kalerkantho


তাজউদ্দীন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠ কারিগর

ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম
আইনজীবী

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



তাজউদ্দীন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠ কারিগর

রাজনীতিতে মেধা, দক্ষতা, যোগ্যতা ও সততার প্রতীক ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। সেই ব্রিটিশ শাসনের শোষণ থেকে জাতির মুক্তির লক্ষ্যে সে সময়কার মুসলিম লীগের হয়ে তিনি আন্দোলন-সংগ্রামের মশাল হাতে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। আর পরিসমাপ্তি ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেলখানায় স্বাধীনতাবিরোধী ঘাতকদের গুলিতে। বন্দি অবস্থায়ও কারাগারের সমস্ত নিয়ম ভঙ্গ করে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় তাজউদ্দীন আহমদ এবং অন্য তিন জাতীয় নেতা—সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে।

তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আমার পরিচয় পুরান ঢাকার কারকুনবাড়ি লেনে। ওখানে তৎকালীন আওয়ামী লীগের নেতা শামসুল হকসহ অনেকেই ছিলেন। তিনি আমাকে তাঁর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে তিনি পূর্ব বাংলার অ্যাসেম্বলির সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু চুয়ান্নর বিজয়কে নস্যাৎ করে দেওয়া হলো ১৯৫৬ সালের ভারত শাসন আইনের ৯২(ক) ধারা জারি করে। অ্যাসেম্বলি ভেঙে দেওয়া হলো, সরকার ভেঙে দেওয়া হলো। সে সময় আমরা সবাই জেলে চলে গেলাম। বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে আমাদের সবাইকে কারাবন্দি করা হলো। তাজউদ্দীন আহমদও আমাদের সঙ্গে বন্দি হন। আমাকে কুষ্টিয়া কারাগারে রাখা হয়, সেখান থেকে পাবনা কারাগারে নেওয়া হয়, পাবনা থেকে রাজশাহী এবং রাজশাহী থেকে ঢাকায় নেওয়া হয়। অর্থাৎ আমরা প্রমোশন পেয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চলে এলাম। কারাগার থেকেই আমার বিএ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম এবং পরীক্ষার অনুমোদনও পেয়েছিলাম। সে সময় কারাগার থেকেই আমার প্রথম রিট পিটিশন তৈরির অভিজ্ঞতা অর্জন করি। তাজউদ্দীন আহমদ ও আমি কারাগার থেকে একসঙ্গে মুক্তি লাভ করি। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হলে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেখানে তাজউদ্দীনের সঙ্গে দ্বিতীয়বার ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলা ও মেশার সুযোগ হলো। এর আগে কারকুনবাড়ি লেনে প্রথম ঘনিষ্ঠভাবে কথা বলার সুযোগ হয়।

কারকুনবাড়ি লেনে আরেকটি জায়গা ছিল ইয়ার মোহাম্মদ সাহেবের বাড়ি। সেখানেই ইস্ট পাকিস্তান আওয়ামী লীগের প্রথম কার্যালয় ছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের জন্য ওই জায়গাটাই মূল কার্যালয় ছিল।  এরপর কারকুনবাড়ি লেন থেকে আওয়ামী লীগের কার্যালয় চলে যায় সদরঘাট এলাকায়। চুয়ান্নর নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের অফিস চলে গেল ৩ নম্বর সিম্পসন রোডে। চুয়ান্নর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেখানেও তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে দেখা হতো। এই দু-তিনটি জায়গায়ই আমাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়ে। আমাদের রাজনৈতিক জীবনের সূত্রপাত বলা চলে একই সঙ্গে হয়েছে। ওই সময় থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যেমন পরিচয় হয়েছিল, তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গেও ঠিক ওই রকম পরিচয় ঘটেছিল। তাজউদ্দীন আহমদ খুব মেধাবী ছাত্র ছিলেন। এ জন্য সবাই তাঁকে সম্মান করত। তাঁর সহপাঠীরাও সম্মানের চোখে দেখত।

