kalerkantho

নিখিল ভারত মুসলিম লীগ

ঢাকায় জন্ম, ঢাকায় মৃত্যু

১০ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ঢাকায় জন্ম, ঢাকায় মৃত্যু

১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকার শাহবাগে মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাতা সদস্যরা

জিন্নাহ ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন অত্যন্ত কর্তৃত্বপরায়ণ এবং প্রশ্নাতীত আনুগত্য পছন্দ করতেন। কিন্তু বাংলার জনপ্রিয় মুসলিম লীগ নেতাদের তিনি আস্থায় নিতে পারেননি। কারণ তাঁদের আনুগত্যের বিষয়ে জিন্নাহ নিশ্চিত হতে পারেননি; যদিও ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন এবং ১৯৪৬ সালে লাহোর প্রস্তাব সংশোধনে যথাক্রমে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দীকে তিনি প্রয়োজনমতো ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ১৯৪৫-৪৭ সময় পর্বে মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে বাংলা থেকে সদস্য করেছিলেন তাঁর অনুগত মওলানা আকরম খাঁ, খাজা নাজিমুদ্দীন ও এম এ এইচ ইস্পাহানীকে। জিন্নাহ পাকিস্তানের জন্মলগ্নে বাঙালিবিরোধী যে নীতি গ্রহণ করেছিলেন, জেনারেল ইয়াহিয়া পর্যন্ত একই নীতি অব্যাহত ছিল

 

►        ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ মুসলিম লীগ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন

 

►        মুসলিম লীগের সর্বোচ্চ সাফল্য হলো পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় পূর্ববঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের ভূমিকা অনস্বীকার্য

 

পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করেই রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপে রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠার ইতিহাস স্বতন্ত্র। বিশেষভাবে ঔপনিবেশিক আমলে রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শাসকবর্গের আনুকূল্য নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীন রাজনৈতিক দল, যেমন—ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ও নিখিল ভারত মুসলিম লীগ, উভয় দলের প্রতিষ্ঠালগ্নে ইংরেজ শাসকবর্গের পৃষ্ঠপোষকতা ছিল। উভয় দলের নেতৃত্বের শ্রেণিচরিত্র এবং দলের কর্মসূচির মধ্যেও সাযুজ্য কম ছিল না।

