kalerkantho

আশা জাগিয়েছিল ছোট দলগুলোও

শাহীন আহমেদ
প্রাবন্ধিক ও গবেষক

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



আশা জাগিয়েছিল ছোট দলগুলোও

ছোট দলগুলোর ভিত্তি ছিল স্থানীয় প্রাকৃতজনের সমর্থন। জমিদারপ্রথার বিরুদ্ধে, স্বাধীনতার প্রশ্নে এসব দলের অবস্থান ছিল আপসহীন। তাই এদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট ছিল ব্রিটিশ প্রশাসন। আবার আনুগত্য বজায় রেখে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ব্রিটিশ সরকারকে ভারত ছাড়তে রাজি করানোর প্রচেষ্টায় নিয়োজিত বড় দুই রাজনৈতিক দলও চায়নি এসব দল বিকশিত হোক। বিপুল জনসমর্থন থাকার পরও এসব দল কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বড় দুই দলের প্রভাববলয়ের বাইরে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। পারলেও খুব বেশি স্থায়ী হয়নি তাদের প্রভাব

 

ব্রিটিশ সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গঠিত মূল ধারার দুটি বড় রাজনৈতিক দল—কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের বাইরেও কিছু রাজনৈতিক সংগঠন ছিল, ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক মনন তৈরিতে যাদের ভূমিকাও কম ছিল না। প্রদেশভিত্তিক এসব দলের সর্বভারতীয় প্রভাব ছিল না, তবে কৃষক-শ্রমিকসহ প্রান্তিক সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেছিল তারা। বড় দুটি দল দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের শিক্ষিত-সম্ভ্রান্ত মানুষের নেতৃত্ব ও সমর্থন নিয়ে রাজনীতি-আন্দোলন করেছে, ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করেছে। অন্যদিকে ছোট দলগুলোর ভিত্তি ছিল স্থানীয় প্রাকৃতজনের সমর্থন। জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে, স্বাধীনতার প্রশ্নে এসব দলের অবস্থান ছিল আপসহীন। তাই এদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট ছিল ব্রিটিশ প্রশাসন। আবার আনুগত্য বজায় রেখে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে ব্রিটিশ সরকারকে ভারত ছাড়তে রাজি করানোর প্রচেষ্টায় নিয়োজিত বড় দুই রাজনৈতিক দলও চায়নি এসব দল বিকশিত হোক। বিপুল জনসমর্থন থাকার পরও এসব দল কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে বড় দুই দলের প্রভাববলয়ের বাইরে স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। পারলেও খুব বেশি স্থায়ী হয়নি তাদের প্রভাব। সাধারণ মানুষের মধ্যে এসব দলের গ্রহণযোগ্যতা কাজে লাগিয়ে বড় দলগুলো পুষ্ট হয়েছে, তাদের সমর্থনে সরকার গঠন করেছে। আবার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে উপেক্ষা করেছে। অঞ্চলভিত্তিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জনমত ও প্রত্যক্ষ আন্দোলনের মাধ্যমে ব্রিটিশ উপনিবেশ বিরোধী মনোভাব গঠনে সক্রিয় থাকা এসব দল ক্রমে বড় দুই দলে বিলীন হয়ে গেছে, অথবা রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে সরে গেছে।

একই ব্যক্তির একাধিক রাজনৈতিক সংগঠনের নেতৃত্বে যুক্ত থাকার রেওয়াজ ছিল সেই সময়। বাংলায় প্রাদেশিক কংগ্রেসের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা একই সঙ্গে প্রাদেশিক মুসলিম লীগের কমিটিতেও ছিলেন, তাঁদেরই কেউ কেউ কৃষক প্রজা সমিতি, ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি, নিউ মুসলিম মজলিসের মতো নতুন নতুন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হতেন। স্বাধীনতার প্রশ্নে বড়-ছোট সব দলের মধ্যে নীতিগত ঐক্য ছিল। আবার সর্বভারতীয় মুসলমানদের স্বার্থরক্ষায় মুসলিম লীগের নীতির সঙ্গে একমত থাকলেও প্রাদেশিক স্বার্থের প্রশ্নে স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখার চেষ্টা ছিল ছোট দলগুলোতে। কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনের সময় এ রকম দ্বন্দ্ব ষ্পষ্ট হতো, তখন মনোনয়ন দেওয়া নিয়েও দেনদরবার হতো যার যার অবস্থান থেকে। এই দলগুলোর বেশির ভাগই পরে বড় দলের সঙ্গে একীভূত হয়ে গেছে, অনেকে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে।