শামসুল হক ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদের এলাকার মানুষ। তিনি সে সময় ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। পরে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় মন্ত্রিত্বও করেছেন। সে সময় জেনেছি, তাজউদ্দীন আহমদ লেটার নিয়ে ম্যাট্রিক পাস করেন। তারপর তৎকালীন জগন্নাথ কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। সেখানেও খুব ভালো ফল করেন। তাজউদ্দীন আহমদের অভ্যাস ছিল সব কিছু লিখে রাখার। যা কিছু ঘটত, তার সব কিছু নিজের ডায়েরিতে লিখে রাখতেন। তাঁর যে ডায়েরি, কিছুদিন আগে সেটি বই আকারে প্রকাশ করা হয়। বইটি পড়লে বোঝা যাবে, তাজউদ্দীন আহমদ কতটা নিয়মানুবর্তী ছিলেন। কী ধরনের একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন, তার সবটাই এখানে উঠে এসেছে।

সর্বক্ষেত্রে তাজউদ্দীন আহমদের জ্ঞানের বিচরণ ছিল। যেমন—অর্থনীতিবিদ হিসেবে খুবই পারদর্শী ছিলেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে ছিলেন অসাধারণ পারদর্শী। তাঁর স্মরণশক্তি এতটাই প্রখর ছিল যে যেটাই পড়তেন, ভুলে যেতেন না। আশ্চর্যের বিষয় হলো, তিনি কোরআনের হাফেজ ছিলেন। পুরো কোরআন শরিফ তাঁর মুখস্থ ছিল। এত মেধাসম্পন্ন ব্যক্তি আমি খুব কম দেখেছি। তাঁর ধারণশক্তি ছিল খুবই গভীর। মানুষের প্রতি দরদ, মানবতার দিকটা গভীর ছিল।

তাঁর সঙ্গে আরো দুজন ব্যক্তির খুব ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। শিক্ষক ও আইনজীবী কামরুদ্দিন আহমেদ, পাকিস্তান আমলে বার্মায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁকে আমরা সবাই খুব যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে জানতাম। আমাদের সব রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্মে উপদেষ্টা হিসেবে গাইডেন্স দিয়েছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। কামরুদ্দিন আহমেদের সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদের প্রায়ই দেখা হতো।

আরেকজন ব্যক্তির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠতা ছিল তাজউদ্দীন আহমদের। তিনি হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু যখনই কারাগারে গেছেন, তাঁর সঙ্গে সঙ্গে তাজউদ্দীন আহমদও গেছেন। তিনি সব খোঁজখবর রাখতেন। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে আওয়ামী লীগের অফিসটা ঠিকঠাক গুছিয়ে রাখতেন তাজউদ্দীন আহমদ। এ ছাড়া দলীয় সব কর্মসূচি পরিচালিত হতো তাঁর নেতৃত্বে। বেশির ভাগ সময়, যখন বঙ্গবন্ধু জেলে গেছেন, তিনিও জেলে। বঙ্গবন্ধু জেলে গেছেন আর তাজউদ্দীন যাননি, এ রকম ঘটনা কমই ঘটেছে।

বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন আহমদ একই সঙ্গে সব রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। দলীয় অফিস মেইনটেইন করা, খবরের কাগজে কী যাবে তা লিখে মুসাবিদা করে দেওয়াসহ এমন কোনো কাজ ছিল না, যা বঙ্গবন্ধুর হয়ে তাজউদ্দীন আহমদ করেননি। একটি মিটিং হলে তার ম্যানিফেস্টো তৈরি করা, ওই মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত রেজুলেশন ও ফাইলজাতকরণ—সব কিছুই হতো তাজউদ্দীন আহমদের হাতে। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুবই বিশ্বস্ত এবং সেক্রেটারি হিসেবে সংগঠনের সব কিছুই তিনি করতেন। বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীন একে অপরের সম্পূরক ছিলেন।

ছয় দফা দাবির সময় বঙ্গবন্ধু দলের জেনারেল সেক্রেটারি আর তাজউদ্দীন আহমদ সাংগঠনিক সম্পাদক। পরে বঙ্গবন্ধু সভাপতি হলেন আর তাজউদ্দীন হলেন সেক্রেটারি। ছয় দফা দাবি যখন দেওয়া হলো, বঙ্গবন্ধু লাহোরে গিয়ে ওই দাবি পেশ করলেন। সেটিকে গুছিয়ে দেওয়া এবং সারা দেশে এই ছয় দফা দাবিকে ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাজউদ্দীন আহমদ মূল ভূমিকা রাখেন। ছয় দফা কী এবং কেন, তা নিয়ে পুস্তিকা বের করেছিলেন। সেই পুস্তিকায় দেখা যায়, ছয় দফার যে ব্যাখ্যাটা দিয়েছেন তাজউদ্দীন আহমদ, ওই ব্যাখ্যা বাঙালিদের উজ্জীবিত করে। তখন তাজউদ্দীন আহমদ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে তিনি ছয় দফার পুস্তকের মুখবন্ধটা লিখেছেন। তারপর ভুট্টো এসে ছয় দফাকে চ্যালেঞ্জ করল। তখন তাজউদ্দীন আহমদ ভুট্টোকে পল্টন ময়দানে পাবলিক ডিবেট করার প্রস্তাব দেন। বঙ্গবন্ধু সেই ডিবেটের প্রস্তাব মেনে নিলেন। বঙ্গবন্ধু সিদ্ধান্ত দিলেন, ওই পাবলিক ডিবেটে তাঁর পক্ষে তাজউদ্দীন অংশ নেবেন। এ কথা শুনে ভুট্টো তার তল্পিতল্পা নিয়ে পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে গেল।

