kalerkantho


সেন্ট্রাল বয়েজ অব রাউজান

সুন্দর সমাজ গড়তে এক ঝাঁক তরুণের স্বপ্নযাত্রা

জাহেদুল আলম, রাউজান (চট্টগ্রাম)   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০




সেন্ট্রাল বয়েজ অব রাউজান

এক ঝাঁক তরুণ। কেউ পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে, কেউ কলেজে। সবার চোখে মুখে সুন্দর সমাজ গড়ার স্বপ্ন। সুন্দর সমাজ বিনির্মাণের লক্ষ্যে তাঁরা প্রতিনিয়ত ছুটছেন শিক্ষার উন্নয়ন, সৃজনশীল প্রতিভাকে বিকশিত করা, বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কাজে। কখনো উপদেষ্টাদের, কখনো নিজেদের পকেটের অর্থ ব্যয় করে জনকল্যাণমূলক কাজ করে ইতিমধ্যে বেশ পরিচিতি অর্জন করেছে রাউজানের সৃজনশীল সংগঠন ‘সেন্ট্রাল বয়েজ অব রাউজান’। শিক্ষা ও সমাজের বঞ্চিত নারী-পুরুষ এবং পথশিশুদের নানাভাবে সহযোগিতায় এগিয়ে এসে গত তিন বছর ধরে প্রশংসা কুড়িয়ে আসছে এ সংগঠন। তাঁদের ‘সুন্দরের’ হাত ধরে চলা এ সংগঠনের নানা কার্যক্রমের এখন ব্যপ্তি ছড়িয়েছে রাউজান ছাড়িয়ে নগর ও পার্শ্ববর্তী উপজেলাগুলোতেও।

রাউজান উপজেলায় প্রথমবারের মতো আন্তস্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতার আয়োজন, স্কুল-কলেজে শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ, শীতার্তদের কম্বল বিতরণ, বঞ্চিত নারী-শিশুদের মাঝে বস্ত্র, উন্নত খাবার, শিক্ষাবৃত্তি, কলেজ শিক্ষার্থীদের বই-ব্যাগ প্রদান, আর্থিকভাবে দুর্বল পরিবারের সন্তানদের স্কুল-কলেজে ভর্তির খরচ বহন, মাদকবিরোধী সেমিনার, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধসহ একের পর এক ভিন্নধর্মী আয়োজন করে এই সংগঠন এখন রাউজান এবং আশেপাশের উপজেলার অন্যান্য সংগঠনের কাছে ‘আইডল’-এ পরিণত হয়েছে।

সত্য, সুন্দরকে পুঁজি করে সামনে এগিয়ে চলা- এই স্বপ্ন, আর শপথ নিয়ে একের পর এক ছুটে চলেছেন ‘সেন্ট্রাল বয়েজ অব রাউজান’র ৭১ জন প্রতিভাবান একঝাঁক কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র। তাঁরা সবাই একটি পরিবারের সদস্য। ২০১৬ সালে বিজয়ের মাসে এ সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, লন্ডন থেকে গ্র্যাজুয়েশন করা ফারাজ করিম চৌধুরীর উৎসাহে কলেজ ছাত্র সাইদুল ইসলাম, সৈয়দ ইমতিয়াজ জামাল নকিব, মঈনুদ্দিন জামাল চিশতী, সৈয়দ জুনায়েদ উল্লাহ কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্রদের নিয়ে সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। শুরুতে সংগঠনের প্রধান উপদেষ্টা ছিলেন মরহুম স্থপতি তসলিম উদ্দিন চৌধুরী। প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে বর্তমানে আছেন তরুণ সমাজসেবক, সংগঠক সাইফুল ইসলাম চৌধুরী রানা। উপদেষ্টা হিসেবে আছেন সমাজসেবক ফরহাদ গণি নয়ন ও সালাহ্ উদ্দিন। সংগঠনের মোট কর্মকর্তা, সদস্য ৭১ জন ছাত্র। শুরু থেকেই সংগঠনের সভাপতির দায়িত্বে আছেন সাইদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ইমতিয়াজ জামাল নকিব।

সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ ইমতিয়াজ জামাল নকিব জানান, সংগঠনটির প্রতিষ্ঠার শুরুতে প্রথম কার্যক্রম হিসেবে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন উপলক্ষে পথশিশুদের মাঝে বস্ত্র বিতরণ করা হয়। একই সালে উপজেলায় প্রথমবারের মতো এই সংগঠনের উদ্যোগে শুরু করা হয় আন্তস্কুল বিতর্ক প্রতিযোগিতা। শুরু থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রতিবছর চলমান এ প্রতিযোগিতায় উপজেলার ১৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ৮০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়।