ব্যতিক্রম ছিল কমিউনিস্ট পার্টি। উপনিবেশ ও শ্রেণিবৈষম্যের বিরুদ্ধে স্পষ্ট ও আপসহীন অবস্থানের কারণে দলটি একই সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের চক্ষুশূল এবং বড় দুই রাজনৈতিক দলের বিরাগভাজন ছিল। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও দলটি প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পক্ষে সংগ্রাম করে গেছে, অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করে গেছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান—দুই আমলেই নির্মম নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে কমিউনিস্ট পার্টির নেতাকর্মীদের। সদ্যোভূমিষ্ঠ দুই দেশ—পাকিস্তান ও ভারতে ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’ স্লোগান নিয়ে সশস্ত্র বিপ্লবের মাধ্যমে সরকার উত্খাতের ডাক দিলে দুই দেশেই তাদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন নেমে আসে, বিশেষ করে ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০-এর মধ্যে। এ সময় মোট চার দফা ধর্মঘটে কমিউনিস্ট রাজবন্দিরা ঢাকা জেলে মোট ১২৭ দিন এবং রাজশাহী জেলে ১৮৫ দিন অনশন করেন। [তথ্যসূত্র : ‘জাতীয় রাজনীতি : ১৯৪৫ থেকে ৭৫’, অলি আহাদ]।

 

