kalerkantho


সামরিক শাসন, স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ

মুনতাসীর মামুন
অধ্যাপক ও গবেষক

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সামরিক শাসন, স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ

একসময় পাশ্চাত্যের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা, এমনকি শাসকরা বিশ্বাস করতেন যে অনুন্নত দেশগুলোতে উন্নয়ন ঘটাতে পারে সামরিক বাহিনী। তারা সুশৃঙ্খল, শক্তির অধিকারী; তারা পাশ্চাত্যের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী দেশের উন্নয়ন ঘটাতে পারে। অনুন্নত দেশের মানুষরা গণতন্ত্রের উপযুক্ত নয়। উন্নয়নের সঙ্গে গণতন্ত্রের সম্পর্ক নেই। এই তত্ত্ব অনুসরণ করে আফ্রিকা, এশিয়া ও লাতিন আমেরিকায় তারা সামরিক অভ্যুত্থানে সহায়তা করে। বিভিন্ন দেশে সামরিক শাসকের উদ্ভব হয়। শুধু তা-ই নয়, উন্নয়নের জন্য পুঁজির অবাধ বিকাশ দরকার। সমাজতান্ত্রিক ধারণা পুঁজিবাদের অন্তরায়। গত শতকের ষাটের দশকে পাকিস্তানে সামরিক অভ্যুত্থানে সম্মতি দেয় যুক্তরাষ্ট্র, আইয়ুব খান ক্ষমতায় আসেন। আফ্রিকায় এই মুহূর্তে মনে পড়ছে উগান্ডায় ইদি আমিনের কথা, কঙ্গোতে প্যাট্রিক লুমুম্বাকে হত্যা, চিলিতে আয়েন্দেকে উত্খাত ও হত্যা। এর পরবর্তী ইতিহাস আমাদের জানা। বিশ্বব্যাংকের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ঋণগ্রহণ, মার্কিন অস্ত্রের সরবরাহ (অর্থ ও ঋণের বিনিময়ে) করে তারা পুঁজিবাদ বিকশিত করেছে। এবং ওই সব রাষ্ট্র নিঃস্ব থেকে নিঃস্বতর হয়েছে।

পাকিস্তান এই তত্ত্ব প্রয়োগ করেছে জোরালোভাবে, যার ফল ১৯৭১। বঙ্গবন্ধুর শাসন তথাকথিত ইসলামী দেশগুলো, সুপারপাওয়ার ও তাদের সহযোগীরা মেনে নিতে পারেনি। কেননা তিনি সচেতনভাবে সংবিধানে মূলনীতি হিসেবে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। ফলে সপরিবারে তাঁকে হত্যা করা হয় এবং সামরিক শাসক হিসেবে লে. জে. জিয়াউর রহমানের উত্থান ঘটে।

ক্ষমতায় থাকার জন্য জিয়া সামরিকায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। অন্যদিকে বারবার নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা বলে একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের সম্মানের সঙ্গে পুনর্বাসন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সিভিল সমাজের ওপর কুঠারাঘাত করেছেন। কিছু আদর্শের ভিত্তিতে, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছিল যে বাংলাদেশ, তিনি মুক্তিযোদ্ধার ইমেজ ব্যবহার করে সেসব আদর্শকে উৎপাটিত করতে দ্বিধা করেননি। তাঁর অবদানকে এভাবে চিহ্নিত করা যেতে পারে—

১. সমাজে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের ও বিপক্ষের মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করা এবং শেষোক্ত পক্ষকে শক্তিশালী করা।

২. জাতীয়তার প্রশ্নে সম্পূর্ণ জাতিকে দুটি বিবদমান পক্ষে রূপান্তর করা।

৩. রাজনীতির ক্ষেত্রে প্রধান মেরুকরণ আওয়ামী লীগ ও আওয়ামী লীগ বিরোধিতা এবং শেষোক্ত রাজনীতির ধারাকে শক্তিশালী করা।

৪. সিভিল সমাজের বিপরীতে সামরিক সমাজকে শক্তিশালী ও আধিপত্যকারী শক্তি হিসেবে বিকশিত করার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা।

জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের সিভিল সমাজে যে ক্ষত সৃষ্টি করেছেন, এখনো তা শুকায়নি। তিনি শুধু আমাদের নয়, আমাদের দেশের জন্মকেই অপমান করেছিলেন। প্রথম দিকে তিনি মানুষের মাঝে প্রচারের কারণে যে মোহ সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন, ক্রমেই তা দূরীভূত হচ্ছিল এবং সিভিল সমাজে তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে উঠছিল। এই প্রতিরোধের প্রধান উদ্যোক্তা ছিল আওয়ামী লীগ ও সিভিল সমাজের সমর্থকরা। জিয়ার মৃত্যুর ঠিক আগে আগে শেখ হাসিনা ফিরলেন ঢাকায় এবং পরবর্তী সময় তাঁকে কেন্দ্র করেই সিভিল সমাজের আন্দোলন কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। সিভিল সমাজের পুঞ্জীভূত ক্রোধ দমনের জন্য জিয়া বেশ কিছু কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে যাচ্ছিলেন; কিন্তু তার আগেই নির্মমভাবে তিনি নিহত হন। তবে সিভিল সমাজের গণতন্ত্রমনাদের কাছে সান্ত্বনা এই যে সামরিক ব্যক্তি বা শাসন রাজনৈতিক স্থিরতা বা অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য যথার্থ মাধ্যম নয়। জেনারেল জিয়াউর রহমান তা প্রমাণ করেছিলেন মাত্র।

