kalerkantho


স্কাউটের সর্বোচ্চ পদক ‘শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড’ পেল পটিয়ার মেয়ে সাদিয়া

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



স্কাউটের সর্বোচ্চ পদক ‘শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড’ পেল পটিয়ার মেয়ে সাদিয়া

চট্টগ্রামের পটিয়ার মেয়ে সাদিয়া বিনতে হাকিম পুষ্পিতা স্কাউটের সর্বোচ্চ পদক ‘জাতীয় শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড’ পেয়েছে। ২০১৬ সালে পৌর সদরের শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় স্কাউট দল থেকে সে উপজেলা, জেলা, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন পরীক্ষায় কৃতিত্বের সাথে অংশ নিয়ে এ সাফল্য অর্জন করে।

গত ২৯ জুলাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে এ পদক বিতরণ করেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘স্কাউট শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলিত জীবন গঠনের শিক্ষা দেয়। পাঠ্যশিক্ষার পাশাপাশি এ শিক্ষা শিশু-কিশোরদের আত্মপ্রত্যয়ী, পরোপকারী, আত্মনির্ভরশীল ও দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।’

প্রধানমন্ত্রী দেশে প্রায় ১৭ লাখ স্কাউট থাকার তথ্য তুলে ধরে বলেন, ‘তা আগামী ২/৩ বছরের মধ্যে ২১ লাখে উন্নীত করা হবে।’ এ লক্ষ্যে তিনি গার্লস গাইডের কেন্দ্রীয় শতাব্দী ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরে ‘জাতীয় শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড’ বিতরণ করেন।

পটিয়ার মেয়ে শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড বিজয়ী সাদিয়া বিনতে হাকিম পুষ্পিতা বলে, ‘আমি অ্যাওয়ার্ড পেয়ে খুবই খুশি। কারণ এটিই হচ্ছে স্কাউটের সর্বোচ্চ পদক। যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই দিয়ে থাকেন। আমি মনে করি স্কাউটের যাবতীয় কাযক্রমে অংশ নিয়ে আমরা যেমন আত্মপ্রত্যয়ী হতে পারি, তেমনি অসহায় ও দুর্ঘটনাকবলিত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রশিক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব সমাজ ও দেশ গঠনে প্রেরণা পেয়ে থাকি। যা মানবিক চেতনায় গড়ে উঠতে উজ্জীবিত করে।’ ‘আমি আমার এ অর্জনের পেছনে আমার স্কুলের কাব লিডার আকতার জাহান চৌধুরী ও প্রধান শিক্ষক নাজমুন নাহার, সাবেক প্রধান শিক্ষক চাঁদ সুলতানা ও আমার নানিমা অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক রোকেয়া বেগম এবং আমার বাবা, মায়ের কাছে কৃতজ্ঞ। বলতে গেলে তাঁরাই আমাকে স্কাউট কার্যক্রমের সাথে যুক্ত থাকতে সব রকমের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন।’ যোগ করে সাদিয়া পুষ্পিতা।

জানতে চাইলে কালের কণ্ঠকে পুষ্পিতা আরো বলে, ‘আমি আগামীতে গার্লস গাইড হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে চাই। যা অর্জন করা সম্ভব হলে নিজেকে আত্মনির্ভরশীল ও মানবসেবায় নিয়োজিত করার লক্ষ্যে আমার লালিত স্বপ্ন পূরণ হবে।’ সাদিয়া জানায়, তাদের সূর্য গ্রুপের আওতায় জনস্বাস্থ্য, সাঁতার, নিরাপত্তা, পরিবেশ সংরক্ষণ, বেগুনি অধ্যায়ে সমাজসেবা, প্রাথমিক প্রতিবিধান, সাক্ষরতা, কৃষ্টি, স্বাস্থ্য সচেতনতা, শিশু অধিকার, নীল অধ্যায়ে চিত্তবিনোদন, খেলাধুলা, ক্রীড়াকুশলী, সংগ্রহ, গৃহ পরিচর্যা, আকাশি অধ্যায়ে খেলনা তৈরি, মডেল তৈরি, নকশা তৈরি, সেলাই করা চিত্রকলা, হস্তশিল্প, সবুজ অধ্যায়ে দড়ির কাজ, কম্পিউটার, সাইকেল চালনা, বই বাঁধাই, ব্যক্তিগত লাইব্রেরি, রান্না। হলুদ অধ্যায়ে কবুতর পোষা, মুরগি পালন, হাঁস পালন, কোয়েল পাখি পালন, কমলা অধ্যায়ে ফুলবাগান, সবজিচাষ বনকলা, টবে চাষ, লাল অধ্যায়ে প্রকৃতি ও পরিবেশ, পাখি পর্যবেক্ষণ, আবহাওয়া, ভূগোল, যা পরিপূর্ণভাবে অনুশীলনেই জাতীয় শাপলা কাব অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

