kalerkantho


ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি

এত উদ্যোগ তবু শিক্ষার আলো পৌঁছেনি থানচির রেমাক্রি ইউনিয়নে

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



দুর্গম এলাকাগুলোতে শিক্ষা বিস্তারে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও বান্দরবানের থানচি উপজেলার রেমাক্রি এলাকায় শিক্ষার আলো পৌঁছায়নি।

একসময় থানচিকে দেশের সবচেয়ে দুর্গম এলাকা বলা হলেও এখন সড়কপথে মাত্র দুই ঘণ্টায় পৌঁছা যায় উপজেলা সদরে। আন্তঃইউনিয়ন সড়ক নেটওয়ার্ক ধীরে ধীরে উন্নত হওয়ায় কিছুটা কষ্টকর হলেও দিনে দিনে যাতায়াত করা যায় রেমাক্রিসহ প্রায় সবখানে। ইতোমধ্যে রেমাক্রি ইউনিয়নের রেমাক্রি বাজার ও বড় মদক বাজারে একটি করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং একটি উচ্চ বিদ্যালয় ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ৩০টি পাড়াকেন্দ্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের আলোঘর প্রকল্পের আওতায় ১১টি প্রাক প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র এবং ইউএনডিপির কয়েকটি স্কুল গত কয়েক বছর ধরে এই এলাকার শিক্ষা বিস্তারে কাজ করছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের হিসাবে বান্দরবান জেলায় স্কুলে গমনোপযোগী শিশুদের ভর্তির (এনরোলমেন্ট) হার শতকরা ৯৮ শতাংশ। থানচি উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (এটিইও) মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিনের তথ্য অনুযায়ী থানচি উপজেলায় এনরোলমেন্ট অর্জিত হয়েছে ৯৫ শতাংশ।

তাঁর দাবি অনুযায়ী স্কুলে অনুপস্থিতি ও ঝরে পড়া (ড্রপ আউট) অতি নগণ্য হলেও থানচি উপজেলার রেমাক্রি ইউনিয়নে শিক্ষার হার ৪ শতাংশ থেকে বাড়ানো যায়নি।

রেমাক্রি ইউনিয়নের এই আঁধারচিত্র সম্প্রতি জানতে পেরেছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী বীর বাহাদুর উশৈসিং এমপি। কালের কণ্ঠকে তিনি জানান, গত ডিসেম্বর মাসে নির্বাচনী প্রচারণায় গিয়ে তিনি জানতে পারেন, রেমাক্রি ইউনিয়নে শিক্ষার হার মাত্র ৪ শতাংশ।

তবে শতাংশের এই হার নিয়ে কথা বলা যায়নি উপজেলা শিক্ষা অফিসার মুনতাকিম রহমানের সঙ্গে। তাঁর মোবাইল ফোনে বারবার কল করার পরও তিনি তা ধরেননি। তবে ৪ শতাংশ শিক্ষার হারের বিষয়ে ভীষণ আপত্তি থানচি উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নিজাম উদ্দিনের। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমরা স্কুলের ছাত্র-শিক্ষক এবং তাদের ফলাফল তদারকি করি। কিন্তু শিক্ষার হার নির্ধারণের দায়িত্ব পালন করে পরিসংখ্যান বিভাগ। তারা কোথাও না গিয়ে আন্দাজের ওপর আজগুবী এসব তথ্য দিয়েছে।’

নিজাম উদ্দিন দাবি করেন, তিনি গত কয়েক বছরে রেমাক্রি বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়েছেন কমপক্ষে ৩০ বার। বড় মদক বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভিজিট করেছেন ১১ বার। কিন্তু প্রতিবারই তিনি বিপুলসংখ্যক ছাত্রকে ক্লাস করতে দেখেছেন।

থানচি এলাকায় ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের অর্থায়নে ‘আলোঘর’ নামে একটি প্রকল্পে কাজ করে ‘কারিতাস বাংলাদেশ।’ কারিতাস-এর চট্টগ্রাম অঞ্চলের প্রধান জেমস গোমেজ কালের কণ্ঠকে জানান, ২০১০ সাল থেকে এই প্রকল্পের আওতায় রেমাক্রি ইউনিয়নে ১১টি প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয় শিক্ষা বিস্তারে কাজ করেছে। ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রকল্প মেয়াদ শেষ হলে স্থানীয়দের সহায়তায় এখনও ৬টি ‘আলোঘর’ কেন্দ্র চালু রাখা সম্ভব হয়েছে। অন্য ৫টির ভবিষ্যত নিয়ে তিনি সন্দিহান।

কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এসব এলাকায় কাজ করার সবচেয়ে বড় বাধা শিক্ষক সংকট।’

তিনি জানান, প্রাক প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর জন্যে ৮ম শ্রেণি পাসের ঊর্ধ্বে কোনো শিক্ষক পাওয়া যায় না। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কাঙ্ক্ষিত ফলাফল পাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এনজিও স্কুল ছাড়াও শিশুদের স্কুলমুখী করার জন্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বিত সমাজ উন্নয়ন প্রকল্পের (আইসিডিপি) আওতায় রেমাক্রি ইউনিয়নে ২০টিরও বেশি প্রাক প্রাথমিক শিক্ষাকেন্দ্র (পাড়াকেন্দ্র) রয়েছে। গত বছর থেকে আইসিডিপির নাম বদলে প্রকল্পের নাম করা হয়েছে ‘টেকসহ সামাজিক সেবা প্রদান প্রকল্প।’ এর আগে ২০ বছরে মাসে মাসে বেতন ভাতা নিলেও দুর্গম এলাকার অজুহাতে মাসের পর মাস বন্ধ রেখে দেওয়া হয় পাড়াকেন্দ্রের কার্যক্রম। তবে বেতন-ভাতা বন্ধ থাকার কথা বলে  গত এক বছরেরও বেশি সময় ধরে পুরোপুরি বন্ধ আছে থানচি উপজেলার সব পাড়াকেন্দ্র।

থানচির একজন সাংবাদিক কালের কণ্ঠকে জানান, প্রকল্পের থানচি উপজেলা সমন্বয়ক প্রীতি কান্তি চাকমা থানচির সাংবাদিকদের পাড়াকেন্দ্র বন্ধ থাকা সম্পর্কে কোনো সংবাদ না করতে অনুরোধ জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, প্রীতি চাকমা তাঁদের বলেছেন, ‘লেখালেখি করলে প্রকল্প বাতিল হয়ে যাবে। তাতে শিক্ষকরা বেকার হয়ে পড়বেন।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, থানচিতে না থেকে প্রকল্প সমন্বয়ক বান্দরবান শহরের বালাঘাটা এলাকায় থাকেন। কিন্তু তাঁর মোবাইল নম্বরে বারবার চেষ্টা করেও এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য নেওয়া যায়নি।

 



মন্তব্য