kalerkantho


যান চলাচলে শৃঙ্খলা আসবে কবে

সড়কে যানবাহন চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে চট্টগ্রামে ভ্রাম্যমাণ আদালত, বিআরটিএ ও ট্রাফিক পুলিশের অভিযান চলমান থাকলেও বিশৃঙ্খলা চলছেই। গণপরিবহনের কৃত্রিম সংকটও সৃষ্টি করা হচ্ছে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন : নূপুর দেব, চট্টগ্রাম

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



যান চলাচলে শৃঙ্খলা আসবে কবে

ছবি : রবি শংকর

সড়কে যত্রতত্র যাত্রী উঠা-নামা এবং গাড়ি দাঁড়ানো, সব রুটে কাউন্টারভিত্তিক বাস-মিনিবাস সার্ভিস না থাকা, সাধারণ যাত্রী পরিবহনের জন্য রুটপারমিট থাকলেও অনেক বাস-মিনিবাস সিইপিজেডসহ বিভিন্ন গার্মেন্ট প্রতিষ্ঠানে রিজার্ভ ভাড়ায় চলাচল, টার্গেট ভিত্তিতে গাড়ি চলাচলসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে চলছে চট্টগ্রামের গণপরিবহন। পবিত্র ঈদুল আজহার আগে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলাকালে নগরের যানবাহন চলাচলে অনেকটা শৃঙ্খলা ফিরে আসছিল। এরপর প্রশাসনের পক্ষ থেকে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত, বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশসহ বিভিন্নভাবে অভিযানও পরিচালনা করা হচ্ছে। এর মাঝেও বিশৃঙ্খলা চলছেই। সড়কের অব্যবস্থাপনা থেমে নেই। কবে নগর গণপরিবহনে শৃঙ্খলা আসবে তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না। তবে

মালিক-শ্রমিকরা বলছেন, সব রুটে কাউন্টারভিত্তিক সার্ভিস চালু হলেই সড়কে শৃঙ্খলা আসবে।

এদিকে প্রশাসনের নানামুখী উদ্যোগের মধ্যে পরিবহনে শৃঙ্খলা ফিরে আসার কথা থাকলেও দেখা দিয়েছে উল্টো চিত্র। নতুন করে গণপরিবহনের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করেছে কতিপয় পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ছাড়া গাড়ি সড়কে পাওয়া গেলে জরিমানা আদায় ও মামলা করা হচ্ছে। এছাড়া লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালাতে দিচ্ছে না। যানবাহন চলাচলে সড়কে এসব কড়াকড়ির কারণে গত এক সপ্তাহ ধরে প্রায় অর্ধেক গণপরিবহন সড়কে নেই। অভিযোগ ওঠেছে, প্রশাসনের অভিযানের মুখে পরিবহন মালিকরা সড়ক থেকে গণপরিবহন কমিয়ে দিয়েছেন। সড়কে শৃঙ্খলা আনতে প্রশাসনের উদ্যোগ যাতে সফল হতে না পারে এবং প্রশাসনকে ‘চাপে’ রাখতে একশ্রেণির মালিক শ্রমিক সড়কে গণপরিবহন কমিয়ে দিয়ে ‘কৃত্রিম সংকট’ সৃষ্টি করেছেন।

গত কয়েকদিন ধরে নগরের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, অক্সিজেন, কাপ্তাই রাস্তার মোড়, কালুরঘাট, দুই নম্বর গেট, বায়েজিদ বোস্তামী, জিইসি মোড়, ওয়াসা, চকবাজার, দেওয়ানহাট, আগ্রাবাদ, হালিশহর ছোটপুল, বড়পোল, বিশ্বরোড, দামপাড়া, অলংকার, বারিকবিল্ডিং, চৌমুহনী, কোতোয়ালী, নিউমার্কেট, কলেজ রোড, আন্দরকিল্লা, স্টেশন রোড, টাইগারপাস, লালখানবাজার ও আশপাশে এলাকায় দেখা যায় গণপরিবহনের অপেক্ষায় রয়েছেন মানুষ। গাড়ি না পেয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকছেন যাত্রীরা। বাস মিনিবাসের সংকটকে পুঁজি করে সিএনজি অটোরিকশা ও রিকশার ভাড়া ভাড়িয়ে দিয়েছে চালকরা। দিনভর মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ কম বেশি প্রায় সব সড়কে। এরমধ্যে প্রতিদিন সন্ধ্যার পর দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। ওই সময় প্রায় অর্ধেক গণপরিবহন বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভাড়া টানছে।

