kalerkantho


সবুজে-আলোতে আবাস!

ইমরান হোসেন মিলন   

২১ জুলাই, ২০১৮ ০০:০০



সবুজে-আলোতে আবাস!

মানুষের সৃষ্টি বিভিন্ন দূষণে ও অপরিকল্পিতভাবে সম্পদ ব্যবহারে পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পৃথিবী। এ অবস্থা থেকে রক্ষা পেতে বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। উন্নত বিশ্বে পরিবেশবান্ধব বহুতল ভবন নির্মাণ গুরুত্ব পাচ্ছে একই কারণে। বাংলাদেশে স্বল্প পরিসরে হলেও এ ধরনের ভবন নির্মাণ শুরু হয়েছে। এসব তথ্য নিয়েই সাজানো হয়েছে আজকের নির্মাণ

 

 

ঢাকায় আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা অস্বাভাবিক বেশি। চাইলেও তাই খোলামেলা নির্মাণ করা কঠিন। জায়গার সংকটই প্রধান কারণ। এ বাস্তবতা মেনে নিয়ে ঢাকার কম জায়গায় বেশি মানুষ সংকুলানের লক্ষ্যে তৈরি হচ্ছে বহুতল ভবন। এসব ভবনে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা যুক্ত করা গেলেও যথাযথ পরিবেশ রক্ষা প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বেশির ভাগ বহুতল ভবনই তাই ব্যর্থ হয় এ ক্ষেত্রে।

ব্যতিক্রমও আছে। বলা যায় ‘সাহস করে’ এগিয়ে এসেছে কয়েকটি বাণিজ্যিক আবাসন প্রতিষ্ঠান। এরই মধ্যে তারা রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ‘পরিবেশবান্ধব’-এর নিয়ম মেনে দাঁড় করিয়েছে বহুতল ভবন। এসব ভবনের কয়েকটিতে কার্যক্রমও শুরু করেছে অনেক প্রতিষ্ঠান।

পরিবেশবান্ধব নির্মাণ কী

জলাধার, কৃষিজমি সংরক্ষণ, নির্মাণ এলাকায় সবুজের সমারোহ, প্রাকৃতিক শক্তি কাজে লাগানো, নির্মাণের সময় শব্দদূষণসহ পরিবেশদূষণ কমানো এবং ক্ষতিকর উপকরণ ব্যবহার ছাড়া টেকসই নির্মাণই পরিবেশবান্ধব নির্মাণ। কোনো নির্মাণ যখন এ ধরনের শর্ত পূরণ করবে তখনই কেবল তাকে পরিবেশবান্ধব নির্মাণ বলা যাবে।

আবার পরিবেশবান্ধব নির্মাণের একটি মান দাঁড় করিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড স্টেটস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল। তাদের হিসাবে কোন ভবনকে পরিবেশবান্ধব বলার জন্য জানতে হবে—নির্মাণে কী ধরনের সামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে, ভবনে সূর্যের আলোর ব্যবহার কতটা, সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার করা হয় কি না, আশপাশের জলাধার সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না; স্কুল, বাজার করার ব্যবস্থা বা বাসস্ট্যান্ড রয়েছে কি না; বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী বাতি ব্যবহার করা হয় কি না; বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে তা ব্যবহার করা হয় কি না; ভবন নির্মাণে নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা রাখা হয়েছে কি না; অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা আছে কি না; বৈদ্যুতিক ফিটিংস স্থাপন ছাড়াও অগ্নি দুর্ঘটনা এড়াতে সর্বাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি ব্যবহার করা হয়েছে কি না, আশপাশে কতটা সবুজ বা গাছপালা রাখা হয়েছে ইত্যাদি। যদি কোনো নির্মাণে এ বিষয়গুলো মানা হয় তবেই তাকে পরিবেশবান্ধব নির্মাণ বলা যায়। এমন নির্মাণকে অনেকেই গ্রিন বিল্ডিংও বলে থাকেন।

 

দেশে যারা কাজ করছে

দেশে পরিবেশবান্ধব নির্মাণে দীর্ঘদিন থেকে গবেষণা ও কাজ করে আসছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরকারি প্রতিষ্ঠান হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এইচবিআরআই)। রাজধানীর মিরপুর রোডে অবস্থিত এই প্রতিষ্ঠানে চার বছরের বেশি সময় ধরে তৈরি করা হচ্ছে পরিবেশবান্ধব নির্মাণসামগ্রী। নিজেদের উদ্ভাবিত সামগ্রী দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি একটি ভবনও তৈরি করেছে। 

রাজধানীতে পরিবেশবান্ধব নির্মাণের জন্য এইচবিআরআই পাশাপাশি সক্রিয় আছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর, বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউট এবং সিটিস্কেপ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডসহ কয়েকটি বাণিজ্যিক আবাসন প্রতিষ্ঠান।