সাদিয়ার বাবা সাংবাদিক আবদুল হাকিম রানা বলেন, ‘স্কাউট বইপত্রে সীমাবদ্ধ কোনো বিষয় নয়, এটি মূলত মুক্তাঙ্গনের শিক্ষা, যা পাঠ্যক্রমিক শিক্ষার পাশাপাশি বর্তমান মারাত্মক অবক্ষয় ও মাদকাসক্তের অভিশাপে অভিশপ্ত সমাজ ও দেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদেরকে পরিশীলিত জীবন গঠনের শিক্ষা দেয়। যা গ্রহণ করলে শিক্ষার্থীরা অবক্ষয়মুক্ত থাকার পাশাপাশি প্রকৃত দেশপ্রেমিক নাগরিক হিসেবেই গড়ে উঠবে।’ আবদুল হাকিম রানা পটিয়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ও পটিয়া মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক। এছাড়া তিনি ক্যাব পটিয়ার আহবায়ক, পটিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ব্যবস্থাপনা কমিটি ও পটিয়া শহর উন্নয়ন কমিটির সদস্য ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাথে জড়িত। তার মা জেসমিন আকতার কৃষি বিভাগে উপ সহকারী কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত আছেন। জানা যায়, স্কাউট আন্দোলনের পথিকৃৎ লর্ড ব্যাডেল পাওয়েল ১৮৯৯ সালে এর প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করেছিলেন। পরে তা বিশ্বব্যাপী দ্রুত প্রসার লাভ করে। বর্তমানে শুধু বাংলাদেশে ১৭ লাখ স্কাউট রয়েছে। এবার সরকার টার্গেট করেছে আগামী ২/৩ বছরের মধ্যে তা ২১ লাখে উন্নীত করার।

একজন স্কাউটকে জাতীয় শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড অর্জনে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করতে হয়। প্রথমে সদস্য ব্যাজ অর্জনে ৩ মাস নানা ধাপ অতিক্রম করে পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। যেমন-আপন শক্তি, চেষ্টা করি, থাকব ভাল, জানব জগত্টাকে, আনন্দ উল্লাস, আমিও পারি ও ক্যাম্পিং। এর পর তাঁরা ব্যাজ অর্জনে ৪-৬ মাস নিবিড়ভাবে অংশ নিতে হয় পরবর্তী ধাপে, যেমন, আপন শক্তি, চেষ্টা করি, থাকব ভালো, জানব জগত্টাকে, কম্পিউটার পরিচিতি, আনন্দ উল্লাস আমিও পারি। পরে গঠন হয় সূর্য গ্রুপ, রংধনু গ্রুপ ও ক্যাম্পিং। এরপর চাঁদব্যাজ অর্জনে চলে নিবিড় প্রশিক্ষণ যেমন, আপন শক্তি, চেষ্টা করি, থাকব ভালো, জানব জগত্টাকে, আনন্দ উল্লাস, আমিও পারি, সূর্য গ্রুপ, রংধনু গ্রুপ, ক্যাম্পিং। শিক্ষার্থীদেরকে তৈরি করা হয় চাঁদতাঁরা ব্যাজের জন্য। এতে তারা আবার ও ৪-৬ মাস আপন শক্তিসহ নানা শাখা প্রশাখায় প্রশিক্ষণ নিয়ে ক্যাম্পিং কার্যক্রমের মধ্যে কাব স্কাউটিং এর পুরো সময় অন্ততঃ ১টি কাব কর্নিভাল, ১টি কাব অভিযান, ২টি কাব হলিডে, ১টি স্কাউটস ও ১টি উপজেলা, জেলা, আঞ্চলিক এবং জাতীয় ক্যাম্পুরীতে অংশগ্রহণ করে নিজেদেরকে শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ডের জন্য প্রস্তুত করে থাকে। সবশেষে শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ডের জন্য চলে ৩ মাসের নিরবচ্ছিন্ন অনুশীলন। এ অনুশীলনে সাফল্য অর্জনের পরেই যেমন, সদস্য ব্যাজ, তাঁরা ব্যাজ, চাঁদ ব্যাজ, চাঁদ তাঁরা ব্যাজ, প্রাপ্তরাই শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ডসহ ১১টি ব্যাজ অর্জন করে।