আজকের আলোচনা নিখিল ভারত মুসলিম লীগ নিয়ে হলেও প্রসঙ্গক্রমে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কথাও চলে আসবে। ১৯০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঢাকায় নিখিল ভারত মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রথম সভাস্থল হিসেবে ঢাকা শহর নির্বাচনে দুটি দিক কাজ করেছে। ঢাকা ছিল নবগঠিত প্রদেশের রাজধানী এবং এই প্রদেশে মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। বঙ্গভঙ্গের (১৯০৫) জোরালো সমর্থক ঢাকার নবাব স্যার খাজা সলিমুল্লাহ মুসলিম লীগ গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর দুশ্চিন্তার কারণ ছিল বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দু সম্প্রদায়ের অব্যাহত আন্দোলন। ঢাকায় সম্মেলন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানদের সমর্থন পাওয়া সহজ হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল আয়োজকদের। এ ক্ষেত্রে নবাব ভিকার-উল-মুলক (ইউপি), মাজহার-উল-হক ও মওলানা মুহম্মদ আলী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মুসলিম লীগ তিনটি লক্ষ্য নির্ধারণ করে—প্রথমত, ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য আরো জোরদার করা; দ্বিতীয়ত, ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক স্বার্থের প্রতি খেয়াল রাখা; তৃতীয়ত, ভারতীয় মুসলমানদের সঙ্গে অন্য সম্প্রদায়ের সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা। এককথায় বলা যায়, শুধু মুসলমান স্বার্থ দেখার জন্যই মুসলিম লীগের জন্ম। মুসলিম লীগের আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশের তিন মাস আগে উচ্চপর্যায়ের মুসলিম প্রতিনিধিদল সিমলায় ভাইসরয় লর্ড মিন্টোর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। অনেকটা আগ্রহভরে লর্ড মিন্টো মুসলমানদের পৃথক নির্বাচনের দাবি মেনে নিলেন। কার্যত হিন্দু-মুসলিম বিরোধের সুযোগ নিয়ে ইংরেজ সরকার পৃথক নির্বাচনব্যবস্থার মাধ্যমে দুই সম্প্রদায়ের ঐক্যের পথে স্থায়ী অন্তরায় সৃষ্টি করে। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘মুসলমান ও হিন্দুর মাঝখানে একটা ভেদ রহিয়া গিয়াছে। কিন্তু যে ভেদটা আছে রাজা (ইংরেজ সরকার) যদি চেষ্টা করিয়া সেই ভেদটাকে বড়ো করিতে চান এবং দুই পক্ষকে যথাসম্ভব স্বতন্ত্র করিয়া তোলেন তবে হিন্দু-মুসলমানদের দূরত্ব এবং পরস্পরের মধ্যে ঈর্ষা বিদ্বেষের তীব্রতা বাড়িয়া চলিবে তাহাতে সন্দেহ নাই।’ কংগ্রেস কাগজে-কলমে মুসলিম লীগের মতো সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠান ছিল না; বরং ধর্মনিরপেক্ষ বলেই পরিচিত ছিল। কিন্তু মুসলমানদের আস্থা অর্জন করার কার্যকর কোনো কর্মসূচি ছিল না। কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনগুলোতে মুসলিম প্রতিনিধির সংখ্যা ক্রমে হ্রাস পেলেও তা কংগ্রেস নেতৃত্বের মনোযোগ আকর্ষণে ব্যর্থ হয়। ১৮৯২ থেকে ১৯০৯ সাল পর্যন্ত কংগ্রেসের অধিবেশনে মোট ১৩ হাজার ৮৩৯ জন অংশ নেন। এর মধ্যে মুসলিম প্রতিনিধি ছিলেন মাত্র ৯১২ জন। অব্যাহতভাবে মুসলিম প্রতিনিধির সংখ্যা হ্রাস পাওয়ার মধ্য দিয়ে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কংগ্রেস হিন্দুদের দলে পরিণত হয়। এর জন্য শুধু কংগ্রেসকে দায়ী করা চলে না। মুসলমানদের তৎকালীন আর্থ-সামাজিক অবস্থা এবং মুসলিম নেতৃত্বও কম দায়ী ছিল না। উত্তর ভারতের স্যার সৈয়দ আহমদ খান, বাংলার নবাব আব্দুল লতিফ এবং সৈয়দ আমীর আলী—তাঁরা কংগ্রেসকে মুসলিম স্বার্থবিরোধী বলে বিশ্বাস করতেন এবং মুসলিম যুবকদের কংগ্রেসে যোগদান না করার জন্য উৎসাহিত করেন।

মুসলিম লীগের দরজাও সব মুসলমানের জন্য খোলা ছিল না। মুসলমান এলিটদের প্রতিষ্ঠান ছিল মুসলিম লীগ। বিত্তশালী জমিদার, জোতদার আর পেশাজীবীদের নিয়েই লীগ গড়ে ওঠে। লীগ প্রতিষ্ঠার ২১ বছর পর ১৯২৭ সালে মোট সদস্য ছিল মাত্র এক হাজার ৩৩০ জন। ১৯৩০ সালের এলাহাবাদ অধিবেশনে ৭৫ জন সদস্য উপস্থিত না হওয়ায় অধিবেশন কোরাম সংকটে পড়ে। পরের বছর দিল্লি অধিবেশনে কোরাম পূরণ করার জন্য সদস্যসংখ্যা ৭৫ থেকে হ্রাস করে ৫০ করা হয়। নতুন সদস্য সংগ্রহ করার জন্য বার্ষিক চাঁদা ছয় রুপি থেকে কমিয়ে এক রুপি এবং ভর্তি ফি পাঁচ রুপি বিলোপ করা হয়।

