kalerkantho


বাংলাদেশে বামপন্থীদের ভূমিকা

মনজুরুল আহসান খান
উপদেষ্টা, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাংলাদেশে বামপন্থীদের ভূমিকা

সমাজ ও সভ্যতার নানা শক্তির দ্বন্দ্ব সংহতি ও সংশ্লেষণের মধ্য দিয়ে ইতিহাস অগ্রসর হয়। ভারতে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন এগিয়ে নেয়ার জন্য ভারতের কংগ্রেসের জন্ম হয়। ইংরেজ সরকারের সেফিট নেট হিসেবে ইংরেজ কর্মকর্তাদের উদ্যোগেই কংগ্রেসের জন্ম। জন্মলগ্ন থেকে তিন মেয়াদে ইংরেজের সভাপতিত্ত্বেই কংগ্রেস পরিচালিত হোত। গণআন্দোলন যাতে ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে বিপ্লবী আন্দোলনে পরিণত না হয় সেদিকে নজর রেখেছে কংগ্রেস। অগ্নিযুগের বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী শক্তি ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদ করার তৎপরতায় লিপ্ত হয়। ক্ষুদিরাম সূর্যসেন মঙ্গল পান্ডে প্রমুখ অসংখ্য দেশপ্রেমিকের আত্মদানের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী আন্দোলন অগ্রসর হতে থাকে। এই সব সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের ব্যর্থতা, অপরদিকে ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের অভিঘাত ভারতবর্ষের বিপ্লবীদের গণসংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করে। আন্দামান সেলুলার জেলে বন্দী অবস্থায় বিপ্লবীরা কমিউনিস্ট সাহিত্য অধ্যয়ন করে। বন্দী অবস্থায় তারা  সন্ত্রাসবাদ পরিত্যাগ করে কমিউনিস্ট আদর্শে দীক্ষিত হয়ে গণ-বিপ্লবের পথ গ্রহণ করে। জেলের মধ্যেই তারা ”কমিউনিস্ট কনসলিডেশন” নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলে। পরাজিত ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে এবং মার্কসবাদ-লেনিনবাদ এবং কমিউনিস্ট মতাদর্শ প্রচার শুরু করে। ১৯২০ সালে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার উজবেকিস্তান ও আজারবাইজানে ভারত থেকে বিতাড়িত

জাতীয়তাবাদীরা প্রবাসে কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করে। পরবর্তিতে ১৯২৫ সালে ভারতের মীরাটে কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ গঠনে ইংরেজ সরকারের সাহায্য সহযোগিতা পাওয়া গেলেও কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষেত্রে শুরু থেকেই সরকারের তীব্র দমন পীড়ন নেমে আসে। অধিকাংশ নেতাকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাদের বিরুদ্ধে একের পর এক ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করা হয়।  অবিভক্ত বাংলায় এক পর্যায়ে কমরেড মোজাফ্ফর আহমেদ এবং বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের উদ্যোগে কৃষক-প্রজা পার্টি নামে বামপন্থী দলের জন্ম হয়। কমিউনিস্টরা কৃষক, শ্রমিক, নারী, ছাত্র, যুব গণসংগঠন গড়ে তোলে এবং সেই সব সংগঠনের নেতৃত্বে নানামুখি  গণসংগ্রাম গড়ে তোলায় ব্রতী হয়। এই সব গণসংগ্রাম সারা দেশের আন্দোলনে গতিবেগ সঞ্চার করে এবং সামগ্রিক রাজনীতিতে ব্যাপক প্রচার সৃষ্টি করে।

এইভাবে কমিউনিস্ট ও বামপন্থীরা ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জনের  সংগ্রাম এবং সেই সংগ্রামে শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত নারীসহ ব্যাপক জনগণকে সমবেত ও সক্রিয় করার ব্যাপারে প্রধান ভূমিকা পালন করে। ভারতের সেনাবাহিনীর মধ্যেও এই গণসংগ্রামের ঢেউ জাগরনের সৃষ্টি করে। বোম্বেতে নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন স্থানে সেনাবাহিনীর মধ্যে বিদ্রোহ সৃষ্টি হয়। দুঃখ ও লজ্জার বিষয় ব্রিটিশ উপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে এই সেনা বিদ্রোহের নিন্দা করে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের  আপোষকামী নেতৃত্ব। কমিউনিস্ট পার্টি সেনা বিদ্রোহকে সমর্থন করেই ক্ষান্ত হয় নাই, তারা বোম্বে শহরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার শ্রমিক জনতার সমাবেশ ও মিছিল করে বিদ্রোহীদের পক্ষে দাঁড়ায়। কংগ্রেস নেতৃত্বের দোদুল্যমনতা ও বারংবারের আপোষকামীতা দেখে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু ছদ্মবেশ  ধারণ করে বিদেশে পালিয়ে গিয়ে ভারতীয় জাতীয় সেনাদল গঠন করেন এবং ভারতে ব্রিটিশ সরকারের  বিরুদ্ধে  যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সমাজতান্ত্রিক রাশিয়ার লাল ফোজের বিজয় বিশ্বব্যাপী জাতীয় স্বাধীনতা ও মুক্তি সংগ্রামকে  বিপুল ভাবে অনুপ্রানিত করে এবং উপনিবেশিক ব্যবস্থায় ধ্বস নামে। অবস্থা বেগতিক দেখে ভারতের ব্রিটিশ সরকার নানা ছল চাতুরীর মাধ্যমে হিন্দু মুসলিম বিভেদ উস্কে দেয় এবং কংগ্রেসের হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠি ও মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠিকে মুখোমুখি দাঁড় করায়। ইংরেজের কূটকৌশল ও দাঙ্গা দেশ বিভাগ অনিবার্য করে তোলে এবং ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ লুট-পাট এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের দেশত্যাগের মধ্য দিয়ে পাকিস্তান ও ইন্ডিয়া নামে দুইটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হয়।

বাংলাদেশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়ে অভিবন এক উপনিবেশিক শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত হয় সাম্রাজ্যবাদের মদদপুষ্ট বৃহৎ পুঁজিপতি ও ভূস্বামীদের এক প্রতিক্রিয়াশীল সরকার। সাম্প্রদায়িক ও স্বৈরাচারী সরকার বাংলাদেশের জনগণের উপর নির্মম শোষণ ও নিপীড়নের স্টীম রোলার চালাতে থাকে। এর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে কমিউনিস্ট পার্টি। নতুন দেশ পাকিস্তান সম্পর্কে মোহ, নিষ্ঠুর নির্যাতনের মধ্যে গণসংগ্রাম পড়ে তোলাটা সেদিন ছিল দূরহ কাজ। কিন্তু কমিউনিস্টরা জীবন বাজী রেখে মরণপন সংগ্রাম গড়ে তোলে। রাজশাহীতে ইলা মিত্র, নেত্রকোনায় মনি সিংহ, সিলেটে বারিন দত্ত ওরফে আব্দুস সালাম, অজয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে আন্দোলন-বিদ্রোহ এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে তে-ভাগা আন্দোলন অনেক ক্ষেত্রে সশস্ত্র রূপ গ্রহণ করে। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক খুন, হত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ সব প্রক্রিয়ায় চেষ্টা করে আন্দোলন স্তব্ধ করতে পারে নাই।

শেষ পর্যন্ত জমিদারী ব্যবস্থা  ভেঙ্গে পড়েছে। তবে এই আন্দোলনে কমিউনিস্টদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু নেতা কর্মী মারা গেছে। অনেকে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। এর আগে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় দাঙ্গা ও দেশত্যাগের ফলে কমিউনিস্ট পার্টির অনেক ক্ষতি হয়। পৃথিবীতে খুব কম পার্টিকে এত প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করতে হয়েছে।

পাকিস্তান জন্মের পর থেকেই এদেশে সাম্প্রদায়িক দ্বিজাতিতত্বের দর্শন ও মানসিকতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। এই প্রতিক্রিয়াশীল দর্শন এমনকি মধ্যবিত্ত গণতান্ত্রিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তির মনোজগতে প্রভাব বিস্তার করে। কমিউনিস্ট পার্টি এই অচলায়তন ভাঙ্গায় ব্রতী হয়। পাকিস্তানের জন্ম লগ্নেই কমিউনিস্ট পার্টি বলেছিল, এই কৃত্রিম রাষ্ট্র টিকতে পারে না। পূর্ব বাংলার স্বায়ত্বশাসনের দাবীতে আন্দোলন অগ্রসর করে নিতে কমিউনিস্ট পার্টি  উদ্যোগ নিল। আওয়ামী লীগ ও গণতান্ত্রিক শক্তিও সেই আন্দোলনে শামিল হল। শেখ মুজিবুর রহমান স্বায়ত্বশাসনের দাবী নিয়ে সোচ্চার  হলেন। ছয় দফা দাবী উত্থাপিত হল। আইয়ুব বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও স্বাধীকার আন্দোলনে কমিউনিস্টদের সাথে আওয়ামী লীগ সহ অন্যান্যরা হাত মেলাল। ছয় দফা, শ্রমিক কৃষকের দাবী, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দাবী, জাতীয়করণ সহ আর্থ-সামাজিক দাবীর ভিত্তিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফা দাবীনামা প্রণীত হল। সেই আন্দোলনের পরিণতিতে আইয়ুব শাহীর পতন ঘটল। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ট দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। ইয়াহিয়া খান মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে গণহত্যা শুরু করল। শুরু হল মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকেই আওয়ামী লীগ, কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ ও অন্যান্য বামপন্থী দল একযোগে সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। আওয়ামী নেতৃত্বের মধ্যে অনীহা এবং পিছুটান সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত মনি সিংহ, মোজাফফরসহ উপদেষ্টা পরিষদ গঠন, সমাজতান্ত্রিক শিবির বিশেষত: সোভিয়েত রাশিয়ার সরাসরি সমর্থন মুক্তিযুদ্ধের অগ্রগতিতে বিশাল ভূমিকা রাখে।

বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চের ভাষণে বলেছিলেন ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ মুক্তিসংগ্রাম অগ্রসর করতে হলে প্রয়োজন কমিউনিস্ট ও বামপন্থীদের। বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প শক্তিই পারে বাংলাদেশকে এই সঙ্কট থেকে বের করে আনতে। বাংলাদেশে বামপন্থীরা যখনই ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, সংকীর্নতা ত্যাগ করেছে, তখনই তারা অদম্য হয়ে উঠেছে। আমরা দেখেছি চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষায়, ফুলবাড়িয়ায় পরিবেশে বিধ্বংসী কয়লা উত্তোলনের বিরুদ্ধে, গ্যাস রফতানির বিরুদ্ধে গণ-সংগ্রাম। এসব সংগ্রামে আওয়ামী লীগ বিএনপির অনেকেই পেছন থেকে সমর্থন দিয়েছে। ৭১’ এর ব্যর্থতা, পরবর্তীকালের ব্যর্থতা এসব থেকে শিক্ষা নিয়ে বামপন্থীরা যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে হিম্মতের সাথে লড়তে পারে, তাহলেই সঙ্কট মোকাবিলা করে বাংলাদেশ শান্তি, সাম্য ও মানবিকতার পথে যাত্রা শুরু করতে পারে।



মন্তব্য