kalerkantho


কমরেড মণি সিংহ

ভদ্রলোক বনাম ছোটলোকদের রাজনীতি

যতীন সরকার
প্রাবন্ধিক ও শিক্ষাবিদ

১১ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ভদ্রলোক বনাম ছোটলোকদের রাজনীতি

১০ বছর যখন আমার বয়স, সেই ১৯৪৬ সালে, আমি প্রথম মণি সিংহের নাম শুনি। সে বছরেই ব্রিটিশ শাসনের অধীনে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। তখন এ দেশে চালু ছিল ‘পৃথক নির্বাচন পদ্ধতি’। সেই পদ্ধতিতে মুসলমানদের জন্য নির্ধারিত আসনে ভোট দিত মুসলমান ভোটাররা আর হিন্দুদের আসনে হিন্দুরা। হিন্দুদেরও আসন ছিল ‘বর্ণহিন্দু’ ও ‘তফসিলি হিন্দু’—এ দুই ভাগে বিন্যস্ত।

আমাদের নেত্রকোনা এলাকায় বর্ণহিন্দুদের আসনে লড়াইটা হয়েছিল কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট—এ দুই পার্টির মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে। কংগ্রেস মনোনীত প্রার্থী ছিলেন অমূল্য অধিকারী আর মণি সিংহ ছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির। সে সময়কার বর্ণহিন্দুদের বেশির ভাগ মানুষই ছিল কংগ্রেসপন্থী, তাদের মস্তিষ্ককোষ ছিল কমিউনিস্ট-বিদ্বেষে ভরপুর। তাই স্বভাবতই, নির্বাচনে কমিউনিস্ট প্রার্থী মণি সিংহের ঘটেছিল শোচনীয় পরাজয়।

মণি সিংহ যেহেতু আমাদের নেত্রকোনা এলাকারই মানুষ এবং ১৯৪৬ সালে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সূত্রে এখানকার ভদ্রলোকরা তাঁর প্রতি বিদ্বেষে একেবারে অন্ধ হয়ে যায়, তাই স্বাভাবিকভাবেই তাঁর সম্পর্কে জানার কৌতূহল আমার ভেতর একান্ত প্রবল হয়ে ওঠে। একসময় তো তাঁর স্নেহসান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্য লাভেও আমি ধন্য হয়ে যাই। ১৯৮৩ সালে প্রকাশিত তাঁর আত্মজীবনী ‘জীবনসংগ্রাম’ পাঠ করে অনেকের মতো আমিও উজ্জীবিত হই। এরপর হাতে আসে ‘জাতীয় সাহিত্য প্রকাশনী’র ‘কমরেড মণি সিংহ স্মারকগ্রন্থ’ (সেপ্টেম্বর ২০০৫)। এ বইয়ে সংকলিত লেখাগুলোও আমার ভাবনাধারাকে বিশেষভাবে আন্দোলিত করে।

এসবের ফলেই আমি উপলব্ধি করি : মণি সিংহ (১৯০১-১৯৯০) জন্মসূত্রে যে ‘ভদ্রলোক’-সমাজের সদস্য হয়েছিলেন, সেই সমাজের স্বার্থরক্ষায় যদি সারা জীবন নিজেকে ব্যাপৃত রাখতেন, তাহলে দেশ-গাঁয়ের অন্য অন্য সব ভদ্রলোকেরই মান্যতা পেয়ে যেতেন। অথচ তিনি কিনা চললেন সম্পূর্ণ উল্টো পথ ধরে, ছোটলোকদের কাতারে নেমে এসে ভদ্রলোকদের স্বার্থের গোড়াতেই যেন কুড়ালের কোপ বসালেন। কাজেই স্বার্থান্ধ সব ভদ্রলোকই যে তাঁর ওপর খেপে গিয়ে যাচ্ছেতাই বলতে ও করতে থাকবে, তেমনটিই তো স্বাভাবিক। ১৯৪৬ সালে আমাদের গ্রাম এলাকার অনেক চুনোপুঁটি ভদ্রলোকের কথায় ও আচরণেও এমন কদর্য স্বাভাবিকতার প্রকাশই প্রত্যক্ষ করেছি।

