kalerkantho


বাংলাদেশে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি : বিচিত্র রূপ

অধ্যাপক ড. আবু সাইয়িদ
১৯৭২ সালে খসড়া সংবিধান প্রণেতা
সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী

১২ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



বাংলাদেশে ষড়যন্ত্রের রাজনীতি : বিচিত্র রূপ

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সময় শেখ হাসিনাকে রক্ষায় আওয়ামী লীগ নেতাদের মানবঢাল

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করলেও স্বাধীনতা অর্জনের অপরিহার্য শর্ত সরকার গঠনে নির্দিষ্ট কোনো ব্যবস্থা নেননি বলে অনেকে বলে থাকেন। যাঁরা স্বাধীনতার পূর্বাপর ঘটনাবলির পর্যবেক্ষক তাঁরা সহজে উপলব্ধি করবেন যে পাকিস্তান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে অন্তর্ভুক্ত থেকে সরকার গঠনের ঘোষণা দেওয়া হতো বিচ্ছিন্নতাবাদী ও হঠকারিতা। কিন্তু একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন প্রাজ্ঞ নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু কৌশলে স্বাধীনতাসংগ্রাম পরিচালনার লক্ষ্যে গড়ে তুলেছিলেন হাইকমান্ড। স্বাধীনতা ঘোষণার এক সপ্তাহের মধ্যে এই হাইকমান্ড মুজিবনগর সরকার গঠন করেন। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ দিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে ৩ এপ্রিল সাক্ষাৎকালে বলেছিলেন, ইতিমধ্যেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে সরকার গঠন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে কথা হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়, ভারতের মাটিতে থেকে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করা যাবে। দিল্লি থেকে তাজউদ্দীন আহমদ ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে কলকাতায় ফিরে এলে তাঁকে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয়। তাজউদ্দীন আহমদের প্রধানমন্ত্রিত্ব নিয়ে কলকাতার ভবানীপুর রাজেন্দ্র রোডের এক বাড়িতে আপত্তি, পারস্পরিক অবস্থানের টানাটানি এবং উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের মধ্যে বৈঠকের পরিসমাপ্তি ঘটে। এ ক্ষেত্রে উপদলীয় কোন্দল, বিভক্তি, বিভ্রান্তি এবং বিক্ষিপ্ত জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে খন্দকার মোশতাক আহমদ প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের যোগ্যতা ও তাঁর ক্ষমতা গ্রহণের বৈধতা

নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে খন্দকার মোশতাকের সঙ্গে জহুরুল কাইয়ুম, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, মিজানুর রহমান প্রমুখ নেতার দাবি ছিল তাজউদ্দীন আহমদের পদত্যাগ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এবং বেশির ভাগ জনপ্রতিনিধি, বিশেষ করে মন্ত্রিসভার সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী, এ এইচ কামরুজ্জামান দৃঢ়ভাবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তাজউদ্দীনকে সমর্থন দেন এ কারণে যে সরকার গঠনের বিভক্তি এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীনের পদত্যাগ মুক্তিযুদ্ধকে অঙ্কুরেই বিপন্ন করে ফেলবে। খন্দকার মোশতাকের বক্তব্য ছিল, তিনি সিনিয়র, তাঁকেই প্রধানমন্ত্রী করতে হবে। একপর্যায়ে ঘোষিত মন্ত্রিপরিষদে খন্দকার মোশতাক যোগদান করবেন না বলে ‘জেদ’ ধরলে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বলেন, এই যদি শেষ কথা হয় তাহলে আপনাকে বাদ দিয়ে মন্ত্রিসভা শপথ নেবে। সেদিন এসব ঘটনার আমি একজন প্রত্যক্ষ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দূরতম সাক্ষী। মূলত তাজউদ্দীন আহমদের দৃঢ়তার ফলেই খন্দকার মোশতাকের সরকার গঠনের জটিলতা ও চক্রান্ত বানচাল হয়ে যায়।

২.

