kalerkantho


শুদ্ধাচারী বিপ্লবী কমরেড মুজফ্ফর আহমদ

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



শুদ্ধাচারী বিপ্লবী কমরেড মুজফ্ফর আহমদ

অঙ্কন : মানব

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম এই প্রতিষ্ঠাতা শুদ্ধাচারী বিপ্লবী ব্রিটিশ ও কংগ্রেস সরকারের আমলে প্রায় ২০ বছর জেল খেটেছেন। কিন্তু নিজের আদর্শকে সমুন্নত রাখতে কোনো আপস করেননি। বিরুদ্ধ অবস্থায় প্রকাশ্যে রাজনীতি করা যখন কঠিন ছিল, তখন আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির পথ বেছে নিতে হয়েছিল। এই দীক্ষা তিনি যথার্থভাবেই তাঁর অনুসারীদের দিতে পেরেছিলেন ।

 

শুদ্ধ রাজনীতির ধারায় সফল মানুষ ইতিহাসে খুব বেশি পাওয়া যায় না। বিশ শতকের গোড়ার দিকে এই শূন্যস্থান পূরণ করে ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একজন আদর্শ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির গঠন পর্বের নায়ক কমরেড মুজফ্ফর আহমদ।   মুজফ্ফর আহমদের শৈশব এবং বেড়ে ওঠার পর্বে ভারত ও বাংলার রাজনীতি তেমনভাবে অবয়ব পায়নি

 

শুদ্ধ রাজনীতির ধারায় সফল মানুষ ইতিহাসে খুব বেশি পাওয়া যায় না। বিশ শতকের গোড়ার দিকে এই শূন্যস্থান পূরণ করে ভবিষ্যৎ রাজনীতির জন্য একজন আদর্শ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির গঠন পর্বের নায়ক কমরেড মুজফ্ফর আহমদ। মুজফ্ফর আহমদের শৈশব ও বেড়ে ওঠার পর্বে ভারত ও বাংলার রাজনীতি তেমনভাবে অবয়ব পায়নি। এমন একটি সময়ে পূর্ববঙ্গের সন্দ্বীপের মতো এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া এবং কৈশোর পেরোনো তরুণের মধ্যে যে অভিনব রাজনৈতিক ভাবনা ছুঁয়ে গিয়েছিল তা সে সময়ের বিচারে আকর্ষণীয়ই বলা চলে। ১৯১৭ সালে রাশিয়ায় লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সাম্যবাদী ধারণার সঙ্গে মানুষ একটু একটু পরিচিত হতে শুরু করেছিল। রাশিয়া একটি সম্মিলিত ভৌগোলিক অবয়ব লাভ করে রূপান্তরিত হচ্ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নে। এই নব্য রাজনৈতিক গতিধারায় গড়ে ওঠা সোভিয়েত ইউনিয়নের উজবেকিস্তানের বর্তমান রাজধানী তাসখন্দে জন্ম হয়েছিল ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির। ভারতীয় বাঙালি মানবেন্দ্র রায় এর প্রতিষ্ঠা করেন ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর।

এই ঢেউ ভারতে আছড়ে পড়ার মুহূর্তেই ভারতে কমিউনিস্ট পার্টির আঁতুড়ঘরে লাল ঝাণ্ডা নিয়ে যাঁরা দৃঢ়তার সঙ্গে দাঁড়িয়েছিলেন মুজফ্ফর আহমদ ছিলেন তাঁদের অন্যতম। রাজনীতির ধারাক্রম বিবেচনায় এর মূল্যায়ন জরুরি। এই বিপ্লবীর জন্ম ও বেড়ে ওঠার সঙ্গে তাঁর শ্রেণি চরিত্র বুঝতে না পারলে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির এই পতাকাবাহী নেতাকে অনুভব করা যাবে না। এতে বিভ্রান্তিও তৈরি হতে পারে। যেমন—বাংলাপিডিয়ায় কমরেড মুজফ্ফর আহমদ সম্পর্কে লিখতে গিয়ে তাঁর বাবাকে আইনজীবী বলে ছেড়ে দিয়েছেন লেখক। এতে পাঠক এই বিপ্লবীকে মূল্যায়ন করতে বিভ্রান্ত হতে পারে। বিশ শতকের শুরুর দিকে একজন আইনজীবী অভিজাত শ্রেণিভুক্ত হবেন, এটি সাধারণ ধারণায় আসতে পারে। অনুমিত হতে পারে, এই বিপ্লবী বিত্তশালী পরিবারে বেড়ে উঠেছিলেন। বরং স্বয়ং মুজফ্ফর আহমদের লেখা ‘আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’ পড়লে ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে যাবে। তিনি নিজেকে অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারের সন্তান বলেছেন। বাবা মোক্তারি করতেন বটে, তবে ভূসম্পত্তি তেমন কিছু করতে পারেননি। অর্থাভাবে তাঁর পড়াশোনা চালানো কঠিন ছিল।