মণি সিংহ যখন ‘মস্কো থেকে বিপ্লবের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নিয়ে আসা’ গোপেন চক্রবর্তীর কাছে দীক্ষা নিয়ে কমিউনিস্ট হয়ে গেলেন এবং ‘ছোটলোক’ চাষিদের ‘টঙ্কপ্রথাবিরোধী আন্দোলন’-এর নেতারূপে সুসঙ্গ পরগনায় তাঁর জমিদার মামাদের কায়েমি স্বার্থের ওপর আঘাত হেনে বসলেন, তখন ছোট-বড় সব ভদ্রলোকগোষ্ঠীর মানুষই তাঁর শত্রু হয়ে গেলেন। তাঁদের এ রকম শত্রু হয়ে ওঠার যথার্থ কারণটির যথাযথ উপলব্ধির জন্যই সে সময় প্রচলিত টঙ্কপ্রথার প্রকৃতি সম্পর্কে অবহিত হওয়া প্রয়োজন।

সে সময়কার ময়মনসিংহ জেলার উত্তরাঞ্চলে টাকার বদলে ধান দিয়ে জমিদারদের খাজনা পরিশোধ করার যে রীতি চালু ছিল তারই নাম ‘টঙ্কপ্রথা’। সেই প্রথা অনুযায়ী রায়তদের প্রতি সোয়া একর জমির জন্য খাজনা দিতে হতো ১০ থেকে ১৫ মণ ধান। টাকার হিসাবে এটি ছিল নগদ খাজনা হারের দ্বিগুণেরও বেশি। তাই টঙ্ক এলাকার রায়তরা এই প্রথার অবসান ঘটিয়ে তখনকার প্রচলিত হারে নগদ টাকায় খাজনা দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল; কিন্তু জমিদাররা রায়তদের এই দাবি মেনে নিতে রাজি হননি।

ওই রায়তরা ছিল জঘন্য ধরনের সামন্তবাদী শোষণের শিকার। টঙ্কপ্রথার রীতি অনুসারে জমিতে কৃষকের কোনো স্বত্বই স্বীকৃত হতো না। নির্দিষ্ট পরিমাণ জমির জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ ধান খাজনা হিসেবে (যাকে বলা হতো ‘ধান-কড়ারি খাজনা’) পাওয়ার শর্তে জমিদাররা কৃষকদের জমি বন্দোবস্ত দিতেন এক বছরের জন্য। জমিতে ফসল না ফললে কিংবা প্রাকৃতিক দুর্বিপাকে ফসলহানি হলেও কৃষকরা ‘ধান-কড়ারি খাজনা’ দেওয়া থেকে রেহাই পেত না।

এ রকম শোষণ ও নির্যাতনে বিপর্যস্ত কৃষকদের পাশে এসে দাঁড়ালেন কমরেড মণি সিংহ, গড়ে তুললেন টঙ্কপ্রথাবিরোধী আন্দোলন। তাঁরই নেতৃত্বে টঙ্ক কৃষকরা যে ছয় দফা দাবিনামা প্রস্তুত করে, সেগুলো ছিল—১. টঙ্কপ্রথার সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটাতে হবে; ২. জমির ওপর টঙ্ক কৃষকদের অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে; ৩. ‘ধান-কড়ারি খাজনা’ তুলে দিয়ে নগদ টাকায় দেয় হারের যথানুপাতে খাজনা নির্ধারণ করতে হবে। ৪. টঙ্ক খাজনার বকেয়া দাবি করা চলবে না; ৫. জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ করতে হবে; ৬. সাম্রাজ্যবাদের ধ্বংসসাধনে তত্পর হতে হবে।

মণি সিংহের নেতৃত্বে সংঘটিত টঙ্কপ্রথাবিরোধী আন্দোলন এবং এরপরে তেভাগা আন্দোলন সফল হওয়ায় বাংলার সব অঞ্চলের ‘ভদ্রলোক’দেরই গায়ে জ্বালা ধরে যায়। সেই জ্বালার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে গিয়েই মণি সিংহকেও তাঁরা ‘ছোটলোক’ বলে গালাগালি দিতে থাকেন। ভদ্রলোকের ঘরে জন্ম নিয়েও ছোটলোকদের স্বার্থে নিজের সব সুযোগ-সুবিধা ছেড়ে দিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায় যে, সেই লোকটিও ছোটলোক ছাড়া আর কী?