জেনারেল এরশাদের আমল ছিল জিয়াউর রহমানের শাসনের অনুকরণ। তিনি সেনাবাহিনীকে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন, যার ভিত্তি ছিল শক্তি। বিএনপি ও আওয়ামী লীগ তাঁকে উত্খাত করতে চেয়েছে; কিন্তু তাদের রণকৌশল ভিন্ন হওয়ায় এরশাদ প্রায় এক দশক টিকে যান এবং যত রকমের নষ্টামি করা যায় তা করেছেন। তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদকে নিজের সম্পদ মনে করেছেন।

জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের শাসনামল বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছি। তার কারণ তাঁরা দুজন ১৫ বছর দেশ শাসন করেছেন। তাঁদের মূল লক্ষ্য ছিল সিভিল সমাজ ও গণতান্ত্রিক সমাজের স্তম্ভগুলো হয় ধ্বংস করা বা জঙ্গি করে তোলা। সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করা। রাষ্ট্রীয় সম্পদের একটি বড় অংশ তাদের জন্য বরাদ্দ করা। সেনাবাহিনীকে একটি কনগেরামোরেটে তৈরি করা, যাতে তার পেশির সঙ্গে অর্থের যোগ হয় এবং এই প্রক্রিয়ায় সেনা সদস্যদের অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছ ও বিত্তবান করে তোলা। সিভিল সমাজের প্রতিনিধিদের নানাভাবে হেয় করা এবং সেনারা যে উত্তম, সেটি তুলে ধরা। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে সব রকমের পেশিশক্তি, অর্থ জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া। যেমন—নির্বাচনব্যবস্থা। সিভিল শাসনের একটি ভিত্তি নির্বাচনব্যবস্থা। জিয়া ও এরশাদ এই ব্যবস্থাকে শুধু নষ্ট নয়, বিশ্বাসহীন ও অনির্ভরশীল একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেন। দুজনই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির প্রক্রিয়া গ্রহণ করেন, যাতে সিভিল সমাজের অবদান তুচ্ছ করে দেখানো যায়। এ জন্য তাঁরা একই সঙ্গে হরেক রকম ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময় নির্বাচিত সরকার এলেও এসব ব্যবস্থার অনেক কিছু বদল করতে চায় না বা পারে না। বা অনেক ব্যবস্থার কথা ভুলে যায়, যা সিভিল সমাজকে হেয় করার কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।

সামরিক শাসন বা শাসকরা উত্খাত হলে তাঁদের উপস্থিতি কিভাবে থেকে যায় বা কিভাবে থাকছে, বাংলাদেশে বা পাকিস্তানে, এখন তার উল্লেখ করছি।

বেসামরিক কর্তৃত্ব বহালের সঙ্গে সঙ্গে দেখা যায় দেশজুড়ে হঠাৎ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ১৯৭৪-৭৫, ১৯৮০-৮১, এমনকি এরশাদের উত্খাতের পরের সময়টুকু এর উদাহরণ। ১৯৯১ সালে, পার্লামেন্ট স্থায়ী হতে না হতে বাংলাদেশের ৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সশস্ত্র হাঙ্গামার কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। বৃদ্ধি পেয়েছে ডাকাতি, হত্যা, ছিনতাই। এসবের প্ররোচনা দেওয়া হচ্ছে বাংলাদেশের শিক্ষিতদের মতে (অনেকে বক্তৃতায়ও তা বলেছেন) বিশেষ তথ্যানুসন্ধানী সংস্থা থেকে, যদিও কাগজপত্রে তা প্রমাণ করা যাবে না। এই সংস্থাগুলো বেসামরিক প্রশাসনের সমান্তরাল হয়ে যায়। বেসামরিক কর্তৃপক্ষ দৃঢ় হওয়ার আগে, বেসামরিক কর্তৃপক্ষও সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হতে ইতস্তত করে এবং সময়ের এই সুযোগটুকু পুরো গ্রহণ করে তারা।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় তাদের সৃষ্ট রাজনৈতিক দল বা দ্বিতীয় ফ্রন্ট। যেমন—১৯৯১ সালের নির্বাচনে প্রায় প্রধান দলগুলো সামরিক শাসনের বিপক্ষে কথা বলেছিল। একমাত্র বিএনপিই বলেছিল, তারা শক্তিশালী সেনাবাহিনী চায়। তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে বিএনপির সবাই, বিশেষ করে তরুণরা যে এমন বিশ্বাস করে তা নয়; কিন্তু অনেকেই বিশ্বাস করে, বিএনপির মূল চালিকাশক্তি জিয়াউর রহমানের আমলের অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা এবং দল তাঁরাই নিয়ন্ত্রণ করেছেন।

