kalerkantho


এলজিইডির আরইআরএমপি প্রকল্প

সঞ্চয়ের টাকায় স্বাবলম্বী হচ্ছেন প্রান্তিক নারীরা

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



সঞ্চয়ের টাকায় স্বাবলম্বী হচ্ছেন প্রান্তিক নারীরা

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের পল্লী কর্মসংস্থান ও সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি বা রুরাল এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড রোড মেইনটেনেন্স প্রোগ্রাম (আরইআরএমপি) দরিদ্র ও অসহায় নারীদের জীবনে বিকল্প কর্মসংস্থানের পাশাপাশি স্বাবলম্বী হওয়ার পথও খুলে দিয়েছে।

নিজেদের কষ্টার্জিত আয়ের একটি অংশ সঞ্চয় করে প্রকল্প শেষে সঞ্চিত টাকা একত্রে পেয়ে নতুন স্বপ্নের দিগন্ত গড়ার পথ খুঁজে পেয়েছেন গ্রামে বসবাসকারী এসব প্রান্তিক নারী।

সারাদেশের অসংখ্য নারীর মতোই নিজের সঞ্চিত টাকায় থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নের বিধবা মেবুমা মারমা এবং সদর ইউনিয়নের  মমতাজ বেগমসহ আরো ৩৮ পরিবারের সামনে খুলে গেছে স্বপ্ন দুয়ার।

দৈনিক দেড় শ টাকা মজুরির বিনিময়ে নিজ এলাকার গ্রামীণ সড়ক রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করেছেন এসব নারী।  কাজের বিনিময়ে তারা নগদ গ্রহণ করেছেন ১০০ টাকা।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডির) তত্ত্বাবধানে সঞ্চয় খাতে জমা করেছেন ৫০ টাকা। এই টাকা সোনালী ব্যাংক থানচি শাখায় নিজের সঞ্চয়ী হিসাবে জমা হতে থাকে।

দৈনিক ৫০ টাকার সঞ্চয় চার বছরে গিয়ে দাঁড়ায় ৭৩ হাজার ৩৪৫ টাকায়। ১২ আগস্ট পুরো টাকার চেক তুলে দেওয়া হয় ওই ৪০ নারীর হাতে।

এত বড় অঙ্কের টাকা এর আগে তাদের অনেকেই হয়তো একসাথে দেখেননি। তাই সঞ্চয়ের চেক হাতে নিয়ে কারো কারো মুখে স্বর্গীয় আভা ছড়িয়ে পড়ে। কারো কারো চোখ ভরে ওঠে আনন্দ অশ্রুতে।

থানচি উপজেলার প্রান্তিক ইউনিয়ন তিন্দুর অতি দুর্গম এক এলাকার বাসিন্দা মেবুমা মারমা। বয়স ৩০ হতে না হতেই বৈধব্য নেমে আসে তাঁর জীবনে। বাস্তবের সাথে লড়াই করবেন, নাকি হার মেনে যাবেন জীবন সংগ্রামে- এমন এক সন্ধিক্ষণে তাঁর জীবনে ‘টানেলের ওপারে আলোক শিখা’র মতোই আলোকবর্তিকা হয়ে আসে রুরাল এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড রোড মেইনটেনেন্স প্রোগ্রাম  (আরইআরএমপি-২)-এ কাজ করার প্রস্তাব। কাজের সুযোগ পেয়ে আবারও ঘুরতে থাকে তাঁর জীবন চাকা।

মেবুমা মারমা বললেন, ‘অন্ন চিন্তা দূর হওয়ায় আমি নিজেকে আবার ঘুরে দাঁড়ানোর জন্যে প্রস্তুত করতে থাকি। সঞ্চয়ের টাকা হাতে পেয়ে এখন আমি স্বপ্ন দেখছি এক নতুন দিনের।’

