kalerkantho


রামগড়ে বিশুদ্ধ পানির সংকট

শ্যামল রুদ্র, রামগড় (খাগড়াছড়ি)   

৭ নভেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



রামগড়ে বিশুদ্ধ পানির সংকট

খাগড়াছড়ির রামগড় উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদে বিপুলসংখ্যক নলকূপ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সুপেয় পানির মারাত্মক সংকট দেখা দিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন, শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নামলে সমস্যা আরও প্রকট হবে।

রামগড় জনস্বাস্থ্য বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো.আবদুল মান্নান কালের কণ্ঠকে বলেন, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার পাশাপাশি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এ সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। একটু সচেতন হলে এতো নলকূপ নষ্ট হতো না। 

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল রামগড় অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে উপজেলার ২ হাজার ২৩ টি বিভিন্ন ধরনের নলকূপের মধ্যে ৬শ ৪৪টিই অকেজো। তাই মানুষ নিরুপায় হয়ে দূষিত পানিই ব্যবহার করছেন। উন্মুক্ত জলাশয় ও খালবিলের নোংরা পানিই এখন তাঁদের একমাত্র ভরসা। বিশুদ্ধ পানির অভাবে মানুষ খুব কষ্ট করছেন। পানিবাহিত নানা জটিল অসুখে আক্রান্ত হচ্ছেন অনেকেই।

রামগড় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবদুল মান্নান বিশুদ্ধ পানি প্রসঙ্গে বলেন, ‘ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় কিছু নলকূপ বসানো হয়েছে। পাশাপাশি নতুন নলকূপ স্থাপনের উদ্যোগও আছে। পিইডিপি (প্রাইমারি অ্যাডোকেশন ডেবেলপমেন্ট প্রোগ্রাম) প্রকল্পের আওতায় ২২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক হাজার লিটার পানির ট্যাঙ্ক বসিয়ে হেন্ডওয়াশ বেসিন স্থাপন করা হয়েছে। সম্প্রতি রামগড় ও পাতাছড়ার প্রত্যন্ত গ্রামে ৫১টি গভীর নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। বাজার প্রকল্পের আওতায় কালাডেবা, লামকু, খাগড়াবিল এবং নাকাপা বাজারে ডিপ টিউবওয়েল বসানো হয়েছে।’

রামগড় এক নম্বর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ আলম মজুমদার জানান, তাঁর ইউনিয়নে পর্যাপ্ত নলকূপ না থাকায় পানীয় জলের সঙ্কট রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকগুলো নষ্ট হয়ে গেছে।

পাতাছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিন্দ্র ত্রিপুরা জানান, প্রত্যন্ত পল্লীগুলোতে বসানো নলকূপের অনেকগুলো অকেজো। ঠিকাদার যেনতেন ভাবে নলকূপ স্থাপন করায় পানি ওঠে না। নিয়ম মেনে কাজ করে না আবার বললে শুনতেও চায় না।

এ প্রসঙ্গে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক ঠিকাদারেরা জানান, আন্তরিকতা সত্ত্বেও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্যে কাজ সঠিক হয় না। দুর্বৃত্তদের চাঁদা দিয়ে নলকূপ বসাতে হয়। এলাকায় এ সমস্যা এখন প্রকট।                   

পাতাছড়া ইউনিয়নের বুদ্ধধনপাড়া, মানিকচন্দ্রপাড়া, পরশুরামঘাট, পাইল্যাভাঙা, তবলাপাড়া, গুজাপাড়া, সালদাপাড়া, মরাকয়লা, কালাপানি, সোনারখিল, বালুখালী, বেলছড়ি, গোয়াইয়াপাড়া, পূর্বনতুন পাড়া, তেমরঙ, থলিবাড়ি, অশ্বিনী কারবারিপাড়া, দাতারাম পাড়া প্রভৃতি প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাসরত লোকজন বিশুদ্ধ পানির জন্য খুবই কষ্ট করছেন। এলাকায় ভালো নলকূপ নেই।

লাছাড়িপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অরবিন্দ দেবনাথ জানান, বেলছড়ি, নিউ তৈচাকমা, মানিক চন্দ্রপাড়া, বুদ্ধধন কারবারিপাড়া, লাছাড়িপাড়া, নূরপুর ও খেদাছড়াসহ কয়েকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নলকূপ নেই। পাহাড়ি গভীর খাদে জমে থাকা পানি তারা ব্যবহার করেন। শিক্ষার্থীরা সুপেয় পানির অভাবে নোংরা পানি ব্যবহার করে অসুখে ভুগছে।

