kalerkantho

অগ্নিকন্যা আশালতা সেন

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



অগ্নিকন্যা আশালতা সেন

১৯৩৩ সালে কারাগার থেকে মুক্ত হলে তাঁকে ঢাকা জেলা কংগ্রেসের সহসভাপতি নিযুক্ত করা হয়। ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধী ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দিলে আশালতা সেন সেই আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন । অঙ্কন : বিপ্লব

মাতামহী নবশশী দেবী আশালতা দাশগুপ্তর চেতনায় স্বাজাত্যবোধ ও সংগ্রামী চেতনার যে অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত করে দিয়েছিলেন, তা ক্রমে বিকশিত হয়ে মধ্যাহ্ন সূর্যের তেজে পরিণত হয়। সংসারধর্মে প্রবেশ এবং ১৯১৬ সালে স্বামী সত্যরঞ্জন সেনের অকালমৃত্যুতে সেই তেজ কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়লেও পরে তা আবার দীপ্তিমান হয়ে ওঠে। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন আশালতা সেন স্বরূপে উদ্ভাসিত হন, যুক্ত হন এই আন্দোলনের সঙ্গে

 

সভ্যতার বাঁকে বাঁকে ধর্মাচার, শাস্ত্রাচার, দেশাচার ও সামাজিক-রাজনৈতিক নানা অনুশাসন, বিধি-বিধান এবং সংস্কার-কুসংস্কারে নারীজীবন বিপন্ন হয়েছে। ভারতীয় সমাজও এর ব্যতিক্রম ছিল না। এখানে ধর্ম, সমাজ ও শাস্ত্রের নামে নানাভাবে নারীদের অগ্রযাত্রা ব্যাহত করা হয়েছে, তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, চালানো হয়েছে অমানবিক অত্যাচার-নির্যাতন। সতীদাহ প্রথা, পর্দা প্রথা, পণ প্রথা ও কৌলীন্য প্রথার যূপকাষ্ঠে বলি হয়েছে অগণিত নারীর জীবন। এই তমসাচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্যেও কোনো কোনো নারী সব শৃঙ্খল ভেঙে আলোর মশাল হাতে বের হয়ে এসেছেন, সমাজ-সভ্যতার অগ্রযাত্রায় শামিল হয়েছেন। এমনই এক সংগ্রামী নারী আশালতা দাশগুপ্ত সেন (১৮৯৪-১৯৮৬)। পরাধীন ভারতবর্ষের পশ্চাৎপদ ও অন্ধকার সমাজে তিনি ছিলেন সত্যিকারের বহ্নিশিখা। স্বীয় কর্মদক্ষতা, সাহসিকতা ও প্রতিভার যোগ্যতায় তিনি সমকালীন সমাজ, রাজনীতি ও শিল্প-সাহিত্যের অঙ্গনে নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। অগ্নিকন্যা আশালতা দাশগুপ্ত ১৮৯৪ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি নোয়াখালীতে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস বিক্রমপুরের বিদগাঁও। তাঁর পিতা বলগামোহন দাশগুপ্ত ছিলেন নোয়াখালী জজকোর্টের প্রথিতযশা আইনজীবী। পারিবারিক পরিসরে পেয়েছিলেন আন্দোলন-সংগ্রামের প্রেরণা এবং নিজেকে গড়ে তোলার উপযুক্ত পরিবেশ। তাঁর মাতামহী নবশশী দেবী ছিলেন স্বদেশি আন্দোলনের কর্মী। বস্তুত তাঁর প্রেরণায়ই আশালতা দাশগুপ্ত অতি অল্প বয়সে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হন।