ছয় দফা ও পাকিস্তান সংবিধান প্রণয়ন নিয়ে ভুট্টো পশ্চিম পাকিস্তান থেকে একদল লোক নিয়ে এসেছিল। ওই দলে আহমদ রাজা নামের এক ব্যারিস্টার ছিলেন, আরেকজন আমার পুরনো বন্ধু ব্যারিস্টার কামাল আসফার। আসফার পরে পশ্চিম পাকিস্তানের গভর্নর হয়েছিল, ভুট্টোর মন্ত্রিসভারও সদস্য ছিল। বাংলাদেশের সঙ্গে আসফারের সম্পর্ক ছিল। কারণ পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বলির চিফ সেক্রেটারি ছিলেন তার ছেলে। যখন ছয় দফা আলোচনা হতো, তখন আমি পার্টির হুইপ হিসেবে তাদের আলোচনার জায়গায় নিয়ে যেতাম।

এ সময় পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলোচনার জন্য দলের মধ্য থেকে বলা হয়েছিল, ‘দেখো, সবচাইতে বিপজ্জনক লোক হচ্ছে তাজউদ্দীন আহমদ, ফাইল নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে বঙ্গবন্ধুর পাশে।’

ওই সময় কামাল আসফার আমার বাসায় একদিন এলো। আসফারের সঙ্গে থাকা লোকেরা তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে আমাকে বললেন, ‘ভেরি প্রাউড, জেনারেল সেক্রেটারি অব ইস্ট পাকিস্তান আওয়ামী লীগ।’ ছয় দফাকে স্কুলের পাঠ্যপুস্তকের সিলেবাসে তালিকাভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। উনসত্তরের নির্বাচনের পর নির্বাচিত সব সদস্যকে বঙ্গবন্ধু শপথ করালেন। এবং সেখানে জনসমুদ্রের সামনে শপথ করানো একটি ব্যতিক্রমী আয়োজন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু ও শেষ হওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন ভূখণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার পেছনে তাজউদ্দীন আহমদের অবদান অতুলনীয়। একাত্তরের ১ মার্চ অ্যাসেম্বলি ভেঙে দেওয়া এবং ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ থেকে শুরু করে ২৫ মার্চ কালরাত পর্যন্ত ইতিহাস সবারই জানা। ২৬ মার্চের পর আমরা তো ভারতে পালিয়ে গেলাম। আমি আর তাজউদ্দীন আহমদ একসঙ্গে পালাই। পালানোরও অনেক ইতিহাস রয়েছে। আমরা তো দুজনের নামও পরিবর্তন করেছিলাম। যা হোক, ২৬ মার্চের পর আমরা ঢাকা ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হই। মনে পড়ে, ধানমণ্ডি থেকে আমরা রওনা হই। আমাদের দুজনের হাতে দুটি বাজারের ব্যাগ। যেন আমরা বাজার করতে যাচ্ছি। তাজউদ্দীন আহমদের পরনে লুঙ্গি ও পাঞ্জাবি, মাথায় সাদা টুপি। বাজারের ব্যাগের নিচে তাঁর নিজের ব্যাগ রাখা হয়েছে। আমরা সাতমসজিদ রোডে পৌঁছেছি। আরেকটু এগিয়ে ডান দিকে মোড় নিলেই ধানমণ্ডি ১৯ নম্বর সড়ক। সেটা পার হলেই রায়েরবাজার। এমন সময় আমাদের পেছনে একটি মিলিটারি জিপ এলো। জিপটি চলে যেতেই আমরা আবার রাস্তায় আসি। ডানে মোড় নিলে লালমাটিয়া সীমানা পেরিয়ে ১৯ নম্বর সড়ক। ডানে মোড় নেব, এমন সময় তাজউদ্দীন থমকে দাঁড়ান। আরেকটু ঘুরেই ডান পাশে তাঁর বাড়ি। তিনি বাড়ি যেতে চাইলেন। আমি জোর আপত্তি জানাই। আমি যুক্তি দিলাম, আপনার বাড়ি নিশ্চয়ই আক্রান্ত হয়েছিল, হায়েনার দল এখনো বাড়ির আশপাশে আড়ি পেতে থাকতে পারে। তাজউদ্দীন আহমদের মনে পড়ল তাঁর ওষুধগুলোর কথা। সেগুলো বাড়ি রয়ে গেছে। কিন্তু আর বাড়ি যাওয়া হলো না, কলকাতার পথে যাত্রা চলল।