পটিয়া শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাব লিডার ও স্কাউট শিক্ষক আকতার বেগম বলেন, ‘আমি সত্যিই আনন্দিত। আমার প্রশিক্ষণে সাদিয়া জাতীয় শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। আমি মনে করি তার এ অর্জন তাকে যেমন আত্মপ্রত্যয়ী করবে। তেমনি দেশ সমাজ ও মানবতার প্রতি তাকে অনেক বেশি দায়বদ্ধ করবে।’

শশাংকমালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি বিমল মিত্র বলেন, ‘আমার বিদ্যালয় থেকে জাতীয় শাপলা কাব পেয়ে সাদিয়া আমাদেরকে গৌরবান্বিত করেছে। আমি এ জন্য তাকে সাধুবাদ জানাই ও তার মঙ্গল কামনা করি। পটিয়া স্কাউটের সম্পাদক পীযুষ কুমার দাশ বলেন, ‘সাদিয়ার এ অর্জন পটিয়াবাসীকে গর্বিত করেছে। আমি তার সাফল্য কামনা করি।’

চট্টগ্রাম জেলা স্কাউটের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুল হক বলেন, ‘স্কাউট আন্দোলনকে বেগবান করতে সারা দেশের ন্যায় চট্টগ্রামের সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্কাউট দল গঠন করা হয়েছে। এখানে যে কার্যক্রমগুলো চলছে তার স্বীকৃতি হচ্ছে জাতীয় শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড। আমরা আশা করবো যারা এ পদক পেয়েছে তারা যেন এতটুকুতেই থমকে না দাঁড়ায়। পরবর্তীতে গার্লস গাইডে অন্তর্ভুক্ত হয়ে নিজেদেরকে আরো মেলে ধরে দেশ ও সমাজে অবদান রাখার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করে।’ পটিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বাংলাদেশ স্কাউট পটিয়া উপজেলা শাখার সভাপতি মো. রাসেলুল কাদের বলেন, ‘স্কাউট শিক্ষার্থীদেরকে যেমন আত্মনির্ভরশীল হতে প্রেরণা জোগায় তেমনি মানবতাবাদী হওয়ার ক্ষেত্রেও প্রেরণা জোগায়। আমি প্রশিক্ষিত সমাজের জন্য স্কাউট আন্দোলনকে বেগবান করার জন্য পটিয়ায় এ কার্যক্রমের পরিধি বাড়াতে সকল স্কুলে ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছি। আমি আশা করি আগামীতে পটিয়া থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক স্কাউট শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড লাভ করবে।’

পটিয়া পৌরসভার মেয়র অধ্যাপক হারুনুর রশীদ বলেন, ‘সাদিয়া এ বয়সে জাতীয় শাপলা কাব পেয়ে আমাদের গর্বিত করেছে। আমরা আশাবাদী সে আগামীতেও কঠোর অনুশীলন ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজের মাঝে লুকায়িত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে কাজ করবে।’ পটিয়ার সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আন্তর্জাতিভাবে মাদার অব হিউমিনিটি হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত জাতির পিতার কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী প্রতিবছর জাতীয় শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড বিতরণ করে থাকেন। এবারও তিনি গণভবনে এ পদক বিতরণ করেন। আমি পটিয়ার মেয়ে সাদিয়া এ জাতীয় শাপলা কাব অ্যাওয়ার্ড পাওয়ায় তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমার বিশ্বাস সাদিয়ার এ অর্জন তাকে দেশপ্রেমিক ও মানবতাবাদী নাগরিক হতে অনুপ্রেরণা জোগাবে।’



মন্তব্য