kalerkantho


অভিভাবকরা উদ্বিগ্ন, প্রাক প্রাইমারি শেষে কোথায় যাবে এখানকার শিক্ষার্থীরা?

সীতাকুণ্ডের সেই ত্রিপুরাপাড়ায় অনিশ্চয়তার স্কুল!

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



সীতাকুণ্ডের সেই ত্রিপুরাপাড়ায় অনিশ্চয়তার স্কুল!

সীতাকুণ্ডের সোনাইছড়ির দুর্গম পাহাড়ের আলোচিত সেই ত্রিপুরাপাড়ায় অবশেষে সরকারি উদ্যোগে স্কুল স্থাপিত হয়েছে। এতে ওই এলাকার মানুষ ভীষণ খুশি। কিন্তু এ বিদ্যালয়ে একেবারেই সীমিত শিক্ষা দান করা হবে। শিশু শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার সুযোগ পাবে শিক্ষার্থীরা। তাও মাত্র দুই বছরের একটি সরকারি প্রজেক্টের আওতায় এটি চালু করা হয়েছে। ফলে অক্ষর-জ্ঞান সম্পন্ন হওয়ার পর এই শিশু শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যত কি হবে, তা কোথায় পড়তে যাবে তা ভেবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার সোনাইছড়ি ইউনিয়নের পূর্বদিকের দুর্গম পাহাড়ে দুটি ত্রিপুরা পাড়া আছে। এই দুই পাড়ায় ৬৫টি ত্রিপুরা আদিবাসী পরিবারের বসবাস। অর্ধ শতাব্দীরও বেশি সময়ে ধরে তাঁরা অন্যের মালিকানাধীন পাহাড়ে বংশানুক্রমে বাস করে আসছে। কিন্তু মাত্র এক বছর আগেও এই পাহাড় মানুষগুলোর খোঁজ রাখতেন না কেউ। তাঁরা ছিলেন সব দিক থেকেই অবহেলিত। এ এলাকায় ছিল না কোনো স্কুল, ছিল না স্বাস্থ্যকেন্দ্র। এককথায় আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া ছিল না তাদের জীবনযাত্রায়। তাঁরা এতই অসচেতন ছিলেন যে, অসচেতনতার কারণে গত বছরের ১২ জুলাই এই পাড়ায় হামে আক্রান্ত হয়ে ৯ শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। আক্রান্ত হয় আরো শতাধিক শিশু। সংবাদমাধ্যমে এই সংবাদ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রকাশ হওয়ার পরই পাড়াটি সারাদেশে আলোচিত হয়ে ওঠে। এরপর টনক নড়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর। ওই সময় জানা যায় এখানে কোনো স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পানীয় জলের ব্যবস্থাসহ কোনো সুবিধাই! এ সময় জেলা প্রশাসন ও সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ তাঁদের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পানির জন্য কুয়া, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও স্কুল স্থাপনের আশ্বাস দেয়। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের মাধ্যমে দুটি কূপ খনন করা হয়। গড়ে তোলা হয় একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং সব শেষে চলতি বছরের জানুয়ারিতে চালু করা হয় এই ত্রিপুরা পাড়ার প্রথম বিদ্যালয়।

সরেজমিনে সোনাইছড়ি ত্রিপুরাপাড়ায় দেখা যায়, এখানে সমতল ভূমিতে তিন কক্ষের একটি স্কুল ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। ঘরটি সেমিপাকা। মেঝ পাকা করা হয়নি। তাতেই বসে পড়ালেখা করছে ত্রিপুরাপাড়ার শিশুরা। দেখা যায়, ৫ থেকে ১০ বছর বয়সী অনেক শিশুই পড়তে এসেছে এ স্কুলে।

