kalerkantho


মাতামুহুরী বনাঞ্চল

গাছের পর এবার লুট হচ্ছে পাথর

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বৃক্ষ উজাড়ের পর বনখেকোরা এখন নজর দিয়েছে পাথর সম্পদের ওপর। এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় সাম্প্রতিক সময়ে পাথর আহরণের জন্যে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মাতামুহুরী রেঞ্জের ছড়া-ঝিরিগুলোতে হামলে পড়েছে। এসব বনখেকোদের হাতে প্রতিদিনই পাহাড়ি ঝিরি-ঝর্না থেকে লুট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ পাথর।

স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দারা জানান, এক সময় এ এলাকা গভীর বনবেষ্টিত ছিল। কিন্তু দিনে দিনে বনের সবুজ রঙ হারিয়ে যাচ্ছে। শঙ্কা প্রকাশ করে তাঁরা বলেন, পাথর ও বন উজাড়ের কারণে বিশাল সংরক্ষিত বনাঞ্চলটির অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে। এ অবস্থা চলতে থাকলে এক সময় এলাকাটি মরুভূমিতে পরিণত হতে পারে।

অভিযোগ ওঠেছে, বন বিভাগের লোকদের প্রচ্ছন্ন প্রশ্রয় পেয়ে বেনিয়া চক্র প্রকাশ্যেই পাথর উত্তোলন, আহরণ এবং ভেঙে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পাচার করছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে বন বিভাগের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, জনবল সংকটের কারণে দুর্গম এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তবে স্থানীয় সূত্রগুলো অভিযোগ করেছে, পাচারকারীরা প্রভাবশালী হওয়ায় বনজ সম্পদ রক্ষার পরিবর্তে বনকর্মীরা অসহায় হয়ে পড়ায় পাচারকারী ও ব্যবসায়ীচক্র প্রচলিত বন আইনকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে সংরক্ষিত বনভূমির পাথর লোপাট করে চলেছে।

সূত্র জানায়, আইন ফাঁকি দেওয়ার কৌশল হিসেবে আহরিত পাথর সরকারের উন্নয়ন প্রকল্প কাজে ব্যবহারের কথা বলে বন বিভাগকে দমিয়ে রেখেছে। এর ফলে পাথরখেকোদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে সাহস পাচ্ছে না বন বিভাগ।

অন্যদিকে বন বিভাগ ও প্রশাসনের চোখে ধূলি দিয়ে বিনা রাজস্বে আহরিত পাথর স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যবহার না করে চড়া দামে বহিরাগত ঠিকাদারদের কাছে বিক্রি করছে পাথরখেকো চক্রটি।

এদিকে দিনের পর দিন বেপরোয়া পাথর উত্তোলন এবং বৃক্ষ কর্তনের কারণে মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্টের অস্তিত্ব প্রায় বিপন্ন হয়ে পড়েছে। পাহাড়ি এলাকা থেকে অব্যাহত পাথর আহরণের কারণে দিনে দিনে শুকিয়ে যাচ্ছে পানির উৎসগুলো।

স্থানীয়রা জানান, দুর্গম এলাকাগুলেতে নিরাপত্তাজনিত কারণে বনকর্মীরা যেতে না পারায় মাঝে মধ্যে সেনাবাহিনীর সহায়তায় অভিযান পরিচালিত হয়ে থাকে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ে আলীকদম জোনের সেনা সদস্যরা মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্টের বিভিন্ন ছড়া-ঝিরিতে অভিযান চালিয়েছে। এসময় সেনা জওয়ানদের ধাওয়া খেয়ে পাথর উত্তোলনকারীরা সটকে পড়ায় ওই অভিযানে কাউকে আটক করা যায়নি। সেনা সদস্যরা চলে যাওয়ার পর দ্বিগুণ হারে পাথর চুরি করে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া হয়।

অভিযোগ রয়েছে স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি বখরার বিনিময়ে পাথর ও বনজসম্পদ লুটেরাদের সাথে জড়িত হয়ে পড়ায় বনখেকোরা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

প্রসঙ্গত, মাতামুহুরী নদীর পানি প্রবাহ ধরে রাখার লক্ষ্যে ১৯২০ সালে আলীকদম উপজেলার ১ লাখ ৩ হাজার একর পাহাড়ি ভূমিকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল বা রিজার্ভ ফরেস্ট ঘোষণা করা হয়। সরকারি কর্মসূচির আওতায় ১৯৫২ সাল থেকে এই অঞ্চলে বনায়ন কার্যক্রম শুরু হয়। কক্সবাজার বন বিভাগের অধীনে কয়েকটি প্রকল্পের আওতায় ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত রিজার্ভ ফরেস্ট এলাকায় বনায়ন করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, বন বিভাগ এবং প্রভাবশালীরা একজোট হয়ে ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বন উজাড়ে মত্ত হয়ে ওঠে।

অভিযোগ ওঠেছে, এই মেয়াদকালে মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট থেকে শত কোটি টাকার বৃক্ষ লুণ্ঠন হয়ে যায়। এ অবস্থায় বন ব্যবস্থাপনার সুবিধার কথা বিবেচনা করে ২০০১ সালে মাতামুহুরী রেঞ্জকে কক্সবাজার বন বিভাগ থেকে আলাদা করে লামা বন বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়। কিন্তু এতেও বন নিধন এবং পাথর উত্তোলন ঠেকানো যায়নি।

সম্প্রতি স্থানীয় কয়েকজন নাগরিক মাতামুহুরী রিজার্ভ ফরেস্ট সরেজমিন ঘুরে এসে জানান, বর্তমানে বিশাল এ রিজার্ভে মূল্যবান কোনো বৃক্ষ না থাকলেও শত শত ঝিরি ও খালে এখনও কয়েক কোটি ঘনফুট ভাসমান পাথর রয়েছে। তারা জানান, প্রভাবশালীদের একটি সিন্ডিকেট পাথর উত্তোলনকারীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নিয়ে পাচার কাজে সক্রিয় সহযোগিতা করার ঘটনা তারা প্রত্যক্ষ করেছেন। এ কাজে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও জড়িত আছেন বলে তারা জানান।

তবে বন বিভাগের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, ব্যবসায়ী চক্রটি ক্ষমতাসীনদের মদদপুষ্ট হওয়ায় বন বিভাগের মাঠকর্মীরা পাচারকারীদের কাছে অসহায়। সূত্রটি জানায়, বন বিভাগের চিঠিপত্রে এবং বিভিন্ন সভায় বন কর্মীদের অসহায়ত্বের কথা উত্থাপন করা হলেও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় নীতি নির্ধারকদের দিক থেকে তেমন উদ্যোগ লক্ষ করা যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আলীকদম উপজেলা পরিষদের জুলাই মাসের উন্নয়ন সভাতেও মাতামুহুরী রেঞ্জের বিট কর্মকর্তা পাথর পাচার রোধে তাদের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরেন।

বিট কর্মকর্তা মাহাবুব আলম জানান, দুর্গম এলাকা হওয়ায় বনকর্মীরা পাথর উত্তোলনকারীদেরকে ধরতে পারছে না। বন বিভাগের এই কর্মকর্তা জানান, সেনাবাহিনী ও পুলিশের সহায়তায় ঘন ঘন অভিযান চালানো গেলে পাথর পাচার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা সম্ভব হতে পারে।



মন্তব্য