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ভারতে অবস্থান, প্রবাসী সরকার গঠন, মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা নিয়ে তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, শেখ মণি, ড. কামাল, কামরুজ্জামান, মনসুর আলী, আমিসহ বেশ কয়েকজন যা যা করেছি, তার সবটাই ইতিহাসের অংশ হয়েছে।

অস্থায়ী সরকার গঠনের সময় আমরা তাজউদ্দীন আহমদকে সরকারের প্রধান করার সিদ্ধান্ত নিই। এ বিষয়ে তিনি কোনো আপত্তি করলেন না। এরপর রেডিওতে প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা প্রচারের পালা। আমি গোলক মজুমদারকে বললাম, ক্যাসেট যদি পাঠিয়ে থাকে, তাহলে প্রচার করে দিন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই একটিমাত্র সিদ্ধান্ত এককভাবে নিয়েছিলাম। সেদিন ছিল ১০ এপ্রিল। রেডিও অন করে রেখে খেতে বসেছি। খাবার টেবিলে তাজউদ্দীন আহমদ ও শেখ মণি আছেন। রাত তখন সাড়ে ৯টা। সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এলো। রেডিওতে প্রথম আমার কণ্ঠ ভেসে এলো। ঘোষণায় আমি বলেছিলাম, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বক্তৃতা দেবেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতা প্রচার হলো। সারা বিশ্ববাসী শুনল স্বাধীন বাংলা সরকারের প্রধানমন্ত্রীর বেতার বক্তৃতা। আমাদের সংগ্রামের কথা দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ল। বক্তৃতা প্রচারিত হলো। আমাদের তিনজনের কারো মুখেই কোনো কথা নেই। আমি শুধু বললাম, গোলক মজুমদার শেষ পর্যন্ত বক্তৃতা প্রচার বন্ধ করতে পারেনি। মনসুর আলী খেয়ে আগেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। তিনি বক্তৃতা শুনতে পাননি। পরে একক সিদ্ধান্তে বক্তৃতা প্রচারের জন্য তাজউদ্দীন আহমদের কাছে ক্ষমা ও শাস্তি প্রার্থনা করলাম। তিনি বলেছিলেন যে সে সময় আমার সিদ্ধান্তই ঠিক ছিল। সেদিন বক্তৃতা প্রচার না করলে গোলমাল আরো বাড়ত।

ভাবাবেগের ঊর্ধ্বে উঠে সঠিক নিয়মতান্ত্রিক ও নিয়মানুগ সিদ্ধান্ত দেওয়ার ক্ষেত্রে তাজউদ্দীনের কোনো বিকল্প আমি দেখিনি। নির্মোহ ও নিস্বার্থ, সেটা যে-ই হোক না কেন, সিদ্ধান্তের ব্যাপারে কোনো পার্থক্য ছিল না। তিনি ছিলেন এমন একজন রাজনীতিক। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলাদেশের রূপকার আর তাজউদ্দীন ছিলেন বঙ্গবন্ধুর শ্রেষ্ঠ কারিগর।

তাজউদ্দীন আহমদ একজন সাহসী মানুষ ও সাহসী রাজনীতিবিদের নাম। বাংলাদেশে তাজউদ্দীন একজনই। এই মানুষটিকে যতটা সাহসী দেখেছি, ঠিক ততটাই সৎ ও একনিষ্ঠ ছিলেন। এই রাজনীতিবিদের প্রতিটি কর্মের মধ্যে সাহসের ছাপ ছিল। 

(অনুলিখন : রেজাউল করিম)



মন্তব্য