একই সঙ্গে শুরু হয় আন্তর্জাতিক চক্রান্ত। খন্দকার মোশতাকের সমর্থকরা মার্কিনদের সঙ্গে আলাদাভাবে যোগাযোগ স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু করে। বাংলাদেশ থেকে যে প্রতিনিধিদল জাতিসংঘে যাওয়ার কথা ছিল, তার নেতৃত্ব দেবেন স্বাভাবিকভাবেই তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদ। বিভিন্ন গোপন সূত্রে খবর পেয়ে খন্দকার মোশতাক ও তাঁর প্রতিনিধিদলকে  বিদেশে যাওয়া বন্ধ করা হয়। কারণ তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল বিদেশে পাকিস্তানি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বসে একটি আপস ফর্মুলা করে কনফেডারেশনের ঘোষণা দেবেন। এই চক্রান্তের মূলোচ্ছেদ করা হয়। খন্দকার মোশতাককে আর যেতে দেওয়া হয়নি। মোশতাকের সঙ্গে সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতায় বাংলাদেশ হাইকমিশন অফিসে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের এক রাজনৈতিক কর্মকর্তার বৈঠকে রাজনৈতিক সমাঝোতার ওপর জোর দেওয়া হয়। এটা ছিল মূলত স্বাধীনতাবিরোধী ষড়যন্ত্র। মার্কিন গোপন দলিল ও কিসিঞ্জারের লিখিত বই সূত্রে জানা যায়, এ ধরনের যোগাযোগের উদ্যোগ ১৯ বার নেওয়া হয়।

৩.

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যাতে অর্জিত না হয় সে লক্ষ্যে জাতিসংঘকে ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র। নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক সমাধানের প্রস্তাব উত্থাপন করে, যার অর্থ হলো অখণ্ড পাকিস্তানের মধ্যেই বিরাজমান সংকটের সমাধান। অন্যদিকে ভারতের প্রতিনিধি সমর সেন রাজনৈতিক সমাধানের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। যার অর্থ ছিল বাংলাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মুক্তি এবং বিপুল শরণার্থী প্রত্যাবর্তন। নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্রসহ তার মিত্রদের প্রস্তাবে সোভিয়েত রাশিয়া বারবার ভেটো প্রয়োগ করে।

৪.

এসব ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত নস্যাৎ করে ১৫ ডিসেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে একটি অতি জরুরি বার্তা পাঠান। সে বার্তার মর্মার্থ হলো, বর্তমান দুঃখজনক পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং শেখ মুজিবের মুক্তি। এরপর মার্কিন দলিলে লক্ষণীয় যে যুক্তরাষ্ট্র সেই পরিপ্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, ঘটনার মূল কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান। বাংলাদেশের অভ্যুদয়, পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ, নানা ঘটনাপ্রবাহ, পাকিস্তানে ক্ষমতার পালাবদল, আন্তর্জাতিক ও বিশ্বজনমতের চাপে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মৃত্যুর গহ্বর থেকে আলোর পথে স্বাধীন স্বপ্নের সোনার বাংলায় ফিরে আসেন।

৫.

মুক্তিযুদ্ধের পর মুজিব বাহিনীর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল গঠন করে। পরবর্তীকালে ঘটনাপ্রবাহে তারা স্বাধীনতাবিরোধী ও প্রতিবিপ্লবীদের হাতকে শক্তিশালী করে। সশস্ত্র গণবাহিনী ও বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা গড়ে তোলে। সারা দেশে গণতন্ত্রের সুযোগে নৈরাজ্য, খুন, ডাকাতি, হাইজ্যাক, ব্যাংক লুট, নাশকতা চলে। এই অবস্থায় দেশে দেখা দেয় প্রবল বন্যা। ফসলের ক্ষতি হয়, খাদ্য সংকট সৃষ্টি হয়। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রাপ্তব্য পিএল-৪৮০ আওতায় খাদ্যশস্য বাংলাদেশকে যথাসময়ে না দিয়ে জাহাজগুলো অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। বাংলাদেশে মার্কিন ‘খাদ্য-অস্ত্র’ প্রয়োগের ফলে কয়েক হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করে। এসবই ছিল মার্কিন ষড়যন্ত্রের পরিকল্পিত ব্লুপ্রিন্ট। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মনে করতেন, পৃথিবীতে যে তিনজন তাঁর ব্যক্তিগত শত্রু ছিলেন তাঁদের মধ্যে শেখ মুজিব অন্যতম। আর দুজন হলেন আলেন্দে ও থিউ। সে লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র শুরু হয়।