জানা যায় আগে স্কুল না থাকায় ১০ বছর বয়সী শিশুগুলোরও অক্ষর-জ্ঞান নেই। এখন বিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ায় সবাই আগ্রহের সঙ্গে নাম স্বাক্ষরসহ পড়াশোনা শিখতে এসেছে। শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী রত্নাবালা ত্রিপুরা (৮) ও তার বোন স্বপ্নাবালা (৭) ত্রিপুরা স্কুলে পড়ার সুযোগ পেয়ে আনন্দের কথা জানিয়ে বলে, ‘স্কুলে আসলে অনেক ভালো লাগে। এখান থেকে নতুন বই দিয়েছে। আমরা প্রতিদিন স্কুলে আসব। স্কুলের মাস্টার অনেক ভালো। তিনি অনেক আদর করেন।’

একই অনুভূতি অন্য শিক্ষার্থীদেরও। এদিকে শিক্ষার্থীরা খুশি হলেও স্কুলটির ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন ত্রিপুরা পাড়ার সর্দারসহ অভিভাবকরা। সোনাইছড়ি ত্রিপুরা পাড়ার সর্দার কাঞ্চন ত্রিপুরা বলেন, ‘আমরা একসময় ঘোর অন্ধকারে ছিলাম। শিক্ষা-স্বাস্থ্য-বাসস্থান কিছুই ছিল না। আমরা ৯ সন্তান হারানোর পর জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জেনের আশ্বাসে প্রথমে একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পেয়েছি। এরপর কূপ খনন করা হয়েছে। কিন্তু সেই কূপে পানি থাকে না। ১ জানুয়ারি থেকে একটি স্কুল পেয়েছি। কিন্তু স্কুলটি শিশু শ্রেণি পর্যন্ত। এখানে অক্ষর-জ্ঞান শিক্ষার পর তারা আবারও ঝরে যাবে। প্রাথমিক বিদ্যালয়েও পড়ার সুযোগ পাবে না। আর বর্তমান শিশু শ্রেণিতেও শিক্ষার্থীর তুলনায় শিক্ষক কম। মাত্র একজন শিক্ষক স্কুল চালাচ্ছেন। তাও দুই বছরের চুক্তিতে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। দুই বছর পর কি হবে?’

তিনি আরো বলেন, ‘সরকার আমাদেরকে অনেক কিছু দিচ্ছে। কিন্তু কোনোটি দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। ফলে আমরা আশানুরূপ সুফল পাচ্ছি না।’

ওই স্কুলের একমাত্র শিক্ষক তুলতুল আক্তার বলেন, ‘আমি দুই বছরের চুক্তিতে এই স্কুলে নিয়োগ পেয়েছি গত নভেম্বরে। এরপর ত্রিপুরা পাড়ার ঘরে ঘরে গিয়ে শিশুদের পড়ানোর জন্য বুঝিয়েছি। ১ জানুয়ারি থেকে স্কুল চালু হয়েছে। ৬০ শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছে এখানে। তাদেরকে বিনা মূল্যে নতুন বই-খাতা দেওয়া হয়েছে। এসব শিক্ষার্থী এক কক্ষে বসার মতো জায়গা নেই। তাই দুই কক্ষে বসে। আমি একবার এক কক্ষে গিয়ে পড়াই। আরেকজন শিক্ষক নিয়োগ হলে আমার চাপ কমবে। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত স্কুল চলে।’

সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. নুরুচ্ছাফা বলেন, ‘ত্রিপুরাপাড়া স্কুলের জন্য এবার আমরা ৭২ সেট বই দিয়েছি। কিন্তু শিক্ষার্থী ৬০ জন। আরো ছাত্রছাত্রী ভর্তি হলেও তাদেরকে বইসহ অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হবে।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মিল্টন রায় বলেন, ‘ত্রিপুরাপাড়ার শিশুরা যেন লিখতে ও পড়তে পারে সে লক্ষ্যে সরকারি একটি প্রকল্পের আওতায় এই প্রাক-প্রাইমারি স্কুলটি স্থাপন করা হয়েছে। আপাতত দুই বছরের জন্য চুক্তিতে একজন শিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে। আরো একজন শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন আছে।’

আর দুই বছর পর স্কুলটির ভবিষ্যত কি হবে তা পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

 



মন্তব্য