চলতি বছর এ সংগঠনের সহযোগিতায় গহিরা স্কুল ও গশ্চি স্কুল চট্টগ্রাম টিভিতে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। এটি ছিল রাউজানের কোনো স্কুল প্রথমবারের মতো টিভিতে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার ঘটনা। সংগঠনটি এ পর্যন্ত শীতার্ত ৭০০ জনকে দিয়েছে কম্বল, ৮৫ জন শিক্ষার্থীর কলেজে ভর্তি ও অসংখ্য অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তির জন্য নগদ অর্থ প্রদান করে। ২০০ জন কলেজ শিক্ষার্থীকে বই দেওয়া হয়েছে বিনা মূল্যে। ৮ জনকে দেওয়া হয়েছে ৫০০০ টাকা করে শিক্ষাবৃত্তি। শুরু থেকে চলতি বছর পর্যন্ত ১৩৫০ পথশিশুকে দেওয়া হয়েছে ঈদবস্ত্র। ২০১৭ সালে উপজেলার ৪৫০টি স্কুল, কলেজ, ইউনিয়ন পরিষদ, সরকারি প্রতিষ্ঠানে তিনলাখ টাকা ব্যয়ে বিতরণ করা হয়েছে সঠিক মাপের ৪০০টি জাতীয় পতাকা। রাউজানের ইতিহাসে সর্বোচ্চ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড করায় স্থানীয় এমপি এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর জন্মদিন উপলক্ষে ৪০০ শ্রমজীবীর মানুষের মাঝে খাবার বিতরণ করা হয়। ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে রাউজানের ১৬০টি স্কুলে ৭০০০ শিক্ষার্থীর মাঝে চলতি বছর বিতরণ করা হয়েছে শিক্ষাসামগ্রী। এছাড়া ২০১৬ সালে ৩০০ জন ও ২০১৭ সালে ৭টি স্কুলের সমাপনী পরীক্ষার্থীদের প্রদান করা হয় শিক্ষাসামগ্রী।

২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত উপজেলার বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আয়োজন করা হয় বিতর্ক কর্মশালা। ২০১৬ সালে আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি লাভ করা এক ব্যক্তিসহ স্ব স্ব ক্ষেত্রে অবদান রাখা মোট তিনজনেক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। ইতোমধ্যে সংগঠনের নির্ভীক সদস্যরা উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় বন্ধ করে দেয় ৫টি বাল্যবিয়ে। সমপ্রতি মাদক নির্মূলে সংগঠনের পক্ষ থেকে মাদকবিরোধী সেমিনার করা হয়েছে।

সংগঠনের বর্তমান প্রধান পৃষ্ঠপোষক সাইফুল ইসলাম চৌধুরী রানার জন্মদিনে বিগত চারবছর ধরে ৪৯ ছাত্র-ছাত্রীকে বই ও প্রতিষ্ঠাতা ফারাজ করিম চৌধুরীর জন্মদিনে ২০০ জনকে ব্যাগ দেয়া হয়। এছাড়া সংগঠনটি জাতিরজনক বঙ্গবন্ধুর শাহাদাত-জন্মবার্ষিকী পালন, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবসসহ বিভিন্ন জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দিবসগুলো পালন করে। সংগঠনের কর্মকর্তা-সদস্যরা প্রয়োজনে উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।

সংগঠনের কর্মকর্তারা জানান, আলোকিত সমাজ গড়ার লক্ষ্যে এ সংগঠন আরো একগুচ্ছ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। সংগঠনের সভাপতি সাইদুল ইসলাম বলেন ‘সৃজনশীল মেধাচর্চা কার্যক্রম আরো শক্তিশালী করতে বিতর্ক কমপ্লেক্স নির্মাণ করা হবে। এ ছাড়া সংগঠনের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে যেসব শিক্ষা, সামাজিক কর্মকান্ড হয়েছে, সেসবের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি নতুন নতুন শিক্ষামূলক ও সুন্দর সমাজ উন্নয়নমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে। এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি আমাদের এ কার্যক্রম দেখে ও শুনে প্রশংসা করেন এবং ভালোকাজে এগিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীম হোসেন রেজা বলেন, ‘সেন্ট্রাল বয়েজ অব রাউজান হচ্ছে ইয়াং জেনারেশনের জন্য একটি উদাহরণ। মাদকসহ বিভিন্ন কারণে ইয়াং জেনারেশন অবক্ষয়ের দিকে চলে যাচ্ছে। এখানে সেন্ট্রাল বয়েজ অব রাউজান সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। তারা সমাজের ইতিবাচক উন্নয়ন, বিশেষত মানসম্মত শিক্ষা নিয়ে কাজ করে। শিক্ষা হচ্ছে, সমস্ত উন্নয়নসহ সবকিছুর মূল ফাউন্ডেশন। তাদের প্রত্যকটা ভালো কাজে উপজেলা প্রশাসন সবসময় পাশে আছে, একাত্মতা ঘোষণা করে। তারা সমাজ পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে। অন্যদেরও আহবান জানাই, তারাও যেন সেন্ট্রাল বয়েজ অব রাউজানের মতো এগিয়ে আসে।’

এ প্রসঙ্গে সংগঠনের প্রধান পৃষ্টপোষক সাইফুল ইসলাম চৌধুরী রানা বলেন ‘সংগঠনের মূল উদ্দেশ্য শিক্ষা নিয়ে কাজ করা। শিক্ষাক্ষেত্রে সমাজের অসঙ্গতি দূর এবং গুণগত শিক্ষা যাতে পায়, সে ব্যাপারে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করা। গরিব মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি এ সংগঠন বঞ্চিত নারী, শিশুদেরও পাশে থাকছে।’

উপদেষ্টা সমাজসেবক ফরহাদ গণি নয়ন বলেন, ‘শিক্ষা ও সমাজের ভালো কাজ করতে সেন্ট্রাল বয়েজ অব

রাউজান যেভাবে এগিয়ে চলেছে, সেটার ধারাবাহিকতা প্রত্যাশা করছি, নতুন প্রজন্মের এ উদ্যোগী শিক্ষার্থী তরুণদের কাছে।’



মন্তব্য