ছোটলোক হয়ে যাওয়া মণি সিংহ ছোটলোকদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই নিজের জীবন উৎসর্গ করে দিয়েছিলেন। তাঁরই সক্রিয় উদ্যোগে ১৯৪৫ সালের এপ্রিল মাসের ৪ ও ৫ তারিখে নেত্রকোনার নাগরার মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ‘সারা ভারত কৃষক সম্মেলন’। সেই সম্মেলন বানচাল করার জন্যও ভদ্রলোকরা কম চেষ্টা করেননি। এমনকি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের মতো ভদ্রলোকদের দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী দলও দুটি পৃথক ইশতেহারে এই সম্মেলনে যোগদান করা থেকে বিরত থাকতে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছিল। জনগণ সেই আহ্বানে সাড়া তো দেয়ইনি, বরং সম্মেলনে ঘটে বিপুলসংখ্যক লড়াকু জনতার সমাবেশ। বলা যেতে পারে, এটি যেন ছিল ভদ্রলোকবিরোধী ছোটলোকদের সম্মেলন।

ময়মনসিংহ শহরে তখন ছিল গোপন কমিউনিস্ট পার্টির অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান। পার্টির ময়মনসিংহ জেলা কমিটিতে তখন ছিলেন সাতজন সদস্য। তাঁরা হলেন খোকা রায়, পুলিন বক্সী, মণি সিংহ, রবি নিয়োগী, পবিত্র শঙ্কর ও আলতাব আলী। তাঁদের ভেতর সর্বাধিক গণপরিচিতি ছিল কমরেড মণি সিংহের। ১৯৪১ সালেও তিনি ছিলেন কারাবন্দি, তাঁর কারামুক্তি ঘটে ১৯৪২ সালে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর ফ্যাসিস্ট জার্মানির আক্রমণের সেই দিনটি ছিল ১৯৪১ সালের ২২ জুন। এর অব্যবহিত পরেই যুদ্ধের প্রকৃতি-পরিবর্তন ঘটে যাওয়ার বিষয়টিকে বিবেচনায় নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি এটিকে ‘জনযুদ্ধ’ আখ্যা দেয় এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামী ঐক্য গড়ে তোলার আহ্বান জানায়।

এরপর ১৯৪২ সালের জুলাই মাসে ব্রিটিশ সরকার কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়। ১৯৪৩ সালে মুম্বাইয়ে অনুষ্ঠিত হয় কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম ‘কংগ্রেস’ বা সম্মেলন। সেই সম্মেলনে ময়মনসিংহ জেলার প্রতিনিধিরূপে যোগ দেন মণি সিংহ ও পুলিন বক্সী।

আমরা দেখেছি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে ‘জনযুদ্ধ’ আখ্যায়িত করার পর কমিউনিস্ট পার্টির ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে কংগ্রেসসহ ভদ্রলোকগোষ্ঠীর বিভিন্ন দলের অনুসারীরা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে কুৎসার বান ছুটিয়ে দেন। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সে সময়কার কমিউনিস্ট পার্টি চিন্তা ও কর্মে ছিল সম্পূর্ণ অভ্রান্ত। যুদ্ধে মিত্র শক্তির জয় ও ফ্যাসিবাদের পরাজয়ের মধ্য দিয়ে বিশ্বসভ্যতা মহাদুর্যোগের হাত থেকে রক্ষা পায়, উপনিবেশবাদের বিলুপ্তি ঘটার সূচনা হয়, বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক শিবিরের পত্তন ঘটে এবং শোষণমুক্ত মানবসমাজ প্রতিষ্ঠার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দেয়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের জোয়াল থেকে মুক্তি পেয়ে আমাদের দেশের মানুষও নতুন প্রত্যয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠে।