মাতামহী নবশশী দেবী আশালতা দাশগুপ্তর চেতনায় স্বাজাত্যবোধ ও সংগ্রামী চেতনার যে অগ্নিশিখা প্রজ্বালিত করে দিয়েছিলেন, তা ক্রমে বিকশিত হয়ে মধ্যাহ্ন সূর্যের তেজে পরিণত হয়। সংসারধর্মে প্রবেশ এবং ১৯১৬ সালে স্বামী সত্যরঞ্জন সেনের অকালমৃত্যুতে সেই তেজ কিছুটা স্তিমিত হয়ে পড়লেও পরে তা আবার দীপ্তিমান হয়ে ওঠে। ১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন আশালতা সেন স্বরূপে উদ্ভাসিত হন, যুক্ত হন এই আন্দোলনের সঙ্গে। ১৯২২ সালে ঢাকা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে গয়া কংগ্রেসে যোগদান করেন এবং কংগ্রেসের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। ১৯২৫ সালে ‘নিখিল ভারত কাটুনী সংঘে’র সদস্য হন এবং খদ্দর প্রচারে নিয়োজিত হন। ১৯৩০ সালের ‘লবণ আইন’ অমান্য আন্দোলনে সামনের কাতারে থেকে নেতৃত্ব দেন। এই আন্দোলনের অন্যতম নেত্রী সরমা গুপ্তা ও উষাবালা গুহকে সঙ্গে নিয়ে নোয়াখালী থেকে নোনা পানি এনে ঢাকার করোনেশন পার্কে সবার সামনে লবণ তৈরি করে আইন অমান্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। শুধু তা-ই নয়, বাংলার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ‘লবণ আইন’ অমান্য আন্দোলন সংঘটনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন এবং কারারুদ্ধ হন। পরে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়। ১৯৩২ সালে মহাত্মা গান্ধীকে গ্রেপ্তার করা হলে অসহযোগ আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে। এ সময় ‘গেণ্ডারিয়া মহিলা সমিতি’কে বেআইনি ঘোষণা করা হয় এবং ‘কল্যাণ কুটির’ কর্মীদের বাসগৃহ তালাবদ্ধ করে দেয় পুলিশ। এই জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে আশালতা সেন আবারও গ্রেপ্তার হন। কয়েকটি মামলায় তিনি সাজাপ্রাপ্ত হন। ১৯৩৩ সালে কারাগার থেকে মুক্ত হলে তাঁকে ঢাকা জেলা কংগ্রেসের সহসভাপতি নিযুক্ত করা হয়। ১৯৪২ সালে মহাত্মা গান্ধী ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনের ডাক দিলে আশালতা সেন সেই আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে অংশ নেন। এ আন্দোলনের সময় ঢাকার তালতলায় পুলিশের গুলিতে এক যুবক নিহত হন। এর প্রতিবাদে মিছিলে নেতৃত্বদান করতে গিয়ে আশালতা সেন গ্রেপ্তার হন এবং সাড়ে সাত মাস সশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করেন। এভাবে আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্বদান ও অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে গিয়ে তিনি সরকারের রোষানলে পড়ে বারবার কারারুদ্ধ হন এবং জনগণের আস্থা অর্জন করেন। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরে তিনি অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ান। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বঙ্গীয় ব্যবস্থা পরিষদের সদস্য এবং ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৫ সালে তিনি দিল্লিতে পুত্রের কাছে চলে যান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম শুরু হলে আশালতা সেন নানাভাবে সহযোগিতা করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা দিতে বেশ কিছু গানও রচনা করেন।

বাংলার নারীসমাজের অগ্রগতি ও কল্যাণে আশালতা সেন নানাভাবে কাজ করেছেন। ঢাকার গেণ্ডারিয়ায় নারীদের প্রশিক্ষণের জন্য ‘শিল্পাশ্রম’ নামের একটি বয়নাগার প্রতিষ্ঠা করেন। নারীদের মধ্যে স্বদেশচেতনা ও দেশপ্রেম জাগ্রত করা এবং স্বাধীনতাসংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করতে ১৯২৪ সালে সরমা গুপ্তা ও সরযুবালা গুপ্তর সহযোগিতায় গড়ে তোলেন ‘গেণ্ডারিয়া মহিলা সমিতি’। মহিলা কর্মী সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ১৯২৭ সালে ঢাকায় গড়ে তোলেন ‘কল্যাণ কুটির আশ্রম’। শিক্ষা বিস্তারে তাঁর উল্লেখযোগ্য অবদান ১৯২৯ সালে ‘জুড়ান শিক্ষা মন্দির’ প্রতিষ্ঠা। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বিভিন্ন নারী সংগঠন। এই সংগঠনগুলো হলো জাগ্রত সেবিকা দল (১৯৩০), রাষ্ট্রীয় মহিলা সংঘ (১৯৩১), নারীকর্মী শিক্ষাকেন্দ্র (১৯৩১) ও কংগ্রেস মহিলা সংঘ (১৯৩৯)। এককথায় এ দেশের নারীমুক্তি আন্দোলনে তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন।

আশালতা সেনের বড় পরিচয় তিনি একজন সাহিত্যিক। সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের কল্যাণ চিন্তা করেছেন। অল্প বয়সেই তাঁর সাহিত্য প্রতিভার উন্মেষ ঘটে এবং ধীরে ধীরে তা পরিণতি লাভ করে। ১৯৮৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এই বিপ্লবী নারী ইহলীলা সাঙ্গ করেন।

যে যুগে বাংলার নারীসমাজ অসূর্যম্পশ্যা ছিল, তখন সমাজের বেড়াজাল ছিন্ন করে বাইরে এসেছিলেন আশালতা সেন। স্বীয় কর্ম ও যোগ্যতায় রাজনীতির শীর্ষভাগে আসীন হয়েছিলেন। অগ্নিযুগের দৃপ্ত পদাতিক হিসেবে এই নারী আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। বাংলার নারীসমাজকে জাগ্রত ও সংগ্রামী মন্ত্রে উজ্জীবিত করতে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, স্বদেশি আন্দোলন, লবণ আইন অমান্য আন্দোলন, ভারত ছাড়ো আন্দোলন এবং সর্বোপরি আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামে এই সংগ্রামী নারীর অবদান ইতিহাসের পাতায় উজ্জ্বল হয়ে থাকবে। বারবার কারা নির্যাতন, শাসকের রক্তচক্ষু—কোনো কিছুই তাঁকে দমাতে পারেনি। স্বজাতি, স্বসমাজ ও স্বদেশের কল্যাণে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন। অগ্নিকন্যা আশালতা সেন ইতিহাসে সত্যিই অমর। বাংলার নারীমুক্তি আন্দোলন, ব্রিটিশ শাসনের কবল থেকে জাতিকে মুক্ত করার আন্দোলনে এই তেজোদীপ্ত নারীর অবদান চিরকাল অম্লান হয়ে থাকবে।



মন্তব্য