kalerkantho


মুখ দিয়ে লিখেই পিইসি জয়

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

১৬ জানুয়ারি, ২০১৯ ০০:০০



মুখ দিয়ে লিখেই পিইসি জয়

যদি লক্ষ থাকে অটুট, বিশ্বাস হৃদয়ে, হবেই হবে দেখা, দেখা হবে বিজয়ে-এ কথাটি আবারও সত্যি প্রমাণ করল সীতাকুণ্ডে প্রতিবন্ধী কিশোর রফিকুল ইসলাম রাব্বি।

দুই হাত না থাকা সত্ত্বেও প্রবল মনোবলের অধিকারী রাব্বি মুখ দিয়ে লিখেই পিএসপি পরীক্ষায় ৪.৮৩ (এ গ্রেড) পেয়ে পাস করেছে। রাব্বি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী ইউনিয়নের পূর্ব হাসনাবাদ গ্রামের বাসিন্দা মো. বজলুর রহমানের ছেলে। সম্পূর্ণ সুস্থ হওয়া সত্ত্বেও যেখানে অনেক ছেলে স্কুলেই যেতে চায় না কিংবা পরীক্ষায় পাস করতে ব্যর্থ হয় সেখানে রাব্বি (১০) এক ব্যতিক্রমী কিশোর হিসেবে ইতোমধ্যে প্রমাণিত করেছে। যা উৎসাহিত করেছে তার অভিভাবক ও স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের।

উদ্যমী এই ছাত্র রাব্বির বাবা বজলুর রহমান ও মা রোজি আক্তার জানান, তাঁদের তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে রাব্বিই বড়। আর পাঁচজন ছাত্রের মতো রাব্বিও ছিলো একেবারে সুস্থ-স্বাভাবিক এবং মেধাবী একজন ছাত্র।

কিন্তু ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর তার জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। প্রতিদিনের মতো সেদিনও অন্য ছাত্রদের সাথে বিদ্যালয়ে আসছিলো রাব্বি। স্কুলের কাছেই ভাটিয়ারী বাজারে রয়েছে একটি ফুট

ওভারব্রিজ। হেঁটে ওই ব্রিজটি পার হওয়ার সময় বৈদ্যুতিক তারে জড়িয়ে ঘটে যায় চরম বিপত্তি। সেখানে ওয়েল্ডিংয়ের কাজ করা মিস্ত্রিরা সুইচ অফ না করে দুপুরে ভাত খেতে চলে যাওয়ায় এ ঘটনা ঘটে যায়।

বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর অন্য এক কলেজ ছাত্রসহ এলাকাবাসী তাকে উদ্ধার করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নিয়ে ভর্তি করালে ১ মাস ১৯ দিনের চিকিৎসায় প্রাণে বেঁচে যায় সে। কিন্তু চিরদিনের জন্য হারিয়ে ফেলে তাঁর দুই হাত।

বজলুর রহমান বলেন, ‘আমি ও আমার স্ত্রী দিনমজুরি করেই সংসার চালাই। সেই দুর্ঘটনায় সাড়ে ৯ লাখ টাকা খরচ হয়। বিভিন্ন জনের সহযোগিতায় সেটা আমরা করেছি। ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন আমাদের। হঠাৎ সে তার হাত দুটি হারিয়ে ফেলায় আমরা ভেঙে পড়েছিলাম। কিন্তু ছোট্ট হলেও সে

মনোবল হারায়নি। এ অবস্থাতেই পড়াশোনা করতে মরিয়া ছিল সে। তার এই আগ্রহের কারণে অনেকেই তাকে সাহস দেন। এর মধ্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বাহার উদ্দিন রায়হান অন্যতম।’

‘কোন আত্মীয়স্বজন না হয়েও তিনি এসে তাকে মুখ দিয়ে লেখার পদ্ধতি শেখান এবং এ বিষয়ে আগ্রহী করে তোলেন। মূলত তাঁর প্রচেষ্টাতেই নতুন করে পড়াশোনার স্বপ্ন দেখতে থাকে রাব্বি। যদিও ইতোমধ্যে তার দুটি বছর নষ্ট হয়ে যায়। তবু বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে গত ডিসেম্বরে পিএসসি পরীক্ষায় বসে রাব্বি। কিন্তু মানসিক জোর ও প্রবল আগ্রহ দেখে রাব্বি নিশ্চই পাস করবে এমন বিশ্বাস শিক্ষকদের ছিলই। সম্প্রতি ফলাফল প্রকাশিত হলে দেখা যায় রাব্বি সত্যিই পেরেছে। জিপিএ-৫ এর প্রায় কাছাকাছি নম্বর পেয়েছে। আর কয়েকটি নম্বর হলে জিপিএ ৫-ই পেয়ে যেত সে।’ যোগ করেন বজলুর।

এ ফলাফলে খুশি এবং আপসোস দুটোই আছে রাব্বির। ফলাফলের বিষয়ে রাব্বির মন্তব্য, ‘আর কিছু নম্বরের জন্য জিপিএ-৫ পাইনি। পেলে আরো ভালো লাগত। তবুও যা পেয়েছি তাতে খুশি। সামনে আরো ভালো ফলাফল করতে চাই। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন।’

জিপিএ-৫ না পেলেও ছেলের এমন ফলাফলে খুবই খুশি তার বাবা বজলুল রহমান।

তবে হাত দুটি না থাকায় তার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন তিনি। তিনি বলেন, ‘আমার ছেলের যদি দুই হাত থাকত তাহলে অবশ্যই জিপিএ-৫ পেত। সামান্য কয়েক নম্বরের জন্য পায়নি। তাতে কি? ও যে স্কুলে যাচ্ছে এবং এ অবস্থাতেও ভালো ফলাফল করে পড়াশোনা করছে এটিই বড় পাওনা। সবাই তাকে উৎসাহিত করলে নিশ্চই সে আরো ভাল করবে।’

ভাটিয়ারী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক গাজী হুমায়ুন কবির বলেন, ‘হাত দুটি থাকলে সে আরও ভালো করত। মুখ দিয়ে লিখেই সে এ গ্রেড পেয়েছে। সেটা অন্য শিক্ষার্থীদের কাছে কল্পনাও করা যাবে না। তার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘এর আগে প্রতিবন্ধী ছাত্র রাব্বির জীবন সংগ্রাম নিয়ে দৈনিক কালের কণ্ঠে সংবাদ প্রকাশ হওয়ায় স্থানীয় শিল্পপতি সিরাজউদ্দৌলা তার পড়াশোনার দায়িত্ব নিয়েছেন। তারাও চান সে অনেক দূর এগিয়ে যাক।’ সীতাকুণ্ড উপজেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ নুরুছাফা বলেন, ‘আমাদের ধারণার চেয়েও ভালো ফলাফল করেছে রাব্বি। দুই হাত হারিয়েও সে প্রবল ইচ্ছাশক্তি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।

দুর্ঘটনার পর আমরা ভেবেছিলাম সে আর পড়ালেখা করতে পারবে না। কিন্তু সে আমাদের ধারণা একেবারে পাল্টে দিয়েছে। ইচ্ছে থাকলে কাউকেই যে থামিয়ে রাখা যায় না তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রাব্বি।’



মন্তব্য