কিন্তু হায়, বিদেশি শাসনের জোয়ালমুক্ত হয়েও ছোটলোকদের কাঁধের ওপর ভদ্রলোকদের চাপিয়ে দেওয়া জোয়াল আগের মতোই বহাল রইল। আর ছোটলোকদের যে রাজনৈতিক সংগঠন, সেই কমিউনিস্ট পার্টির ওপর চলল বিরামহীন নিপীড়ন-নির্যাতন। পাকিস্তান ও ভারত—উভয় রাষ্ট্রেই এমনটি চললেও পাকিস্তানের কমিউনিস্টদের ওপর নির্যাতন স্বাভাবিকতার সব সীমা ছাড়িয়ে গেল। এ রকমটি না হয়েই পারে না। কারণ পাকিস্তানকে মুসলমানের রাষ্ট্র বলা হলেও রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব যে ছোটলোক মুসলমানদের হাতে ছিল না, শুরু থেকেই যে এটি ছিল ভদ্রলোক বা শরিফ মুসলমানদের কর্তৃত্বাধীন, সে কথা তো বলাই বাহুল্য। ভদ্রলোক-ছোটলোক-নির্বিশেষে সব অমুসলমানই তো সেই রাষ্ট্রে দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছিল। ছোটলোকদের স্বার্থসাধনে নিয়োজিত কমিউনিস্ট পার্টির, বিশেষ করে সে পার্টিতে অমুসলমান সম্প্রদায় থেকে আসা মণি সিংহের মতো নেতাদের তো পাকিস্তান আমলজুড়েই থাকতে হয়েছে কারাবাসে অথবা অজ্ঞাতবাসে। তবু এমন চরম দুরবস্থার মধ্যেও তাঁরা আদর্শচ্যুত হননি, পাকিস্তানি অমানবিক শাসনের জগদ্দল পাথরের অপসারণ ঘটানোর সংগ্রাম চালিয়েই গেছেন। সে সংগ্রামে একসময় তাঁদের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী জাতীয়তাবাদীদেরও সংযোগ ঘটে। আইয়ুবি স্বৈরাচারের দুঃশাসনে দেশের মানুষের দম বন্ধ হয়ে আসার সময়টিতে, ১৯৬১ সালের ডিসেম্বর মাসে, সে সময়কার গোপন কমিউনিস্ট পার্টির মণি সিংহ ও খোকা রায় এবং আওয়ামী লীগের শেখ মুজিব ও তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার যে চারটি গোপন বৈঠক হয়, সেই বৈঠকগুলোতেই রোপিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামের রক্তবীজ।

১৯৭১ সালে সশস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রামে অন্যান্য বামপন্থীর সহযোগে মণি সিংহের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট পার্টি অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করে। কমিউনিস্ট পার্টি, ন্যাপ (মোজাফফ্র) ও ছাত্র ইউনিয়নের একটি সম্মিলিত গেরিলা বাহিনী স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে অতুলনীয় বীরত্বের পরিচয় দিয়েছিল। অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের যে ‘পরামর্শদাতা’ কমিটি গঠিত হয়েছিল, মণি সিংহ তারও সদস্য হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর একটি সাক্ষাৎকারে তিনি জানান—

‘১৯৭০-এর নির্বাচনের ফলাফল পাকিস্তানি শাসকরা যে মেনে নেবে না এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম অনিবার্য এবং তা সশস্ত্র সংগ্রাম হতে পারে এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু এবং আমাদের পার্টি ঐকমত্যে পৌঁছেছিল। বঙ্গবন্ধু আমাদের বলেছিলেন যে সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং স্বাধীনতাসংগ্রামের পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থনের জন্য যোগাযোগের ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির সহযোগিতা তাঁর জন্য মূল্যবান হবে, কেননা আওয়ামী লীগের এ ক্ষেত্রে যোগাযোগের অভাব রয়েছে।’