পরিবেশবান্ধব নির্মাণ মানে পরিবেশের যতটা সম্ভব কম দূষণ করে, কম ক্ষতি করে নির্মাণ। আমরা  কোনো ভবন নির্মাণের কথা তুললেই মনে হয় সেখানে অবধারিতভাবে মাটির তৈরি পোড়া ইট থাকতে হবে। কিন্তু পোড়া ইট পরিবেশের অন্যতম ক্ষতির কারণ। সেখানে যে পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড তৈরি হয় তাতে পরিবেশদূষণ বেড়ে যায় কয়েক গুণ।

হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ ইনস্টিটিউট ইতিমধ্যে বেশ কিছু পরিবেশবান্ধব, কৃষিবান্ধব, দুর্যোগ-সহনীয় এবং ব্যয়সাশ্রয়ী বিকল্প নির্মাণ উপকরণ উদ্ভাবন ও উন্নয়ন করেছে। তাদের উদ্ভাবিত ফেরোসিমেন্টের ব্যবহার বাড়ছে পরিবেশবান্ধব নির্মাণে। এ ছাড়া তাদের উদ্ভাবিত অন্যান্য উপকরণের মধ্যে রয়েছে ভবনের মেঝে, ছাদ ও দেয়াল তৈরির উপকরণ, বিকল্প হলোস্ল্যাব, বালু-সিমেন্টের কংক্রিট হলোব্লক, পলি ব্লক, ড্রেজড মাটির ব্লক, মাটি-সিমেন্টের স্ট্যাবিলাইজড ব্লক, ফেরোসিমেন্ট পানির ট্যাংক, একতলা ভবনের খুঁটি, চাল প্রভৃতি।

 

হচ্ছে পরিবেশবান্ধব নির্মাণ

ঢাকায় বেশ কয়েকটি ভবন ও কারখানা ইতিমধ্যে পরিবেশবান্ধব হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড স্টেটস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের সনদ পেয়েছে। দেশে এই সনদ পাওয়া প্রথম আবাসন প্রতিষ্ঠান সিটিস্কেপ ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড। রাজধানীর গুলশানে তাদের ভবনটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ ছাড়া গ্রামীণফোনের প্রধান কার্যালয়, সিম্পলট্রি, কনকর্ডের কয়েকটি ভবনও পরিবেশবান্ধব ভবন তৈরির নজির সৃষ্টি করেছে।

 

বাড়াতে হবে প্রযুক্তির ব্যবহার

নির্মাণকাজে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে বহু গুণে। পরিবেশবান্ধব নির্মাণ নিয়ে যাঁরা কাজ করেন তাঁরাও বলছেন, এমন নির্মাণ প্রযুক্তি ব্যবহারের বিকল্প নেই। যেমন—আগুনে না পুড়িয়েও ইট তৈরি করা যায়। ড্রেজিং করে উত্তোলন করা মাটির সঙ্গে রাসায়নিক উপাদান, পলিমার ও পানির মিশ্রণে মেশিনে উচ্চ চাপে ইট তৈরির প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে জাপান। বাংলাদেশেও এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে। শুধু ইট নয়, এমন অনেক প্রযুক্তিগত ব্যবহার বাড়িয়ে পরিবেশবান্ধব নির্মাণ করা যায়। এসব নির্মাণে স্থাপত্য নকশা এমনভাবে করা হয়, যেখানে প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার বাড়ানো হয়। এমনকি প্রয়োজন হয় না শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রেরও।

 

দরকার সচেতনতা

পরিবেশবান্ধব নির্মাণে রাজধানীতে সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও অন্যান্য সংস্থা। রাজউকের প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, পরিবেশবান্ধব জীবনধারা তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি দুই ধরনের প্রতিষ্ঠানই এগিয়ে আসছে। আগে দুই ভবনের মাঝে কম জায়গা রাখার প্রচলন দেখা গেলেও রাজউকের নীতিমালার কারণে গত কয়েক বছরের মধ্যে তৈরি ভবনগুলো বেশ খোলামেলা পরিবেশে তৈরি হচ্ছে। এখন প্রায় অধিকাংশ ভবনের সামনে বা দুই ভবনের মাঝের খোলা জায়গায় গাছপালা লাগানো অবস্থায় পাওয়া যায়। এগুলোকে সরাসরি ‘গ্রিন বিল্ডিং’ বলা না গেলেও সচেতনতা তৈরি হচ্ছে বলতে হবে। পাশাপাশি বাণিজ্যিক আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও সচেতনতা বেড়েছে। অতীতের তুলনায় এখন আমরা অনেক বেশি পরিবেশবান্ধব ভবন তৈরির নকশা পাই। নীতিমালা না থাকায় প্রণোদনা না দিতে পারলেও এ ধরনের উদ্যোগকে আমরা সব সময় উৎসাহিত করি। সহযোগিতা করার চেষ্টা করি।

 

দেশে ইউনাইটেড স্টেটস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিলের সনদ পাওয়া প্রথম ভবন সিটিস্কেপ।

ছবি : মোহাম্মদ আসাদ



মন্তব্য