kalerkantho


দুঃখিনী মায়ের শেষ স্বপ্নও চুরমার

দীঘিনালায় ৫ম শ্রেণির ছাত্রীর ক্ষতবিক্ষত লাশ

জাকির হোসেন, দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি)   

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



দুঃখিনী মায়ের শেষ স্বপ্নও চুরমার

খাগড়াছড়ির দীঘিনালার নয়মাইল এলাকায় ৫ম শ্রেণির ছাত্রী ১১ বছরের কৃত্তিকা ত্রিপুরা ওরফে পুনাতিকে হত্যার ঘটনায় প্রতিবাদ ও নিন্দার ঝড় বইছে। ঘটনার এক সপ্তাহ পরও স্থানীয়দের মাতম বন্ধ হয়নি। তাছাড়া পুনাতির বিদ্যালয়ে মিড ডে মিল এখন সহপাঠীদের মনে নতুন করে পুনাতি হারানোর বেদনা জাগাচ্ছে। এটি আগে বাস্তবায়ন হলে হয়তো পুনাতিকে হারাতে হতো না-এমনই ধারণা সহপাঠীদের। প্রথম মিড ডে মিলের দিনটি পুনাতির সহপাঠীদের কেটেছে অশ্রুসিক্ত নয়নে।

অপরদিকে পুনাতির বাড়িতে গিয়ে জানা গেছে, হৃদয়বিদারক আরো কিছু তথ্য। দিনমজুর ঘরের সর্বশেষ আশার আলো মেয়েকে হারানোর শোকে কান্না করতে করতে চোখের পানিও শুকিয়ে গেছে দুঃখিনী মা অনুমতি ত্রিপুরার। এখন ষ্পষ্টভাবে কথাও বলতে পারেন না তিনি।

জানতে চাইলে ভাঙা গলাতেই দুঃখের বিবরণ শোনালেন। অনুমতি জানান, স্বামীর মৃত্যুর পর নিজের উপার্জনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে পরিবারটি। জুমচাষ করেন দূর পাহাড়ে। সকাল হলেই জুমের কাজে চলে যান শিশু পুনাতিকে ঘরে রেখে। কোনো দিন নিজের জুমচাষের কাজে আর কোনোদিন অন্যের জুমে কাজ করতে যান তিনি। প্রতিদিনের মতো ২৮ জুলাইও চলে যান জুমে।

প্রতিদিন পুনাতি দুপুরে স্কুল থেকে একাই ঘরে এসে ভাত খেয়ে আবার চলে যেত স্কুলে। আর এ কারণে মাটির গুদামঘরের দরজায় লাগানো তালার একটি চাবি থাকতো পুনাতির কাছে। অনুমতি জুম থেকে ফেরার আগেই পুনাতির স্কুল ছুটি হয়। সে কারণে প্রতিদিন বিকেলে জুম থেকে ফিরে পুনাতিকে ঘরেই পেতেন মা। কিন্তু ঘটনার দিন তিনি ঘরে ফিরে দেখেন দরজা বন্ধ, দরজার সামনে পড়ে রয়েছে পুনাতির সেন্ডেল। বন্ধ দরজায় আটকানো ঝুলছিল খোলা তালাটি; আর চাবিটি নিচেই মাটিতে পড়েছিল। ঘরে ঢুকে দেখতে পান পাতিলের ভাত আগের অবস্থাতেই রয়েছে। তখনি মা অনুমতি বুঝতে পারেন ভাতও খাওয়া হয়নি পুনাতির। এ কারণে পুনাতিকে না দেখে অস্থির হতে থাকে মায়ের মন। আর মেয়ে হারানোর পর থেকে শোকার্ত অনুমতির মুখেও অন্ন ওঠেনি এখনো। ভাত খেতে এসে লাশ হলো মেয়েটি; পুনাতিকে দুর্বৃত্তরা ভাত খাওয়ার সুযোগও দেয়নি-একথা কোনোভাবেই ভুলতে পারছেন না নিহত পুনাতির মা অনুমতি।