সরেজমিন জানা যায়, প্রত্যন্ত গ্রামগুলোর দরিদ্র জনগোষ্ঠী দূষিত ও নোংরা পানি ব্যবহার করে পেটের পীড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। খুচরা যন্ত্রাংশের অভাবে ওই সব এলাকায় অনেক নলকূপ অকেজো হয়ে গেছে। পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের স্থাপন করা নলকূপ, পাতকূপ, তারাকূপ এবং গভীর নলকূপগুলোর মধ্যে বিপুলসংখ্যক নষ্ট।

উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু কারবারি বলেন, ‘বিশুদ্ধ পানির অভাবে পাহাড়ি কুয়া, ঝিরি-ঝরনা, খালবিল, উন্মুক্ত জলাশয়ের নোংরা পানি ব্যবহার করছেন পাহাড়ি জনগণ। এতে চর্মরোগ, ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত লোকজনের সংখ্যা বাড়ছে এলাকায়।’

পাহাড়ি গ্রাম বড়খেদা ও বেলতলী গিয়ে জানা যায়, ওই এলাকার বাসিন্দারা চরমভাবে পানীয় জলের কষ্ট করছেন। কথা হয় লালমোহন ত্রিপুরা, কালাচাঁদ ত্রিপুরা, নয়ন ত্রিপুরা, তরুণ ত্রিপুরা, ঝরনা ত্রিপুরা, সুমন মারমা, হলাঅং মারমা, পুতুল বড়ুয়াসহ কয়েকজন গ্রামবাসীর সঙ্গে। তাঁরা বলেন, একটি নলকূপও নেই এখানে। পাহাড়ি খাদের কুয়ার পানিই একমাত্র ভরসা। এই পানি ব্যবহার করে তাঁদের সন্তানসন্ততি ও এলাকার লোকজন সারা বছরই পেটের অসুখসহ নানা রোগে ভোগেন।

পাতাছড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মনিন্দ্র ত্রিপুরা নতুন করে নলকূপ বসানো এবং অকেজো কূপগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করার দাবি জানান।

এ দিকে, রামগড় পৌরসভার অফিস টিলা এলাকায় স্থাপিত গভীর পাম্পের সরবরাহ করা পানির রং লালচে ও ঘোলা। পৌরবাসীরা জানান, কেবলমাত্র থালাবাসন ধোয়া মোছার কাজে এ পানি ব্যবহার করা যায়। এই পানিতে গোসল করলে চুল আঠালো ও লাল হয়ে যায়। শরীরের বিভিন্ন অংশের চামড়ায় খসখসে শুষ্কভাব সৃষ্টি হয়।

জানতে চাইলে পৌর কাউন্সিলর মো. দেলোয়ার জানান, মাসিক বৈঠকে আলোচনা হয়েছে, শিগগিরই এটি সংস্কারে পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বৈদ্যপাড়া সন্দ্বীপটিলা, শ্মশানটিলা, বল্টুরাম, পূর্বচৌধুরীপাড়া, বৈরাগীটিলা, আদর্শগ্রাম প্রভৃতি এলাকায় কয়েকটি নলকূপ বসানো হলেও সুপেয় পানির অভাব রয়েছে বলে জানা গেছে।

রামগড় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো.আবদুল মান্নান ও অফিস সহকারী সুজন কর্মকার বলেন, ‘কালাপানি, পরশুরামঘাট, দাঁতারামপাড়া প্রভৃতি এলাকায় বিশুদ্ধ পানির অভাব আছে। শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর নিচে নেমে আগামী দিনে এ সমস্যা আরও তীব্র হতে পারে।’

খুচরা যন্ত্রাংশের ঘাটতির বিষয়টি তিনি কালের কণ্ঠের কাছে স্বীকার করেন। তিনি জানান, পানির সমস্যার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত জানানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘নলকূপগুলো নষ্টের পেছনে ঠিকাদারদের অনিয়মের পাশাপাশি ব্যবহারকারীদেরও সচেতনতার অভাব রয়েছে। নাট বল্টু নষ্ট হলে নলকূপ ঠিক করে না। ফলে এগুলো স্থায়ীভাবে অকেজো হয়ে যায়।’



মন্তব্য