স্বরাজ্য দল

১৯২২ সালের ডিসেম্বরে গয়া কংগ্রেসের সভাপতি হিসেবে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ‘কাউন্সিল এন্ট্রি’ প্রস্তাব পেশ করেন। কংগ্রেস তাঁর মত গ্রহণ না করায় ১৯২৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি স্বরাজ্য দল গঠন করেন। ডা. আনসারি হাকিম, আজমল খাঁ, বিঠলভাই প্যাটেল, পণ্ডিত মতিলাল নেহরু, মওলানা আকরম খাঁ, মওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, ডা. বিধানচন্দ্র রায়—এমন অনেক নেতা দেশবন্ধুকে সমর্থন করেন। [তথ্যসূত্র : ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’, আবুল মনসুর আহমদ]। ওই বছরেরই মার্চে আইনসভার নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল স্বরাজ্য দল। ময়মনসিংহ থেকে ওই দলের প্রার্থী ছিলেন তৈয়বুদ্দিন। তাঁর পক্ষে নির্বাচনে নামেন তখনকার তরুণ রাজনৈতিক কর্মী আবুল মনসুর আহমদ। নির্বাচনে হেরে গেলেন প্রতিদ্বন্দ্বী বিত্তশালী ধনবাড়িয়ার নবাব সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী। গরিব জননেতার কাছে সরকার সমর্থিত ধনী প্রার্থীর পরাজয় এ অঞ্চলে এটাই প্রথম। নির্বাচনে স্বরাজ্য দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল, হিন্দু-মুসলিম সদস্য প্রায় সমান সমান। উদারমনা মুসলিম ও হিন্দু নেতাদের নিয়ে এ সময় দেশবন্ধু ‘বেঙ্গল প্যাক্ট’ নামে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে একটি চুক্তিনামা তৈরি করেন। এতে সরকারি চাকরি ও কলকাতা করপোরেশন, ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডসহ স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে মুসলমানদের জন্য ৮০ শতাংশ বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব ছিল। প্রাদেশিক কংগ্রেসের প্রকাশ্য সম্মিলনীতে এই প্রস্তাব পাস করানোর জন্য ১৯২৪ সালে মওলানা আকরম খাঁর সভাপতিত্বে সিরাজগঞ্জে অধিবেশন আহ্বান করেন তিনি। কংগ্রেসের সাম্প্রদায়িক হিন্দু নেতারা ওই প্যাক্টের কারণে দেশবন্ধুর বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে মুসলমানদের মধ্যে দেশবন্ধুর জনপ্রিয়তা বাড়ে। সংবাদপত্রে ও জনসভায় প্রবল বিরুদ্ধ প্রচারণার মধ্যেও দেশবন্ধু কলকাতা করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়ে তরুণ মুসলিম নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে ডেপুটি মেয়র করেন। সুভাষচন্দ্র বসুকে চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার এবং হাজি আবদুর রশীদকে ডেপুটি সিইও করার পাশাপাশি অনেক মুসলমান গ্র্যাজুয়েট-এমএকে রাতারাতি করপোরেশনের উচ্চপদে নিয়োগ করেন। আবুল মনসুর আহমদ তাঁর বইতে লিখেছেন : ‘কলিকাতা করপোরেশনের মত হিন্দু-প্রধান প্রতিষ্ঠানে মুসলমানদের পক্ষে রাতারাতি অত ভাল চাকুরি পাওয়া কল্পনারও অগোচর ছিল। সিরাজগঞ্জের সফল অধিবেশনে দেশবন্ধুর বেঙ্গল প্যাক্ট সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হল। অধিবেশনে মর্মস্পর্শী বক্তৃতায় দেশবন্ধু বলেছিলেন : হিন্দু-মুসলিম ঐক্য ব্যতীত আমাদের স্বরাজ্যের দাবি চিরকাল কল্পনার বস্তুই থাকিয়া যাইবে।’ তাঁর কল্পিত হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের একটি রূপরেখাও দিয়েছিলেন তিনি : ‘হিন্দু ও মুসলমান তাদের সাম্প্রদায়িক স্বতন্ত্র সত্তা বিলোপ করিয়া একই সম্প্রদায়ে পরিণত হউক, আমার হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের রূপ তা নয়। ওরূপ সত্তা বিসর্জন কল্পনাতীত।’ ১৯২৫ সালের ১৬ জুন বড় অসময়ে দেশবন্ধুর অন্তর্ধানের মধ্য দিয়ে বিলুপ্তি ঘটল বেঙ্গল প্যাক্টের চেতনার। শেষ পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার মধ্য দিয়ে দেশ ভাগ হলো, হিন্দু ও মুসলমানদের জন্য আলাদা দুই দেশ তৈরি হলো, ঐক্যের ভিত্তিতে নয়, রক্তাক্ত বিভাজনের মধ্য দিয়ে। বেঙ্গল প্যাক্ট বাতিল হয়েছিল ১৯২৯ সালে। এ বিষয়ে অলি আহাদ লেখেন : ‘অবস্থা বৈগুণ্যে বিভ্রান্ত হইয়া তদীয় (চিত্তরঞ্জন) অনুগামী সুভাষচন্দ্র বসু নিজ সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কৃষ্ণনগর কনফারেন্সে (১৯২৯) বেঙ্গল প্যাক্ট বাতিল ঘোষণা করেন। কিন্তু যে উদ্দেশ্যে নেতাজী এই ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন, তাহা সফল হইল না—ত্রিপুরী কংগ্রেস সম্মেলনে দ্বিতীয়বারের জন্য কায়েমী স্বার্থের তীব্র বিরোধিতা সত্ত্বেও তিনি নিখিল ভারত কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হইলেন বটে, তবে অবাঙালি ঊর্দ্ধতন কংগ্রেস নেতৃবৃন্দের কারসাজিতে অচিরেই পদত্যাগ করিতে বাধ্য হইলেন। স্পষ্ট হইয়া গেল যে অবাঙালিরা তখনই বাঙালি নেতৃত্বকে বরদাশত করিতে রাজী ছিল না।’

এটি কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ—উভয় দলের জন্যই সত্য। যে হক সাহেব লাহোর প্রস্তাব পেশ করেছিলেন পাকিস্তান সৃষ্টির জন্য, পাকিস্তানে তাঁকে গৃহবন্দিত্ব বরণ করতে হয় ৮৫ বছর বয়সে, আর সোহরাওয়ার্দীকে কারাবরণ করতে হয়। বাংলার নেতাদের আস্থায় নিতে পারেননি জিন্নাহসহ পশ্চিম পাকিস্তানি নেতারা।