লীগ গড়ে উঠেছিল একটি জনবিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠান হিসেবে। এর কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা কিংবা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ-নিপীড়নের বিষয় স্থান পায়নি। বরং তুরস্কের খলিফার সম্মান রক্ষার জন্য লীগের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অন্ত ছিল না। মুসলিম লীগ খিলাফত আন্দোলন শুরু করে। মহাত্মা গান্ধী খিলাফত আন্দোলন সমর্থন করেন, অন্যদিকে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে মুসলমানরা অংশ নেয়। নানা কারণে এই সম্প্রীতি স্থায়ী হয়নি। বিশেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে কামাল আতাতুর্ক খলিফা পদ অবলুপ্ত করেন। এর মধ্য দিয়ে লীগের খেলাফত আন্দোলনের অন্তঃসারশূন্যতা প্রমাণিত হয়। ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে লীগের জনবিচ্ছিন্নতা আরো নগ্নভাবে প্রকাশ পায়। এই নির্বাচনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ চারটি প্রদেশ—বাংলা, পাঞ্জাব, সিন্ধু ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের মধ্যে বাংলায় ১১৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ৩৫টি এবং পাঞ্জাবে ৮৪টির মধ্যে দুটি আসন লাভ করে। এই নির্বাচনে মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত ৪৮২টির মধ্যে লীগ মাত্র ১০৯টি আসন লাভ করে, যা মোট মুসলিম ভোটের মাত্র ৪.৮ শতাংশ। এ রকম শোচনীয় ফলাফলের পর ভারতীয় মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বের দাবিদার লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ভীষণ শঙ্কার মধ্যে পড়ে যায়।

১৯৩৭ সাল থেকেই ভারতীয় রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পায়। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ইংরেজ সরকার কংগ্রেসের বিপরীতে মুসলিম লীগকে ব্যবহার করে। লীগ ইংরেজ সরকারের আস্থাভাজন হয়ে ওঠে। প্রাদেশিক রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তা হ্রাসের ফলে জাতীয় রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ দেখা দেয়। সাম্প্রদায়িক নানা ইস্যু পুঁজি করে এমনই নানা ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে জিন্নাহর নেতৃত্বে মুসলিম লীগের গণভিত্তি ক্রমে শক্তি সঞ্চয় করে।

১৯৪০ সালে বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন লীগের রাজনীতিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। ১৯৪০ থেকে ১৯৪৭ সময়কালে ভারতীয় মুসলমানদের একটা বড় অংশ মুসলিম লীগের পতাকাতলে সমবেত হয়। মধ্যবিত্ত মুসলমানদের সদস্য করার জন্য জিন্নাহ প্রাথমিক সদস্য পদের বার্ষিক চাঁদার হার করেন মাত্র দুই আনা। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের জনপ্রিয়তার প্রতিফলন ঘটে। এই নির্বাচনে ৪৮২টি মুসলিম আসনের মধ্যে লীগ ৪২৩টিতে জয়ী হয়। মোট মুসলিম ভোটের শতকরা ৭৪.২ ভাগ ভোট পায় লীগ। নির্বাচনে কংগ্রেসের অর্জনও ছিল বেশ তাৎপর্যময়। এক হাজার ৯০টি সাধারণ আসনের মধ্যে কংগ্রেস ৯২৯টি লাভ করে। সাধারণ আসনের মোট ভোটের শতকরা ৮০.৮ ভাগ কংগ্রেস পেয়েছে। বাংলায় লীগের জয় ছিল নিরঙ্কুশ, বাংলার মুসলিম লীগ সরকার পাকিস্তান আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে জয়ের জন্য লীগ সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়। রাজনৈতিক নেতা, পেশাজীবীর পাশাপাশি মাওলানা, পীর, উলামা, মাশায়েখগণ লীগের নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাপকভাবে অংশ নেন। জিন্নাহ নিজে অনুরোধ করেছেন উলামাদের প্রচারণায় অংশ নেওয়ার জন্য। বিখ্যাত পীর ও মাশায়েখদের নিয়ে ১৯৪৬ সালে মাশায়েখ কমিটি গঠন করা হয়। সাধারণ মানুষের ধর্মীয় আবেগকে পীর ও ধর্মীয় নেতারা মুসলিম লীগের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করেন। উলামাগণ মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য লীগের পক্ষে ভোট চান। পীরদের কাছে লীগের বিরুদ্ধপক্ষ হলো ইসলামের শত্রু। একজন মুসলমানের পক্ষে লীগের বিরুদ্ধপক্ষকে ভোট দেওয়া হবে জাতীয় (মুসলিম) স্বার্থবিরোধী এবং শেষ বিচারের দিন এর জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। সিলেট গণভোটের সময় উলামাগণ বলেন, মুসলমান ভোটাররা যদি আসামের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার জন্য ভোট দেয় তাহলে ‘নাস্তিক’ হয়ে যাবে। সিন্ধু, পাঞ্জাব ও ফ্রন্টিয়ার প্রাদেশিক নির্বাচনে পীর-উলামাদের ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার লীগের পক্ষে বেশ কাজে দেয়। কিন্তু বাংলায় পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। মুসলমান গ্রামীণ কৃষক জনগোষ্ঠীর ভোটে মুসলিম লীগ জয়লাভ করে। বাঙালির কাছে মুসলমানদের পৃথক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেয়ে অর্থনৈতিক স্বার্থ তথা জমিদারি বিলোপের দাবি অধিক কার্যকর ছিল।