বঙ্গবন্ধু কমিউনিস্ট পার্টির যে মূল্যায়ন করেছিলেন এবং পার্টির কাছে যা প্রত্যাশা করেছিলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে আমরা তা পূরণ করতে পেরেছি’—এমন কথাও মণি সিংহ অত্যন্ত প্রত্যয়ের সঙ্গে উল্লেখ করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধোত্তর দেশে কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ‘ঐক্য ও সংগ্রাম’-এর নীতি গ্রহণ করে। এ ব্যাপারেও নির্মোহ আত্মসমালোচনা করে মণি সিংহ কমিউনিস্ট পার্টির সভায় যা বলেছিলেন, সে সম্পর্কে কমরেড মোজাহিদুল ইসলাম ‘মণি সিংহ স্মারকগ্রন্থ’তে লিখেছেন—

“বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে তিনি [মণি সিংহ] ঐক্য ও সংগ্রামের নীতির সপক্ষে ছিলেন, কিন্তু সংগ্রামের বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না বলে সমালোচনা-মুখর ছিলেন, ‘বাকশাল’ প্রক্রিয়ার বিষয়ে তিনি সন্দিহান ও সংশয়াপন্ন ছিলেন, জাতীয়তাবাদীদের সঙ্গে ঐক্য করার পক্ষে থাকলেও তাদের অনুষঙ্গ হয়ে থাকতে হবে আপাতত এই তত্ত্বের বিরোধী ছিলেন। জিয়ার খালকাটা কর্মসূচিতে অংশ নেয়ার বিরোধী ছিলেন, জিয়ার ‘হ্যাঁ-না’ ভোটে অংশ নেয়ার বিরোধী ছিলেন।”

অর্থাৎ ছোটলোকদের দলের প্রচণ্ড কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন এই নেতা ভদ্রলোকদের মনের অলিগলি ও তাঁদের রাজনীতির ভেতর-বাহির সবই দ্বান্দ্বিক দৃষ্টিতে দেখে নিতে পারতেন। তাঁর অবদানকে অস্বীকার করার ক্ষমতা কোনো ভদ্রলোকেরও নেই। তাই মণি সিংহের নাম শুনলেই ভদ্রলোকদের গায়ে জ্বালা ধরে যায়।

তবে গত শতকের শেষ দশকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙন ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরে বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পর সারা পৃথিবীর ভদ্রলোকদের মধ্যেই বাঁধভাঙা আনন্দের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। তথাকথিত বিশ্বায়নের রমরমা দেখে তাঁরা ধারণা করে নিয়েছিলেন, ছোটলোকদের লাফালাফি চিরদিনের জন্যই শেষ হয়ে গেছে। ফুকুয়ামা নামে তাঁদের এক পোষ মানা তত্ত্ববিদ তো ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ই ঘোষণা করে বসেছিলেন। সেই সমাপ্তিতত্ত্বের পাকে পড়ে আমাদের দেশের ভদ্রলোকরাও মণি সিংহের নামটিও ভুলে গিয়েছিলেন প্রায়।

কিন্তু এরপর এক দশক কালও পার হলো না। ভদ্রলোকদের বিশ্বায়নের জোয়ারে লাগল ভাটার টান। সেই টান শুরু হলো বিশ্বায়নের বিশ্বেশ্বরদের দেশ থেকেই। যুক্তরাষ্ট্রের সংখ্যাগুরু শোষিত ছোটলোকরা সংখ্যালঘু শোষক ভদ্রলোকদের জারিজুরি ফাঁস করে দিতে পথে নামল, শোষকদের বালাখানা ‘ওয়াল স্ট্রিট’ দখল করে নেওয়ার স্লোগান তুলল।

অবশ্য এতেই যে এই মুহূর্তেই সারা পৃথিবীতে ভদ্রলোকের রাজত্বের অবসান ঘটে যাবে, তা নয়। তবে সেই দিন খুব বেশি দূরেও নয়। আমাদের দেশেও প্রয়াত মণি সিংহের উত্তরাধিকারের ধারকরা জেগে উঠছে। ছোটলোকদের হাতেই এমন পৃথিবীর প্রতিষ্ঠা হবে, যেখানে সবাই মিলিত কণ্ঠে গাইবে—‘আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে’।



মন্তব্য