২০০৯ সালে বাংলাদেশ সরকার গ্রামীণ এলাকার হত দরিদ্র পরিবারগুলোকে মধ্যম আয়ের পরিবারে পরিণত করার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) তত্ত্বাবধানে ‘রুরাল এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড রোড মেইনটেনেন্স প্রোগ্রাম (আরইআরএমপি) চালু করে। প্রথম পর্যায়ের প্রকল্প মেয়াদ শেষ হলে ২০১৪ সালের ১৬ মার্চ থেকে শুরু হয় রুরাল এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড রোড মেইনটেনেন্স প্রোগ্রাম-২ (আরইআরএমপি-২) এবারও প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরকে।

প্রকল্পের আওতায় প্রতি ইউনিয়ন হতে ১০টি হত-দরিদ্র পরিবারের একজন করে নারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়।

গ্রামীণ অবকাঠামোগত উন্নয়নের আওতায় নির্মিত অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ রাস্তাঘাট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করাসহ রক্ষণাবেক্ষণ কাজের দায়িত্ব পান তাঁরা।

কাজের জন্যে প্রতি জনকে দৈনিক ১৫০ টাকা মজুরির বিধান রাখা হয়। তবে প্রান্তিক এসব নারীকে পরের মুখাপেক্ষী অবস্থা থেকে স্বাবলম্বী করতে নগদ ১০০ টাকা প্রদান এবং তাদের নামে ব্যাংকে সঞ্চয়ী হিসেব খুলে ৫০ টাকা হারে সঞ্চয় করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়।

প্রথম দিকে সঞ্চয়ের টাকা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান থাকলেও প্রকল্প শেষে বিশাল অংকের টাকা হাতে পেয়ে স্বপ্নের বীজ বুনতে শুরু করেন এসব নারী।

কথা বলে জানা গেল, তাঁদের মধ্যে কেউ বাড়ির আঙিনায় শাক-সবজি চাষ, কেউ হাঁস-মুরগি প্রতিপালন, কেউবা গরু-ছাগল পালন করে স্বাবলম্বী হতে চান।

সম্প্রতি থানচি উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে

পল্লী কর্মসংস্থান ও সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচি-২ (আরইআরএমপি-২) বাস্তবায়নকৃত প্রকল্পের কর্মীদের জমাকৃত টাকার চেক ও সনদপত্র বিতরণ করেন।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরে কমিউনিটি অরগানাইজার মোহাম্মদ নিজাম উদ্দিন। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে থানচি উপজেলা পরিষদের ভাইস-চেয়ারম্যান চসাথোয়াই মারমা (পকশৈ), থানচি প্রেস ক্লাবের সভাপতি অনুপম মারমা, তিন্দু ইউপি চেয়ারম্যান মংপ্রুঅং মারমা, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের জেলা প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা হোসেইন মোহাম্মদ মাসুদ আলম উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে ৪০ জন হত-দরিদ্র নারীর প্রত্যেকের হাতে ৭৩ হাজার ৩৪৫ টাকার চেক তুলে দেন অতিথিরা।

থানচি প্রেস ক্লাবের সভাপতি অনুপম মারমা জানান, এমন একটা সময় ছিল, যখন এসব পরিবারের সদস্যরা পরের দিন কী খাবেন-এ চিন্তায় অস্থির থাকতেন। এখন তারা অন্য কারো সাহায্য ছাড়াই নিজেই গড়তে যাচ্ছেন নিজের আয়ের উৎস।

প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা হোসেইন মোহাম্মদ মাসুদ আলম বলেন, ‘২০০৯ সালে সরকার প্রধান প্রান্তিক মানুষের ভাগ্য বদলে দেবার যে স্বপ্ন দেখছিলেন, আজ তা বাস্তবে পরিণত হলো।’

‘প্রান্তিক এসব নারী কেবল টাকাই পাননি। তাঁরা পেয়েছেন কাজ করা এবং জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার অমিত শক্তিও।’ যোগ করেন তিনি।



মন্তব্য