kalerkantho

অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ

সৎ রাজনীতিকের প্রতিকৃতি

পার্থ সারথি দাস   

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



সৎ রাজনীতিকের প্রতিকৃতি

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁকে মন্ত্রিত্ব দিতে চাইলে তিনি তা নেননি। মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের একমাত্র জীবিত সদস্য তিনি। ২০১৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার নিতেও অসম্মতি জানান। শেষ পর্যন্ত সরকার তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দিতে বাধ্য হয়। তাঁর মতে, রাজনীতির মানে হলো মানুষকে অনবরত দিয়ে যাওয়া, দেশকে দিয়ে যাওয়া। হাত পেতে নেওয়ার নাম রাজনীতি নয়

বিছানা থেকে উঠতে পারেন না। শুয়ে থাকেন। রাতের বেলা বদ্ধঘরের বিছানায় শুয়ে শুয়ে কথার পিঠে কথা যোগ করে কখনো হাসছিলেন, কখনো হাসি থামিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ছিলেন। কথা তাঁর থামেই না। প্রসঙ্গ শেষে বিদায় নিতে চাইলে যেন একটু অভিমানই করলেন, ‘হ্যাঁ, চইল্লাই তো যাবা।’ হাসিতে উদ্ভাসিত সরল মুখের কথাগুলো অবিরাম শুনতেই মন চাইছিল।

গণমানুষের মুক্তির জন্য সারা জীবন কথার গাড়ি চালিয়ে নিজের জীবনগাড়িই চালাতে পারেন না তিনি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে রাজনীতিতে এসে একাধিকবার সংসদ সদস্য হয়েছেন। মন্ত্রিত্ব দিতে চাইলেও নেননি। তাঁর অঢেল সম্পদ নেই, বিলাসী গাড়ি নেই। তাঁর অহংকার একটাই—বুকের ছাতি ফুলিয়ে, কণ্ঠের স্বর ওপরে তুলেই বলেন, কেউ অসত্ বলতে পারবে না। তিনি স্মৃতির আকাশে ওড়েন। এই সত্ রাজনীতিক আর কেউ নন, কমরেড অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ। ন্যাপের একাংশের সভাপতি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাঁকে মন্ত্রিত্ব দিতে চাইলে তিনি তা নেননি। মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের একমাত্র জীবিত সদস্য তিনি। ২০১৫ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার নিতেও অসম্মতি জানান। শেষ পর্যন্ত সরকার তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দিতে বাধ্য হয়। তাঁর মতে, রাজনীতির মানে হলো মানুষকে অনবরত দিয়ে যাওয়া, দেশকে দিয়ে যাওয়া। হাত পেতে নেওয়ার নাম রাজনীতি নয়।

আগামী ১৪ এপ্রিল তিনি ৯৭-এর ঘরে পা রাখবেন। ৯৬ বছর বয়সে সার্বক্ষণিক চিকিত্সাসেবায় আছেন রাজধানীর পার্ক রোডের বাসায়। গত ১৭ ডিসেম্বর শীতের পার্ক রোডের নীরবতা ভাঙছিল হঠাত্ ছুটে চলা রিকশার শব্দে। মূল সড়ক থেকে বহুতল একটি ভবনের ফ্ল্যাটে গিয়ে কমরেড মোজাফফরের স্ত্রী আমিনা আহমেদের সঙ্গে দেখা হয়। স্বামীর বর্তমান শারীরিক অবস্থার বিষয়ে কথা বলছিলেন। একপর্যায়ে তিনি নিয়ে যান স্বামীর কক্ষে। অধ্যাপক মোজাফফর রেগে যান, বিরক্ত হন বলে অনেকে বলে থাকেন। তবে বিছানার কাছে দাঁড়িয়ে অধ্যাপককে দেখা গেল শিশুর মতো হাসিতে উজ্জ্বল। তিনি বলে চলছিলেন।

অধ্যাপকের স্ত্রী আমিনা আহমেদও বেড়ে উঠেছেন বাম রাজনীতির জ্বলন্ত সময়ে। এ নিয়ে তাঁরও গর্ব কম নয়। তিনি ন্যাপ (মোজাফফর)-এর কার্যকরী সভাপতি। দলের সর্বশেষ সম্মেলনে দেশের ৫৪টি জেলার প্রতিনিধিরা যোগ দিয়েছিলেন। আমিনা আহমেদ আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংরক্ষিত আসন থেকে সংসদ সদস্যের দায়িত্ব পালন করছেন। গত নবম সংসদেরও সংরক্ষিত আসনের সদস্য ছিলেন। আমিনার সঙ্গে অধ্যাপক স্বামীর বয়সের ব্যবধান বহু বছরের। আমিনা জানান, বারিধারার পার্ক রোডের বাসা থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অ্যাপোলো হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয় স্বামীকে। ডাক্তাররা অধ্যাপক মোজাফফরকে ভীষণ ভালোবাসেন। আমিনা বলেন, হাসপাতাল আর বাড়িঘর যেন এক হয়ে গেছে। গত চার মাসে তিনবার হাসপাতালে নিতে হয়েছে। অ্যাম্বুল্যান্সে নিয়ে যেতে হয়, আনতে হয়। অনেক সময় ভুলে যান। মনে রাখতে পারেন না। খুব জোরে কথা না বললে শোনেন না। যন্ত্র কিনে দেওয়া হয়েছে। সেটাও অ্যাডজাস্ট হয় না।