অনুমতি আরো জানান, ৭ বছর আগে পুনাতির দরিদ্র বাবা নন্দন ত্রিপুরা খাগড়াছড়ি জেলা সদরে হাটবারে কলা বিক্রি করতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে। মেজ ছেলে অমিন ত্রিপুরা (১৪) কিছুটা মানসিক প্রতিবন্ধী। অভাবের সংসারের কারণে অমিনকে গাড়িতে দিয়ে রেখেছেন। সে গাড়ি ধোয়া মোছার কাজ করে। যত স্বপ্ন ছিল ঘরে থাকা পুনাতিকে নিয়ে। পুনাতি পড়ালেখা করে শিক্ষিত হলে একদিন হয়তো অভাবী সংসারের কষ্ট দূর হবে এ আশা বুকে বেঁধে তিনি নিজে কাজ করেও মেয়েকে স্কুলমুখী রেখেছিলেন। সে স্বপ্নতো ভেঙেই গেলে এখন বেঁচে থাকার অবলম্বনটুকুও শেষ হয়ে গেছে হতদরিদ্র দুঃখিনী মায়ের। এখন শূন্য ঘরে কেঁদে কেটেই দিন কাটছে তাঁর।

মেয়েকে নিয়ে অনুমতির সুখের স্বপ্নের আশার প্রমাণও পাওয়া যায় পুনাতির বিদ্যালয়ের শিক্ষকের কথায়। নয়মাইল ত্রিপুরাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রীতিলতা ত্রিপুরা জানান, মা অনুমতি মেয়ে পুনাতির লেখাপড়ার বিষয়ে সার্বক্ষণিক খোঁজ-খবর রাখতেন। শিক্ষকের সাথে সকাল বা বিকেলে দেখা হলেই আগে জানতে চাইতেন তাঁর মেয়ে ক্লাসের সব পড়া ঠিক ঠিক আদায় করতে পেরেছে কিনা। ঘরেও তিনি মেয়ের পড়ালেখার বিষয়ে খোঁজ রাখেন বলেও জানাতেন শিক্ষককে। পড়ালেখায় পিছিয়ে পড়লে তা মাকে জানানোর জন্য অনুরোধ করতেন শিক্ষকের নিকট। এছাড়া পুনাতি বিদ্যালয়ে মাসে একদিনও অনুপস্থিত থাকতো না জানিয়ে হাজিরা খাতাও দেখান প্রীতিলতা। এদিকে সরকারি টিফিনবক্স নতুন করে পুনাতি হারানোর বেদনা জাগিয়েছে সহপাঠীদের মনে। মিড ডে মিল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে সম্প্রতি ১১২টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাড়ে ছয় হাজার টিফিনবক্স বিতরণ করা হয়। নয়মাইল ত্রিপুরাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও পেয়েছে টিফিনবক্স।

তাদের মধ্যে পুনাতির সকল সহপাঠীই টিফিন বক্স পেলেও মৃত্যুর কারণে বাদ গেছে পুনাতির টিফিন বক্স।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সূর্যম্বর ত্রিপুরা জানান, গত বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের হাতে টিফিনবক্স তোলে দিয়ে বলা হয়, এ বক্সে করে সবাই যেন বাসা থেকে দুপুরের খাবার নিয়ে আসে টিফিন ছুটির সময় সবাই স্কুলে একসাথে বসে খাবার খাবে; কারো বাড়িতে যেতে হবে না।

টিফিনবক্স হাতে নিয়ে শিক্ষকের এমন কথা শুনেই পুনাতির সহপাঠীরা পুনাতির কথা স্মরণ করছিল। 

গত শনিবার দুপুরে বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা এই প্রথম তাদের পাওয়া টিফিনবক্সে করে বাড়ি থেকে আনা খাবার বিদ্যালয়ে বসে একসাথে খাচ্ছে। তখন পুনাতির সহপাঠী শিয়ারি ত্রিপুরা, আইচুকতি ত্রিপুরা, বর্ষা ত্রিপুরাসহ অনেকেই আক্ষেপ করে অশ্রুসজল নয়নে বলছিল, এ টিফিনবক্স যদি আগে দেওয়া হতো তাহলে সেদিন আর দুপুরের খাবার খেতে পুনাতিকে বাড়ি যেতে হতো না। তাহলে হয়তো বেঁচে যেত পুনাতির জীবন। আজও পুনাতি থাকতো তাদের মাঝে। আর প্রতিদিন দুপুরে একসাথে বিদ্যালয়ে বসে পুনাতিও খেত তাদের সাথে।

প্রসঙ্গত, গত ২৮ জুলাই দিবাগত রাতে দীঘিনালার নয়মাইল এলাকায় নিজ বাড়ির পাশের বাঁশবাগান থেকে নয়মাইল ত্রিপুরাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী কৃত্তিকা ত্রিপুরা ওরফে পুনাতির (১১) ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্বার করে পুলিশ। ওই দিন দুপুরের কোনো এক সময়ে শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে এলাকাবাসী।

 

 

 



মন্তব্য