থৈ পানি। পাশেই অনুপম সৌন্দর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে ছোট কাটরা। মোগল আমলে বুড়িগঙ্গার তীরে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট কাটরাকে এমনই সুন্দর দেখাত। এখনো এর কিছু অংশ দাঁড়িয়ে, তবে তা শীর্ণ দেহ নিয়ে। বর্তমানে ছোট কাটরাকে প্রায় ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। এর পরও দূর-দূরান্ত থেকে এখনো বহু দর্শনার্থী ছোট কাটরায় ছুটে আসে। তারা হয়তো ক্ষণিকের জন্য হলেও স্মৃতিতে মোগল আমলে ফিরে যায়। চকবাজার থেকে সরু গলি পেরিয়ে ছোট কাটরার দেউড়ি। খানিক সামনে এগোলেই পথের পাশে চম্পাতলী। এখানেই চম্পা বিবির সৌধ। বাংলার সুবাদার মির্জা আবুু তালেব ওরফে শায়েস্তা খান নির্মাণ করেছিলেন ছোট কাটরা। এর চত্বরেই অবস্থিত চম্পা বিবির সমাধিসৌধ। এক গম্বুজ, চার কোনা, প্রতিটি পাশে ২৪ ফুট দীর্ঘ সৌধটি এখনো টিকে আছে দুজনের স্মৃতি নিয়ে। চম্পা বিবি কে ছিলেন, এর সঠিক কোনো ইতিহাস পাওয়া যায়নি। কারো মতে, চম্পা ছিলেন শায়েস্তা খানের মেয়ে। আবার কারো মতে, উপপত্নী। তবে বেশির ভাগ ঐতিহাসিক শায়েস্তা খানের 'উপপত্নী' কিংবা হেরেমের প্রিয়তমা সঙ্গিনী হিসেবে চিহ্নিত করেছেন চম্পা বিবিকে। তাঁদের যুক্তি হচ্ছে, দুজনের মধ্যে যদি ওই সম্পর্কের বন্ধন না-ই থাকে, শায়েস্তা খান কেন চম্পা বিবির কবরে অত্যন্ত কারুকাজময় এক গম্বুজের সমাধিসৌধ নির্মাণ করবেন। ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মুনতাসীর মামুনও এই মতের পক্ষে। তিনি বলেন, 'দ্বিতীয়টি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। চম্পা বিবি শায়েস্তা খানের উপপত্নী ছিলেন ধারণা করা হয়।' এর পেছনে যুক্তি উপস্থাপন করে ঐতিহাসিকরা এ-ও মত দেন, চম্পা বিবি ছোট কাটরায় বাস করতেন। তাঁদের যুক্তিটা এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য মনে হবে। কারণ, ছোট কাটরা নির্মিত হয় ১৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে। চম্পা বিবির সমাধিসৌধের শিলালিপি থেকে জানা যায়, এর নির্মাণকাল ১৬৭১ খ্রিস্টাব্দ। ধারণা করা হয়, ছোট কাটরায় সুবা বাংলার অনেক কর্মচারী, শায়েস্তা খানের আত্মীয়স্বজন ছাড়াও ব্যবসায়ী ও আগন্তুক অতিথিরা থাকতেন। শায়েস্তা খানও অবসর সময় কাটাতেন এখানে। তাঁর সেবাযত্নের জন্য কিছু সেবিকা থাকতেন। থাকতেন উপপত্নীরাও। হয়তো তাঁদেরই একজন ছিলেন চম্পা বিবি, যাঁকে শায়েস্তা খান অন্যদের তুলনায় বেশি পছন্দ করতেন। মৃত্যুর পর চম্পার কবরে তাই তিনি নির্মাণ করেন এই সমাধিসৌধ। পরে চম্পা বিবির নামানুসারে চকবাজার থেকে ছোট কাটরার কিছু অংশের নামকরণ হয় চম্পাতলী হিসেবে। পরী বিবির সমাধিসৌধ নিয়ে যতটা আলোচনা হয়েছে, বিশাল আকৃতির এক গম্বুজবিশিষ্ট চম্পা বিবির সমাধিসৌধ ঠিক ততটাই অগোচরে। চম্পা বিবিকে নিয়ে আলোচনা, দর্শনার্থী, কিংবা পর্যটকদের আনাগোনা কম, তবে তাঁর সমাধিসৌধ ঘিরে দখলদারদের পদচারণা বেশি। ইতিমধ্যে দখল হয়ে গেছে সমাধিসৌধের চারপাশের খালি জায়গাটুকু। সেখানে উঠে গেছে বহুতল অট্টালিকা। ফলে চারদিকের দরদালানের ভিড়ে পড়েছে চম্পা বিবির সৌধ। চম্পাতলী হিসেবে জায়গাটা পরিচিত হলেও চকবাজারের পুরনো বাসিন্দা ছাড়া অনেকেই জানেন না এখানে চম্পা বিবির সমাধিসৌধ রয়েছে। পুরান ঢাকার বাইরের বেশির ভাগ মানুষের কাছেও এই সৌধের খবর তেমন করে পেঁৗছায়নি। আর নতুন প্রজন্মের কাছে তো বিষয়টি আরো দূরবর্তী হয়ে গেছে। ছোট কাটরার নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি তমাল জানালেন, 'আমরা অনেক পরে জেনেছি এখানে একটি সমাধি রয়েছে।' অবশ্য, প্রবীণদের কাছে এটি মাজার হিসেবে পরিচিত। চম্পা বিবির মাজার বললেও এটিকে সহজেই চেনেন অনেকে। চম্পা বিবির সৌধের গম্বুজ দেখতে গিয়ে উঠতে হয়েছিল সামনের পাঁচতলা বাড়ির ছাদে। সেখান থেকে সুন্দর দেখাচ্ছিল গম্বুজটি। তবে গলি থেকেও মিনার গম্বুজ চোখে পড়ে, তবে ওপরের দিকে আকাশপানে চেয়ে থাকতে হবে। ভবনগুলোর ফাঁক-ফোকর দিয়ে ভাসবে সৌধটি। সরেজমিনে দেখা গেছে, সৌধের চারপাশ দোকানপাট ঘিরে ফেলেছে। গজিয়ে উঠেছে সুরম্য সব বহুতল ভবন। তবু মাজারের মূল স্থানটি রয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কাটরাসংলগ্ন চম্পা বিবির মাজার চত্বরটিও দখল হয়ে গেছে। সমাধি ভেঙে মাজারের প্রবেশমুখেই নির্মাণ করা হয়েছে দোকানপাট, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ভবন। পুরো সমাধির চারপাশের অংশই বেদখলে। বুড়িগঙ্গার জলজ হাওয়া এখন কাটরার উঁচু দেউড়িতে আসতে পারে না বহুতল ভবনের প্রতিবন্ধকতায়। কিন্তু সূদুর অতীতে ছোট কাটরার ঠিক সামনে দিয়ে বয়ে যেত নদীটি। সারাক্ষণ বইত হু হু করা বাতাস। এখন সেই বুড়িগঙ্গাও সরে গেছে বেশ দূরে। হাওয়া যদিও একটু-আধটু আসে, তবে তা দুর্গন্ধময়। নদীর পানি যে দূষিত হয়ে গেছে!


মন্তব্য