৬.

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার অর্থ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও মূল্যবোধ এবং রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতিকে মুছে ফেলা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট খুনি মোশতাক ও ঘাতক রশীদ-ফারুক চক্র তাই করেছিল। মার্কিন সমর্থনপুষ্ট খন্দকার মোশতাক অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে। সামরিক শাসন জারি করে। জিয়াউর রহমানকে প্রধান সেনাপতি পদে বরণ করে। পরবর্তী সময়ে জাসদের কর্নেল তাহের ও জিয়ার ষড়যন্ত্র সফলতার একপর্যায়ে জিয়াউর রহমান বিশ্বাসঘাতকতা করে কর্নেল তাহেরকে ফাঁসি দেয়। জিয়া পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট পদ দখল করে শহীদের রক্তে লিখিত সংবিধানকে সামরিক ফরমান বলে পাকিস্তানের ধারায় ফিরিয়ে নেয়। মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক স্তম্ভ ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল করা হয়, সমাজতন্ত্র পরিবর্তন করা হয়, যুদ্ধাপরাধী ও দালালদের ছেড়ে দেওয়া হয় এবং জাতীয় সংসদে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করে নিয়ে আসা হয়। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ফলে পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের ব্লুপ্রিন্ট অনুসারে স্বাধীন বাংলাদেশকে পাকিস্তানি ধারায় পরিচালিত করা হয়। এর ফলে এখন পর্যন্ত সংবিধানে সাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়া লেগে আছে। এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য জেলের অভ্যন্তরে চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী, এ এইচ কামরুজ্জামানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের যাতে বিচার না হয় সে জন্য সামরিক ফরমান জারি করা হয়।

৭.

এরশাদ আমলে খুনিদের দল গঠনের সুযোগ দেওয়া হয়। তারা আওয়ামী লীগ সভানেত্রীকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়িতে আক্রমণ করে। খালেদা জিয়া-নিজামী গং জঙ্গিবাদের উর্বর চাষাবাদে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে। এমনকি ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় স্বাধীনতাবিরোধী সশস্ত্র জঙ্গিদের মদদ, অস্ত্র চোরাচালানের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করা হয় এবং বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য সরাসরি ভয়াবহতম গ্রেনেড হামলা করা হয়।

৮.

জাতির পিতাকে হত্যা করার পর বাংলাদেশের রাজনীতিতে হত্যা, ক্যু, ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের রাজনীতি অব্যাহত আছে। স্বাধীনতাবিরোধী পাকিস্তানপন্থীরা এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মেনে নিতে পারেনি। সেই একই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ওপর এ পর্যন্ত বিভিন্নভাবে প্রাণনাশের জন্য ১৯ বার হামলা চালানো হয়েছে। এখনো ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত চলছে। মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ, চেতনাকে ধ্বংস, স্বাধীনতাকে বিপন্ন ও বিভ্রান্ত করার জন্য পাকিস্তান সক্রিয়ভাবে তাদের কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। সম্প্রতি পাকিস্তানের দূতাবাস তাদের নিজস্ব কৌশলে সেই ধারা প্রচার করছে। দেশপ্রেমে উজ্জীবিত জনগণ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী ব্যক্তি ও দলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ অশুভ শক্তিকে মোকাবেলা করতে হবে।



মন্তব্য