kalerkantho


হাটহাজারীতে ট্রাফিক পুলিশের ‘যাযাবর জীবন’

মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম)   

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



হাটহাজারীতে ট্রাফিক পুলিশের ‘যাযাবর জীবন’

হাটহাজারীতে ট্রাফিক পুলিশের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত না হওয়ায় তাঁদের নানা ভোগান্তি হচ্ছে। স্থায়ী বাসস্থান বরাদ্দ না থাকায় হরহামেশা তাঁদের বাসস্থান পাল্টানোর দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। তাঁদের কেউ কেউ এ অমানবিক ব্যবস্থাকে যাযাবর জীবনের সাথে তুলনা করেছেন। প্রায় ২০ বছর আগে থেকে ট্রাফিক পুলিশ হাটহাজারীতে কাজ শুরু করলেও একাধিকবার তাঁদের বাসস্থান পাল্টাতে বাধ্য করা হয়েছে। সাত মাস আগে পুরাতন কোর্টভবন থেকে স্থানান্তর করে জেলা পরিষদের পুরনো পরিত্যক্ত ডাকবাংলো ভবনে তাঁদের স্থান হয়। সর্বশেষ ২৯ অক্টোবর সেই পরিত্যক্ত ডাকবাংলো ভবন থেকেও কর্তৃপক্ষ তাঁদের বের করে দিলে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা হতাশ হয়ে পড়েন। তাঁদের ভাষ্য, আমরা কি সরকারি দায়িত্ব পালন করব নাকি বিশ্রামের জন্য বাসস্থানের চিন্তা করব?

এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা থানা কম্পাউন্ডে মালামাল নিয়ে মানবেতর অবস্থান করলেও সবাইকে বাসস্থান দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এদিকে ২৯ অক্টোবর দুপুর থেকে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা কর্তৃপক্ষের আকস্মিক নির্দেশে তাঁদের মালামাল নিয়ে বাসস্থান পরিবর্তনের কাজে ব্যস্ত থাকায় দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এতে হাটহাজারী সদরসহ চট্টগ্রাম-রাঙামাটি ও চট্টগ্রাম-খাগড়াছড়ি মহাসড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। দুর্ভোগ পোহায় হাজার হাজার মানুষ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় ২০ বছর পূর্বে হাটহাজারী উপজেলায় স্বল্পসংখ্যক জনবল নিয়ে ট্রাফিক পুলিশ কাজ শুরু করে। বর্তমানে হাটহাজারীতে একজন ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক, একজন সার্জেন্ট, একজন টিএসআই, তিনজন এটিএসআই এবং ১৭ জন ট্রাফিক কনস্টেবল মিলে মোট ২৩ জন ট্রাফিক পুলিশ কর্মরত রয়েছেন। দীর্ঘদিন উপজেলা সদরের কাচারি সড়কে পুরাতন কোর্ট ভবনে ট্রাফিক পুলিশের অস্থায়ী ব্যারাকে তাঁরা বসবাস করতেন। প্রায় সাত মাস পূর্বে পুরাতন কোর্ট ভবনে হাটহাজারী পৌরসভার কার্যালয় স্থানান্তর করতে ট্রাফিক পুলিশদের বের করে দেওয়া হয়। এরপর তাঁদের স্থান হয় হাটহাজারী মাদরাসার পশ্চিম পাশে জেলা পরিষদ ডাকবাংলোর একটি পুরাতন পরিত্যক্ত ভবনে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২৯ অক্টোবর জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ডাকবাংলোর ভাড়া বাবদ ১ লাখ একুশ হাজার টাকার একটি বিল ধরিয়ে দেওয়া হয়। অন্যথায় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের ডাকবাংলো ত্যাগ করতে মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়। পরিত্যক্ত ভবনের অযৌক্তিক এ বিলের সংবাদ পেয়ে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের পুরাতন ডাকবাংলো ভবন ত্যাগ করে হাটহাজারী মডেল থানা কম্পাউন্ডে অবস্থান নিতে নির্দেশ দেন জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের এ নির্দেশ পেয়ে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা ২৯ অক্টোবর দুপুর থেকে কাজ বন্ধ করে তাঁদের মালামাল গোছানোর কাজ শুরু করেন। বিকেল ৫টার দিকে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা রিকশাভ্যানযোগে মালামাল নিয়ে পুরাতন ডাকবাংলো ভবন ত্যাগ করে থানা কম্পাউন্ডে চলে যান।

হাটহাজারী মডেল থানা কম্পাউন্ডে গিয়ে দেখা যায়, বেশ কিছু মালামাল বাইরে রেখে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা থানা ভবনের দ্বিতীয় তলায় রাত কাটানোর জন্য সাময়িক অবস্থান নিয়েছেন। এ সময় নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ট্রাফিক পুলিশ সদস্য ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা সরকারি দায়িত্ব পালন করব নাকি ডিউটি শেষে ঘুমানোর স্থানের চিন্তা করব? তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, এভাবে যাযাবরের মতো মানবেতর জীবনযাপন করে কি দায়িত্ব পালন করা যায়?

এদিকে ২৯ অক্টোবর দুপুর থেকে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা কাজ বন্ধ করে দেওয়ায় হাটহাজারী বাসস্টেশনসহ পুরো উপজেলা সদর এবং দুই  মহাসড়কে প্রচণ্ড যানজট লেগে যায় ওই দিন। রাত অব্দি চট্টগ্রাম রাঙামাটি মহাসড়ক এবং চট্টগ্রাম হাটহাজারী মহাসড়কে যানজটের কারণে চরম ভোগান্তি পোহায় হাজার মানুষ।  

হাটহাজারীতে দায়িত্বরত ট্রাফিক পুলিশ পরিদর্শক শাহ মো. মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘স্থায়ী বাসস্থান বরাদ্দ না থাকায় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা যাযাবরের মতো মানবেতর জীবনযাপন করছেন।’ তিনি বলেন, ‘পরিত্যক্ত ডাকবাংলো ভবন থেকে জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের চলে যেতে বলায় পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা বর্তমানে হাটহাজারী মডেল থানা কম্পাউন্ডে অবস্থান নিয়েছেন।’

জানতে চাইলে হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মাসুম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেলা পরিষদের পরিত্যক্ত ভবনে আমাদের ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা বসবাস করে সরকারি দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরিত্যক্ত এ ভবন ব্যবহার বাবদ জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ অযৌক্তিক মোটা অংকের ভাড়া দাবি করার কারণে আমাদের ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের থানা কম্পাউন্ডে নিয়ে এসেছি।’



মন্তব্য