গত রবিবার নগরের চকবাজার গুলজার টাওয়ারের বিপরীত পাশে শতাধিক যাত্রী দাঁড়িয়ে আছেন অটোটেম্পুর জন্য। এর মধ্যে বেশির ভাগই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রী। একসপ্তাহ আগেও ২/৪ মিনিট পরপর সেখানে গাড়ি আসতো। কিন্তু চকবাজার-বারিকবিল্ডিং সড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে গাড়ি চেক করার কারণে মালিক-শ্রমিকরা গাড়ি কমিয়ে দিয়েছেন।

এই দিন বেলা দেড়টার দিকে শামসুন নাহার নামে চট্টগ্রাম কলেজের এক শিক্ষার্থী কালের কণ্ঠকে বলেন, ৪০ মিনিট ধরে অপেক্ষা করছি টেম্পুর জন্য। কিন্তু পাচ্ছি না। ২০/২৫ মিনিট পর একটি আসছে। ভিড়ের জন্য উঠতে পারছি না।

একই অবস্থা সড়কের কলেজ গেট, গণি বেকারি, জামালখান মোড়ে। সেখানে গাড়ির জন্য অনেকে দাঁড়িয়ে আছেন। জামালখান মোড়ে অপেক্ষারত ফয়সাল নামে এক যুবক বলেন, আগে টেম্পু ঘন ঘন আসতো। গত ৪/৫ দিন ধরে গাড়ি কম। আমি টাইগারপাস যাব। টেম্পু না পেয়ে সকালে এখানে রিকশায় এসেছি ৫০ টাকা দিয়ে। টেম্পুর ভাড়া ৬ টাকা।

মুরাদপুর মোড়ে গত সোমবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সড়কের চতুর্দিকে ৩০/৩৫ জন দাঁড়িয়ে আছেন গণপরিবহনের জন্য। একই অবস্থা ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকায়ও। এ ভাবে গণপরিবহনের জন্য মানুষের কষ্টের শেষ নেই।

গণপরিবহন সংকট বিষয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, নগরের অনেক সড়কে রুটপারমিট বিহীন গাড়ি চলাচল করছে। আবার এক রুটের পারমিট নিয়ে অন্যরুটেও গণপরিবহন চলাচল করছে। এর মধ্যে অবৈধ ও রুটপারমিটবিহীন সবচেয়ে বেশি গাড়ি চলছে ১০ নম্বর রুটে। সড়কে শৃঙ্খলা আনতে সমন্বিত কোনো উদ্যোগ নেই। নগরে একমাত্র আমাদের সংগঠন মেট্রো প্রভাতী নামে একটি কাউন্টারভিত্তিক বাস সার্ভিস চালু করেছে। আর কোথাও কাউন্টার সার্ভিস নেই। কাউন্টার সার্ভিসের মাধ্যমেই সড়কে শৃঙ্খলা আনতে হবে। এর বিকল্প নেই। কিছু স্বার্থান্বেষী পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের চাঁদাবাজি ও আধিপত্যের কারণে গণপরিবহনে চরম বিশৃঙ্খলা হচ্ছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন চট্টগ্রাম আঞ্চলিক শাখার সাধারণ সম্পাদক অলি আহম্মদ বলেন, সড়কে প্রতিযোগিতা দিয়ে গাড়ি চলাচলের অন্যতম প্রধান কারণ হল টার্গেট ভিত্তিতে গাড়ি চালানো। মালিকরা দৈনিক ভাড়া বেঁধে দেওয়ায় চালকরা সেই আয়ের টার্গেট নিয়ে গাড়ি চালাচ্ছেন। এতে দুর্ঘটনা ঘটছে। আমাদের দাবি টার্গেট প্রথা বাদ দিয়ে কাউন্টারভিত্তিতে গণপরিবহন চলাচলের। এতে শৃঙ্খলা আসবে।

এদিকে নগরের বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, গণপরিবহন ব্যবস্থায় চরম বিশৃঙ্খলার পাশাপাশি চলছে বেপরোয়া চাঁদাবাজি। অভিযোগ রয়েছে, বৈধ-অবৈধ মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো প্রতিদিন বাস মিনিবাস হিউম্যান হলার ও অটোটেম্পু ঘিরে দৈনিক ৭ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং মাসে আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা চাঁদাবাজি করছে। ‘ওয়েবিল’ (গাড়ি চলাচলের জন্য ফি) এর নামে নগরের পথে পথে ভয়াবহ এই চাঁদাবাজি চললেও প্রশাসনের নীরবতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠেছে।