একইভাবে পরবর্তী সময় জেনারেল মইন ২০০৬-০৮ সালে ফেরদৌস কোরেশী, জেনারেল ইবরাহিমকে বাজারে নামিয়ে দেন। তাঁরা সামরিক বাহিনীর হয়ে দুটি ‘পার্টি’ গঠন করেন। আরো অনেকেই সে চেষ্টা গ্রহণ করে, যেগুলো পরিচিত হয়ে ওঠে ‘কিংস পার্টি’ হিসেবে। জেনারেল মইন বিএনপি বা জাতীয় পার্টির মতো এই পার্টি দুটির ভিত্তি সুদৃঢ় করার সুযোগ পাননি। এর মধ্যে জেনারেল ইবরাহিমের ‘কল্যাণ’-এর সাইনবোর্ড এখনো আছে এবং সেই সাইনবোর্ড নিয়ে তিনি খালেদা জিয়ার ১৮ দলীয় জোটে যোগ দিয়েছেন। কারণ সেনাসৃষ্ট পার্টি সেনাসৃষ্ট বড় পার্টিরই অনুসরণ করবে এবং সেটাই স্বাভাবিক।

ক্ষমতায় আসার পর সেনা কর্মকর্তারা চেষ্টা করেন প্রবলভাবে ধর্ম ব্যবহারে, বিশেষ করে বাংলাদেশে। কারণ বাংলাদেশের মানুষ অশিক্ষিত, ধর্মভীরু এবং সঠিক ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান কম। পাকিস্তানেও এমনটি হয়েছে। তাত্ত্বিকভাবে ধর্ম ব্যবহার ও মৌলবাদ আলাদা বিষয়; কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ দুটি প্রত্যয়ের মধ্যে গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান এবং এ কারণে দেখা যাচ্ছে, ধর্ম ব্যবহারের ফলে ধর্মের প্রতি বা ধর্মব্যবসায়ীর প্রতি সাধারণের বিরূপ মনোভাব দেখা দেয়নি এবং মৌলবাদ বিকশিত হয়েছে এবং হচ্ছে, যা অন্তিমে আবার সাহায্য করে সামরিকতন্ত্রকে।

বাংলাদেশে সামরিক শাসকরা দুটি ক্ষতি করেছেন, যা অপূরণীয়। এক, সপরিবারে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় নেতাদের হত্যা। দুই, মুক্তিযুদ্ধকে অবমাননা করা এবং জঙ্গিবাদের উত্থান ঘটানোর সাহায্য, এবং বাংলাদেশের অধিবাসীদের দুই ভাগে ভাগ করে ফেলা—স্বাধীনতার পক্ষ ও বিপক্ষ এবং ৩০ বছর ধরে বিপক্ষ শক্তিকে একটি শক্তিতে পরিণত করা।

বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ সামরিক শাসন হয়তো আর হবে না, হলেও টিকতে পারবে না, কারণ জনসংখ্যা এখন ১৭ কোটির কাছাকাছি। কিন্তু সামরিক শাসন যে ক্ষত সৃষ্টি করেছে তার জের শুধু সরকারকেই নয়, আমাদেরও টেনে চলতে হচ্ছে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো দেশের জনগণকে স্বাধীনতার পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তিতে বিভক্ত করা, ধর্ম ব্যবহার করে সাম্প্রদায়িকতা, ধর্মান্ধতা, জঙ্গিবাদ সৃষ্টি করা এবং দেশের কমপক্ষে ৩০ শতাংশ মানুষকে পাকিস্তানি বাঙালিতে পরিণত করা।

পাকিস্তানি ধ্যানধারণার বিকাশকে রুখতে হলে জঙ্গিবাদকে যেমন রুখতে হবে, তেমনি অর্থনৈতিক জিডিপি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক জিডিপি বৃদ্ধি করতে হবে।

অন্তিমে সব লড়াই-ই সাংস্কৃতিক লড়াই। ধর্মকে ধর্ম হিসেবে গ্রহণ করার মনোভাব সৃষ্টি করতে হবে, ধর্মকে রাজনীতিতে আনা যাবে না এবং যারা আনতে চাইবে তাদের প্রতিরোধ করতে হবে। সিভিল সমাজকে এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে হবে। এর ফলে যদি পাকিস্তানীকরণ রোখা যায়, তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্রে খানিকটা স্থিতিশীলতা ফিরে আসবে। অত্যধিক জনসংখ্যাও স্থিতিশীলতার অন্তরায়। যত দিন এ দেশে স্বাধীনতার পক্ষের ও বিপক্ষের শক্তি থাকবে, তত দিন এ দেশে স্থিতিশীলতা আশা করা যায় না।



মন্তব্য