অধ্যাপকের একমাত্র মেয়ে আইভি আহমেদ ন্যাপের সঙ্গে যুক্ত আছেন। মেয়েজামাই ডা. সৈয়দ খালেদুজ্জামান মারা গেছেন। অধ্যাপক মেয়েজামাইকে খুব ভালোবাসতেন। ডাক্তাররা বলছেন, মেয়েজামাইয়ের মৃত্যুর পর অধ্যাপক মোজাফফরের ইমোশনাল সেটব্যাক হয়েছে। গত অক্টোবরে স্বামীর শয্যাশায়ী হওয়ার দুই বছর পূর্ণ হয়েছে।

মোজাফফর কুমিল্লা জেলার মানুষ। আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন। কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার এলাহাবাদের বাড়িতে বেড়ে উঠছিলেন। ১৯৩৭ সালে, ১৫ বছর বয়সে মহাত্মা গান্ধীকে দেখতে বাড়ি থেকে হেঁটে চান্দিনায় গিয়েছিলেন। নিজের চোখে হাতে লাঠি, পরনে সাদা কাপড়, পায়ে খড়ম—মহাত্মা গান্ধীর সেই সরল মুখ দেখে উত্সাহিত হয়েছিলেন। ব্রিটিশ খেদানোর জন্য মহাত্মার আহ্বানে সেদিন দারুণভাবে উত্সাহিত হন তিনি। অবিভক্ত ভারতে নিষিদ্ধ প্রগতিশীল ছাত্র ফ্রন্টের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, কলকাতায় কমরেড মুজফ্ফর আহমদের সঙ্গে পরিচয় ছিল। তাঁরই আদর্শ ও কর্মে উজ্জীবিত হয়ে বাম রাজনীতির পথে চলতে থাকেন। মওলানা ভাসানীসহ বড় বড় ত্যাগী রাজনীতিকের কাছাকাছি থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন চলাকালে অধ্যাপক মোজাফফর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। আজিমপুর ৮/আই কলোনিতে থাকতেন। বাসায় ভাষা আন্দোলনের রাজনৈতিক নেতাদের গোপন বৈঠক চলত। মোহাম্মদ তোয়াহা, খোকা রায়, অনিল মুখার্জি, মনোরঞ্জন ধর, সত্যেন সেন, ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত আসতেন। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত আট বছর আত্মগোপনে ছিলেন।

১৯৫৪ সালে কুমিল্লার দেবিদ্বারে নূরুল আমীনের মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার শিক্ষামন্ত্রী মফিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে শক্ত প্রার্থী খুঁজছিলেন যুক্ত ফ্রন্টের নেতা সোহরাওয়ার্দী-শেরেবাংলা-ভাসানী। বঙ্গবন্ধু ডেকে নিয়ে প্রার্থী হতে বলেছিলেন। নির্বাচনের খরচ বাবদ সোহরাওয়ার্দী ৫০০ টাকা দিয়েছিলেন। হেঁটে প্রচারণা চালিয়েছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর। শিক্ষামন্ত্রী মফিজ উদ্দিনকে অর্ধেকেরও বেশি ভোটে পরাস্ত করেছিলেন।

১৯৫৭ সালের জুলাই মাসে ন্যাপের জন্ম। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী নবগঠিত দলের সভাপতি ছিলেন। ১৯৫৮ সালে মৃত বা জীবিত ধরিয়ে দেওয়ার জন্য আইয়ুব সরকার পুরস্কার ঘোষণা করলে মোজাফফর আহমেদ হুলিয়া মাথায় নিয়ে নিজেকে গোপনে রেখে পথ চলতেন। কমরেড তোয়াহার বাড়িতে আত্মগোপন করেন আব্দুল মান্নান নামে। ১৯৬৫ সালে চীন ও মস্কোপন্থী—দুই ভাগে ন্যাপের নেতাকর্মীরা বিভক্ত হলে ১৯৬৭ সালে ন্যাপ গঠন করে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি হন মোজাফফর।

স্বাধীনতার পক্ষে বিশ্বসম্প্রদায়ের কূটনৈতিক সমর্থন আদায়ে বিভিন্ন সমাজতান্ত্রিক দেশে ছুটে বেড়িয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে জাতিসংঘেও বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন।



মন্তব্য