 

প্রজা সমিতি থেকে কৃষক প্রজা পার্টি

১৯২৮ সালের প্রজাস্বত্ব আইনের প্রশ্নে হিন্দু ও মুসলিম বিভেদ আরো স্পষ্ট হলো। সাম্প্রদায়িকভাবে বিভক্ত হলো আইনসভা, জমিদারপক্ষে হিন্দু সদস্যরা আর প্রজাদের পক্ষে থাকলেন মুসলিম সদস্যরা। মুসলমানদের স্বার্থ, সাধারণ প্রজাদের স্বার্থ রক্ষায় আস্থা ও কার্যকর ভূমিকা হারাল উপমহাদেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক সংগঠন কংগ্রেস। প্রজাদের মধ্যে তো হিন্দুও ছিল। প্রান্তিক হিন্দুদের স্বার্থের ব্যাপারেও উদাসীন ছিল দলটি। বরং জিন্নাহর মুসলিম লীগকেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। এমন পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের প্রগতিশীল নেতারা স্যার আবদুর রহিম ও মওলানা আকরম খাঁর নেতৃত্বে কংগ্রেস ছেড়ে নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতি গঠিত হয়। দল-মত-নির্বিশেষে বাংলার মুসলিম নেতারা প্রজাদের পক্ষে প্রজা সমিতিতে যোগ দিলেন। চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া বিশিষ্ট কংগ্রেস নেতা এবং পরে স্বরাজ্য দলের প্রেসিডেন্ট দেশপ্রিয় জে এম সেনগুপ্তর আক্ষেপ : ‘আজ হইতে কংগ্রেস শুধু মুসলিম-বাংলার আস্থাই হারাইল না, প্রজাসাধারণের আস্থাও হারাইল।’

নিখিল বঙ্গ প্রজা সমিতির ময়মনসিংহ শাখা গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন আবুল মনসুর আহমদ। জেলা শাখার সেক্রেটারি হিসেবে প্রজা আন্দোলনের পক্ষে সমর্থন তৈরিতে তিনি ব্যাপক সাংগঠনিক কার্যক্রম চালান। অনেক কংগ্রেসকর্মীও যোগ দেয় প্রজা সমিতিতে। মওলানা ভাসানীর আহ্বানে সিরাজগঞ্জের এক বিশাল প্রজা সম্মিলনীতে যোগ দেয় প্রজা সমিতি, সোহরাওয়ার্দীও ছিলেন ওই সম্মিলনীতে। ওই সম্মিলনীতে জমিদারি উচ্ছেদ, মহাজনের সুদের হার নির্ধারণসহ কৃষক-প্রজার স্বার্থে বেশ কিছু প্রস্তাব পাস হয়। সারা দেশের কৃষক আন্দোলনকে যুক্ত করে পরে সংগঠনটির নাম হয় কৃষক প্রজা সমিতি, জিন্নাহর ১৪ দফার আদলে ঘোষিত হয় প্রজা সমিতির ১৪ দফা, এতে থাকে বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা বিলোপের দাবি।

মন্দার প্রেক্ষাপটে জেলায় জেলায় প্রজা সমিতি গঠিত হয়, কোনো কোনো জেলায় ছিল কৃষক সমিতি। দুই শ্রেণির প্রান্তিক মানুষের সমর্থন টানার লক্ষ্যে ১৯৩৬ সালে এ কে ফজলুল হক কৃষক প্রজা পার্টি (কেপিপি) গঠন করেন।