জানা যায়, ওয়ান ইলেভেনের আগের বিএনপি সরকারের আমলেও ভয়াবহ চাঁদাবাজি ছিল নগর গণপরিবহনে। ওয়ান ইলেভেন শুরুর পর পর আগের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি থেকে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙখলা আনয়নের লক্ষ্যে গণপরিবহনে চাঁদাবাজির নাম ‘ওয়েবিল’ প্রথা বন্ধ করা হয়েছিল। তখন সব মালিক সংগঠনগুলো ভেঙে একটি ফোরামে নিয়ে আসা হয়। ওই সময় প্রায় দুই বছর নগর গণপরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধের পাশাপশি প্রথমবারের মতো রুট নির্ধারণ করা হয়েছিল। এরপর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছুদিন না যেতেই চট্টগ্রাম নগর গণপরিবহনে আবার বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। তা এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত প্রায় নয় বছর ধরে বেশ কয়েকবার পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙখলা ফিরিয়ে আনার জন্য প্রশাসন পদক্ষেপ গ্রহণ করলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। গণপরিবহন ব্যবস্থা যে তিমির সেই তিমিরে রয়েছে।

বিআরটিএ সূত্রে জানা যায়, বন্দরনগর চট্টগ্রামে বাস মিনিবাসের ১৪টি রুট রয়েছে। এসব রুটে ১১৩৪টি বাস মিনিবাস চলাচল করছে। এছাড়া ১৬টি হিউম্যান হলারের রুটে ১২৫০টি এবং ১৬টি অটোটেম্পু রুটে ১৬৬২টি গাড়ি চলছে। সিএনজি অটোরিকশার নিবন্ধন রয়েছে ১৩ হাজার। এর বাইরে নিবন্ধনবিহীন সিএনজি অটোরিকশা চলছে কয়েক হাজার।

নাম প্রকাশ না করে একাধিক মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নেতারা বলেন, বেশির ভাগ সংগঠন নিয়মিত অডিট করে না। তাই  দৈনিক কতো চাঁদাবাজি হয় তার প্রকৃত কোনো তথ্য কারো কাছে থাকবে না। ওয়েবিল যদি বৈধ হতো তাহলে ওয়ান ইলেভেনে কেন বন্ধ করল? ওয়েবিল অবৈধ।

গণপরিবহনে চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পরিবহন মালিক গ্রুপের মহাসচিব বেলায়েত হোসেন বেলাল বলেন, যেসব মালিক সংগঠনের রেজিস্ট্রেশন নেই এরাই ট্রাফিক বিভাগের কতিপয় কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে অবৈধভাবে চাঁদাবাজিতে লিপ্ত। কিছু কিছু সংগঠনের চাঁদাবাজির কারণে নগর গণপরিবহনে বিশৃঙ্খলা ও চরম নৈরাজ্য হচ্ছে তা ঠিক। আমরা প্রশাসনকে অনিয়ম ও চাঁদাবাজি বন্ধে বিভিন্ন সময় দাবি জানালেও কেন ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না তা বলতে পারছি না।

তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম নগর এলাকায় সরকার অননুমোদিত ইজিবাইক, টমটম, ব্যাটারিচালিত রিকশা, রুট পারমিটবিহীন বাস-মিনিবাস, হিউম্যান হলার, টেম্পো চলাচল ও মেট্রো আরটিসির অনুমোদনবিহীন রুটে গাড়ি চলাচল নিয়ে ৬ পৃষ্ঠার একটি অভিযোগ পুলিশ কমিশনার বরাবরে একমাস আগে আমাদের সংগঠন থেকে দেওয়া হয়েছে।

 

 

বিশৃঙ্খলা ঠেকাতে আমরাও মাঠে নেমেছি

 

গোলাম রসুল বাবুল

অতিরিক্ত মহাসচিব, চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপ

 

গণপরিবহন সংকটের কথা স্বীকার করেছেন চট্টগ্রাম জেলা সড়ক পরিবহন মালিক গ্রুপের অতিরিক্ত মহাসচিব গোলাম রসুল বাবুল। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘সড়কে শৃঙ্খলা আনার জন্য শুধু প্রশাসন নয়, আমরাও মাঠে নেমেছি। ইতোমধ্যে আমাদের সংগঠনের পক্ষ থেকে বিআরটিএ কার্যালয়ের পাশে, কর্নেলহাট ও টাইগারপাস এলাকায় মালিক-চালকদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য লিফলেট বিতরণ ও সমাবেশ করেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের বক্তব্য একটাই তা হলো লাইসেন্সবিহীন কেউ গাড়ি চালাতে পারবেন না এবং যথাযথ কাগজপত্র ছাড়া সড়কে গাড়ি নামানো যাবে না। ফিটনেস না থাকলে গাড়ি সড়কে চলতে পারবে না।’

‘মনে হচ্ছে প্রশাসন ও আমাদের বিভিন্ন পদক্ষেপের কারণে সড়কে ৩০/৪০ শতাংশ গাড়ি উধাও হয়ে গেছে। তবে কিছু মালিক বলছেন, তাঁরা সড়কে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। তাই তাঁরা গাড়ি নামাচ্ছেন না।’-যোগ করেন গোলাম রসুল বাবুল।



মন্তব্য