এই দারিদ্র্য তাঁর মধ্যে সাম্যবাদী চিন্তার জন্ম দিয়েছিল। ১৯১৩ সালে তিনি কলকাতাপ্রবাসী হয়েছিলেন। প্রথমে হুগলি কলেজ এবং পরে কলকাতার বঙ্গবাসী কলেজে আইএ ক্লাসে ভর্তি হন। তবে পাস করতে না পেরে পড়া ছেড়ে দেন। এ সময় থেকেই শুরু হয় তাঁর সংগ্রামী জীবন। কমরেড মুজফ্ফর আহমদের লেখা থেকেই বোঝা যায়, বঙ্গভঙ্গ এবং এর প্রতিক্রিয়ায় হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে যে রাজনৈতিক আলোড়ন তৈরি হয় তা বিশেষভাবে আলোড়িত করেছিল তাঁকে। 

১৮৮৫ সালে সর্বভারতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হলে ভারতের এই প্রথম রাজনৈতিক সংগঠনকে অসাম্প্রদায়িকই ভাবা হয়েছিল। হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায় ছিল কংগ্রেসের নেতৃত্বে। বঙ্গভঙ্গ ইস্যু প্রথমবারের মতো হিন্দু ও মুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। যেহেতু অনুন্নত পূর্ব বাংলা বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হলে উন্নতির ছোঁয়া পাবে—এই আশা করেছিলেন পূর্ব বাংলার নেতারা, সেহেতু বঙ্গভঙ্গের সমর্থক হন তাঁরা। পূর্ব বাংলার বেশির ভাগ মানুষ মুসলমান। তাই অনেকটা চিহ্নিত হয়ে গেল যে বঙ্গভঙ্গের সমর্থকগোষ্ঠী মুসলমান সম্প্রদায়। কিন্তু কলকাতাকেন্দ্রিক শিক্ষিত হিন্দু গোষ্ঠী একে দেখল ভারতীয়দের বিভক্ত করার ষড়যন্ত্র হিসেবে। এমন পরিস্থিতিতে বাংলার হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায় তাকিয়ে ছিল কংগ্রেসের দিকে। এই অসাম্প্রদায়িক সংগঠন নিশ্চয় বঙ্গভঙ্গ ইস্যুতে উভয় সম্প্রদায়ের সঙ্গে আলোচনা করে প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করবে। কিন্তু মুসলমান নেতারা বিস্মিত হয়ে দেখলেন, কোনো রকম পূর্বালোচনা ছাড়াই কংগ্রেস বঙ্গভঙ্গবিরোধীদের সঙ্গে সহমত প্রকাশ করেছে। বাংলা তথা ভারতীয় রাজনীতিতে এ অবস্থায় তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তরুণ মুজফ্ফর আহমদ কাছে থেকে এই আলোড়ন লক্ষ করেছেন। কিন্তু আগাগোড়া অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ হিসেবে তাঁকে এসব আলোড়নে সক্রিয় হতে দেখা যায়নি। পূর্ববঙ্গের মুসলিম নেতৃত্বের পুরোভাগে তখন ঢাকার নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ। কংগ্রেসের আচরণে মুসলমান নেতারা অসহায় বোধ করলেন। কংগ্রেসকে আর অসাম্প্রদায়িক সংগঠন ভাবতে পারলেন না। তাই মুসলমান সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে কথা বলার জন্য স্বতন্ত্র রাজনৈতিক দল গড়ার কথা ভাবতে হলো। এভাবেই বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার পরের বছরই, অর্থাৎ ১৯০৬ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত হলো মুসলিম লীগ।

কিন্তু এসব সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন রাজনীতি কোনো আলোড়ন তুলতে পারেনি মুজফ্ফর আহমদের মনে। বরং বঙ্গভঙ্গের প্রতিক্রিয়ায় বঙ্গভঙ্গবিরোধী গোষ্ঠী যখন বয়কট, স্বদেশি ও গুপ্ত সংগঠন গড়ে সশস্ত্র সংগ্রাম করে, তা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল মুজফ্ফর আহমদের। আমাদের ধারণা, তাঁর বিপ্লবী মানস গড়ায় এই পরিবেশের প্রভাব থাকতে পারে। ১৯১১ সালে বিপ্লবীদের চাপে ব্রিটিশ সরকার বঙ্গভঙ্গ রদ ঘোষণা করলে আরেকবার আলোড়িত হয়েছিলেন মুজফ্ফর আহমদ। কারণ তাঁর লেখা থেকেই জানা যায়, স্বদেশি যুগের নেতা সাপ্তাহিক ‘হিতবাদী’ পত্রিকার সম্পাদক কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ তাঁকে কিছুটা প্রভাবিত করেছিলেন। মুজফ্ফর আহমদ তাঁর দারিদ্র্যের কথা বারবার উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, এ সময় তিনি যথাসাধ্য স্বদেশি দ্রব্য ব্যবহার করতেন।