১৯৩৭ সালে বাংলায় নির্বাচনে কৃষক প্রজা পার্টিই মুসলিম লীগের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। এই নির্বাচনে সরকারি প্রভাব নিয়ে নবাবদের টাকায় নির্বাচন করে খাজা নাজিমুদ্দীন নিজ জমিদারি পটুয়াখালীতে হেরে যান বিত্তহীন কৃষক-প্রজাদের নেতা শেরেবাংলার কাছে, যিনি ভোটারদের কাছে গেছেন ডাল-ভাতের আশ্বাস নিয়ে। জিন্নাহ নিজে ময়মনসিংহ জেলায় এসে অনেক নির্বাচনী জনসভা করে গেছেন। সেই ময়মনসিংহে ১৬টি মুসলিম আসনের ১১টি পেল কুষক প্রজা পার্টি, মুসলিম লীগ ৫টি। মুসলিম লীগের টিকিটে নির্বাচনে লড়ে টাঙ্গাইলের মধুপুরে পরাজিত হলেন শিক্ষাবিদ প্রিন্সিপাল ইব্রাহীম খাঁ। বাংলার নির্বাচনে মুসলিম লীগ থেকে বেশি আসনে জিতলেও একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় কংগ্রেসের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করার চেষ্টা করে কৃষক প্রজা পার্টি। মতৈক্য না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত মুসলিম লীগের সঙ্গেই কোয়ালিশন সরকার গঠন করেন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। ক্ষমতায় যাওয়ার পর থেকে দুর্বল হতে থাকে দলটি। জনপ্রিয়তা হারানোর পাশাপাশি ভাঙনও দেখা দেয় দলে। ১৯৪৬-এর নির্বাচনে মুসলিম লীগের কাছে শোচনীয় পরাজয় হয় কেপিপির। দেশ বিভাগের পর শেরেবাংলা ঢাকায় এসে কৃষক শ্রমিক পার্টি নামে পুনরুজ্জীবিত করেন সংগঠনটি, যা পাকিস্তান আমলে কয়েক বছর টিকেছিল।

 

ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি

১৯৩৬ সালে নবাব হাবিবুল্লাহর নেতৃত্বে কলকাতায় গঠিত হয় ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি। সোহরাওয়ার্দীও যোগ দেন ওই পার্টিতে। মুসলিম বাংলার নাইট উপাধিপ্রাপ্ত অভিজাত ও নবাব, জমিদার, সওদাগররা ভিড়তে লাগলেন এই দলে। মোটা চাঁদা উঠল দলের তহবিলে। এতে কৃষক প্রজা সমিতির উদ্বেগ দেখা দিল। চিন্তায় পড়লেন নিউ মুসলিম মজলিস নামের প্রগতিশীল তরুণদের আরেকটি সংগঠনের নেতারাও, যাঁদের মধ্যে ছিলেন ডা. আর আহমদ, আব্দুর রহমান সিদ্দিকী ও হাসান ইস্পাহানি। ইউনাইটেড মুসলিম পার্টির সঙ্গে আপসরফারও চেষ্টা করে সংগঠনগুলো। হাসান ইস্পাহানি লিখেছেন, ওই সময় বাংলায় নির্বাচনে অংশ নিতে মাঠে নেমেছিল শক্তিশালী দুটি দল : এর একটি ছিল ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি। এটির নেতৃত্বে ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দীন, নবাব হাবিবুল্লাহ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সোহরাওয়ার্দীই দলটির মূল চালিকাশক্তি। অন্যটি তরুণ উদারপন্থীদের কৃষক প্রজা সমিতি, এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বাধীন দলটিতে ছিলেন কংগ্রেসপন্থী নওসের আলী, হুমায়ুন কবির। এ দুই দলই নির্বাচনে মুসলিম লীগের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে রাজি ছিল না। জিন্নাহর কাছে লেখা এক চিঠিতে সোহরাওয়ার্দী নির্বাচনে বাংলায় মুসলিম লীগের প্রার্থী না দিতে অনুরোধ জানিয়েছিলেন। ১৯৩৬ সালের ৪ জুনের ওই চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন, নিখিল ভারতে মুসলমানদের স্বার্থরক্ষায় মুসলিম লীগের সঙ্গে সহযোগিতা করবে তাঁর দল, তবে স্থানীয় রাজনীতিতে সর্বভারতীয় কোনো দলের নিয়ন্ত্রণ তাঁরা চান না। অবশ্য ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি পরে মুসলিম লীগে মিশে যায়। সোহরাওয়ার্দীসহ দলের তিন প্রধান নেতাই নির্বাচনের পর মুসলিম লীগের প্রতিনিধি হিসেবে হক মন্ত্রিসভার উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দেন।



মন্তব্য