যেকোনো মানদণ্ডেই বলা যায়, রাজনৈতিক দল হিসেবে মুসলিম লীগের সর্বোচ্চ সাফল্য হলো পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা। পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় পূর্ব বঙ্গের বাঙালি মুসলমানদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। শুরু থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকবর্গ বাঙালির প্রতি বিদ্বেষমূলক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করে। বাঙালিদের অধিকারবঞ্চিত করার পাশাপাশি জাতিগতভাবে হেয়, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে শুরু করে। অধিকার ও মর্যাদার প্রশ্নে পূর্ব বঙ্গের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের বোঝাপড়া ছিল অনিবার্য। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জনক মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ থেকে শুরু করে জেনারেল ইয়াহিয়া খান পর্যন্ত দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া সবাই বাঙালি সম্পর্কে অপমান, অবজ্ঞাপূর্ণ মনোভাব পোষণ করতেন। পাকিস্তানের জন্মের পর পূর্ব বাংলায় আসতে জিন্নাহর সাত মাস সময় লেগেছে। এসেই তিনি বাঙালির ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতিকে কোনো রকম পাত্তা না দিয়ে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা করলেন। কারণ তিনি পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল, ক্ষমতার দম্ভে বাঙালির আবেগ বিবেচনায় নেওয়ার তাগিদ অনুভব করেননি। জিন্নাহ ব্যক্তিগতভাবে ছিলেন অত্যন্ত কর্তৃত্বপরায়ণ এবং প্রশ্নাতীত আনুগত্য পছন্দ করতেন। কিন্তু বাংলার জনপ্রিয় মুসলিম লীগ নেতাদের তিনি আস্থায় নিতে পারেননি। কারণ তাঁদের আনুগত্যের বিষয়ে জিন্নাহ নিশ্চিত হতে পারেননি; যদিও ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন এবং ১৯৪৬ সালে লাহোর প্রস্তাব সংশোধনে যথাক্রমে ফজলুল হক ও সোহরাওয়ার্দীকে তিনি প্রয়োজনমতো ব্যবহার করেছেন। কিন্তু ১৯৪৫-৪৭ সময় পর্বে মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটিতে বাংলা থেকে সদস্য করেছিলেন তাঁর অনুগত মওলানা আকরম খাঁ, খাজা নাজিমুদ্দীন ও এম এ এইচ ইস্পাহানীকে। জিন্নাহ পাকিস্তানের জন্মলগ্নে বাঙালিবিরোধী যে নীতি গ্রহণ করেছিলেন, জেনারেল ইয়াহিয়া পর্যন্ত একই নীতি অব্যাহত ছিল।

অল্পকালের মধ্যেই মুসলিম লীগ পূর্ব বঙ্গে একটি জনবিচ্ছিন্ন ও অগণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। ১৯৪৯ সালে টাঙ্গাইল উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের প্রভাবশালী নেতা করটিয়ার বিখ্যাত জমিদার পরিবারের সন্তান খুররম খান পন্নী কিছুটা অপরিচিত যুবকর্মী শামসুল হকের কাছে পরাজিত হন। এই পরাজয়ের পর মুসলিম লীগ আরো অধিক মাত্রায় রক্ষণশীল, স্বার্থবাদী ও অগণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। ১৯৪৮ সালে আকরম খাঁকে সভাপতি এবং ইউসুফ আলী চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক করে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের ২৭ সদস্যের ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করা হয়। পরে নিজেরাই স্বার্থের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন। আর মুসলিম লীগের প্রতিবাদী, নিবেদিতপ্রাণ কর্মী, নেতারা মিলে নতুন রাজনৈতিক সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠিত হয়। পরে দুটি সংগঠনই দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দেয়।

পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানে রাজনৈতিক দল হিসেবে মুসলিম লীগ ক্রমে জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। আওয়ামী মুসলিম লীগের অন্যতম যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনে বলেন, ‘পূর্ব বাংলার জনগণের মুসলিম লীগের ওপর আর কোনো আস্থা নেই এবং তারা পূর্ব বাংলা থেকে মুসলিম লীগকে উচ্ছেদ করতে ঐক্যবদ্ধ।’ ১৯৫৪ সালের পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে আওয়ামী মুসলিম লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজাম-এ-ইসলাম এবং গণতন্ত্রী দল মিলে যুক্তফ্রন্ট গঠন করে। নির্বাচনী প্রচারণায় মুসলিম লীগ গতানুগতিক ‘ইসলামী কার্ড’ ব্যবহার করে; বিপরীতে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি খুব সহজে ছাত্র, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, শ্রমিক, কৃষক—সবার মাঝে ব্যাপক সাড়া জাগায়। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, ৩০৯টি আসনের মধ্যে মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসন লাভ করে। যুক্তফ্রন্ট লাভ করে ২২৩টি আসন, এর মধ্যে একক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ছিল ১৩০ জন সদস্য। পূর্ব বাংলায় মাত্র ৯ জন সদস্য নিয়ে কোনো রকমে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখে মুসলিম লীগ।

পশ্চিম পাকিস্তানেও মুসলিম লীগের অবস্থা খুব একটা আশাব্যঞ্জক ছিল না। নানা রকম স্বার্থের দ্বন্দ্বে মুসলিম লীগ বিভক্ত হয়ে পড়ে। জেনারেল আইয়ুব খান ১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে করাচিতে তাঁর সমর্থকদের নিয়ে গঠন করলেন পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কনভেনশন)। আইয়ুববিরোধী পুরনো মুসলিম লীগ অনুসারীরা ১৯৬২ সালের অক্টোবরে ঢাকায় কাউন্সিল সভা আহ্বান করে। তারা খাজা নাজিমুদ্দীনকে সভাপতি করে পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাউন্সিল) গঠন করে। আইয়ুব খানের পতনের পর তাঁর দল ভাঙনের মুখে পড়ে। ১৯৬৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নুরুল আমিনের নেতৃত্বে মুসলিম লীগের কিছু নেতাকর্মী মিলে নতুন রাজনৈতিক দল পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি গঠন করে। এভাবে মুসলিম লীগ ভাঙতে ভাঙতে ক্রমে দুর্বল হতে থাকে।

দ্বিজাতি তত্ত্বের সাম্প্রদায়িক ধারণার ওপর ভিত্তি করে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করে। পাকিস্তান রাষ্ট্র বাঙালি জাতির আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। ধর্ম, ভাষা, সংস্কৃতি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে জাতিগত পরিচয় ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সংঘাতময় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়। বাঙালি তার শিকড়ের সন্ধানে বেশি সময় নেয়নি। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলনের তীব্র ঝাঁকুনিতে বাঙালি সংবিৎ ফিরে পায়। পূর্ব পাকিস্তান সাহিত্য সম্মেলনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ১৯৪৮ সালের ৩১ ডিসেম্বর বলেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি। এটি কোন আদর্শের কথা নয়। এটি একটি বাস্তব কথা।’ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর এই চেতনা প্রতিফলিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের পোস্টারে। যে বাঙালি মুসলমান ১৯৪৭ সালে স্লোগান দিয়েছে ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’, তারাই ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানে স্লোগান দিল, ‘জাগো, জাগো,/বাঙালি জাগো’, ‘তোমার আমার ঠিকানা/পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘জয় বাংলা’। ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তান’ স্লোগানে প্রধানত হিন্দুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হুংকার ছিল। কিন্তু ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান বা মুক্তিযুদ্ধের স্লোগান ছিল বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনা শাণিত করার পাশাপাশি সৌহার্দ্য-সম্প্রীতি আরো দৃঢ় করার প্রত্যয়। গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও জাতীয়তাবাদ—এই চার রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ধারণ করে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় শুধু পাকিস্তানের সামরিক পরাজয় ছিল না; একই সঙ্গে মুসলিম লীগের রাজনৈতিক আদর্শের পরাজয় ঘটে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের জয়ের মধ্য দিয়ে মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সমাধি রচিত হয়। ১৯০৬ সালে ঢাকায় মুসলিম লীগ নামে যে পরগাছার জন্ম হয়েছিল, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এই বাংলায় ৩০ লাখ শহীদের আত্মাহুতির মধ্য দিয়ে মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অবসান হয়।



মন্তব্য