ইংরেজবিরোধী বাংলার সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা তাঁকে কিছুটা প্রভাবিত করেছিল। এর একটি কারণ হতে পারে বাংলাই ছিল বিপ্লবীদের প্রধান চারণভূমি। তবে মুজফ্ফর আহমদ নিজেই স্পষ্ট করেছেন যে সন্ত্রাসবাদীদের মধ্যে তিনি একটি রোমাঞ্চ লক্ষ করেছেন, যা তাঁকে আকর্ষণ করলেও তাঁর পক্ষে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনে যোগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। সম্ভবত মুজফ্ফর আহমদের অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাঁর পথ নির্দিষ্ট করে দিয়েছিল। দেখা যায়, তিনি সরাসরি সাম্প্রদায়িকতা ছড়ানোর জন্য বঙ্কিমচন্দ্রকে দায়ী করেছেন। বলেছেন, বঙ্কিমের ‘আনন্দ মঠ’ থেকে সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবীরা প্রেরণা লাভ করত। প্রাসঙ্গিক মনোভাব মুজফ্ফর আহমদ স্পষ্ট করেছেন তাঁর গ্রন্থে। আমরা এখান থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করছি। বিপ্লবীদের প্রসঙ্গে তিনি লেখেন, “...এর মূলমন্ত্র ছিল বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দেমাতরম’ গান। তাতে আছে—

বাহুতে তুমি মা শক্তি

হৃদয়ে তুমি মা ভক্তি

তোমারই প্রতিমা গড়ি মন্দিরে মন্দিরে

ত্বংহি দুর্গা দশপ্রহরণ ধারিণী ইত্যাদি।

একেশ্বরবাদী কোনো মুসলিম ছেলে কী করে এই মন্ত্রোচ্চারণ করতে পারত? ওই কথাটা কোনো হিন্দু কংগ্রেস নেতাও কোনো দিন বুঝতে পারেননি। বাংলাদেশের সন্ত্রাসবাদী বিপ্লবী আন্দোলন নিঃসন্দেহে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ছিল। কিন্তু তা হিন্দু উত্থানের আন্দোলনও ছিল। উদ্দেশ্য ছিল হিন্দু রাজত্বের পুনঃপ্রতিষ্ঠা।” (‘আমার জীবন ও ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি’)

মুজফ্ফর আহমদ আবেগ নয়, যুক্তি দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তাই ব্রিটিশবিরোধী চেতনা থাকায় তিনি খেলাফত আন্দোলনকে সমর্থন করেছিলেন। ১৯১৬ সাল থেকে তিনি রাজনৈতিক সভা-সমিতিতে যোগ দিতে থাকেন। এভাবে তৈরি হতে থাকে তাঁর মানসভুবনে রাজনৈতিক ভিত্তি।

১৯১৭ সালে রাশিয়ায় সংঘটিত বলশেভিক বিপ্লব আর মজুরশ্রেণির আনুকূল্য তৈরির জন্য প্রতিষ্ঠিত কমিউনিস্ট আন্দোলন মুজফ্ফর আহমদকে আকর্ষণ করে। রাশিয়ার এই বিপ্লবের খবর যাতে ভারতে আসতে না পারে, তার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল ব্রিটিশ সরকার। কিন্তু একে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে, বিশেষ করে ১৯১৯-২০ সালের মধ্যে ভারতীয় মজুর শ্রমিক শ্রেণি রুশ বিপ্লব সম্পর্কে জানতে পারে। নতুন আশার আলো দেখতে পায় তারা। এই শ্রমজীবী শ্রেণির সংগ্রামের মধ্য দিয়েই ১৯২০ সালে নিখিল ভারত ট্রেড ইউনিয়ন কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত হয়।

মুজফ্ফর আহমদ ১৯১১ সালে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সভ্য হয়েছিলেন। এই সংগঠনের ত্রৈমাসিক মুখপত্র ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা’র সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন। নামে ‘মুসলমান’ থাকলেও এই সংগঠন ও পত্রিকা সাম্প্রদায়িক মনোভাব প্রকাশ করেনি।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম এই প্রতিষ্ঠাতা শুদ্ধাচারী বিপ্লবী ব্রিটিশ ও কংগ্রেস সরকারের আমলে প্রায় ২০ বছর জেল খেটেছেন। কিন্তু নিজের আদর্শকে সমুন্নত রাখতে কোনো আপস করেননি। বিরুদ্ধ অবস্থায় প্রকাশ্যে রাজনীতি করা যখন কঠিন ছিল, তখন আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনীতির পথ বেছে নিতে হয়েছিল। এই দীক্ষা তিনি যথার্থভাবেই তাঁর অনুসারীদের দিতে পেরেছিলেন।

কমরেড মুজফ্ফর আহমদ তাঁর সাংগঠনিক সাফল্য দেখাতে পেরেছিলেন। ১৯৩৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে অবিভক্ত বাংলার ২৮টি জেলায়ই কমিউনিস্ট পার্টির শাখা ছড়িয়ে পড়ে। আজীবন পার্টির নেতৃত্ব দেওয়া এই সফল রাজনীতিক ১৯৭৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।



মন্তব্য