kalerkantho


চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে মৃত্যুফাঁদ!

জাহেদুল আলম, রাউজান (চট্টগ্রাম)   

৮ আগস্ট, ২০১৮ ০০:০০



চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে মৃত্যুফাঁদ!

চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কের রাউজান অংশ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এই জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কের চট্টগ্রাম প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) গেটের সামনে থেকে মদুনাঘাট বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার সড়ক খানাখন্দে ভরে গেছে। এতে যান চলাচলে বাড়ছে সীমাহীন জনদুর্ভোগ। প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা, হচ্ছে সময়ের অপচয়, নষ্ট হচ্ছে গাড়ির যন্ত্রাংশ, যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া, গাড়ির ঝাঁকুনিতে পথেই মারা যাচ্ছে রোগী, প্রসূতি মা গাড়িতে করছে সন্তান প্রসব। এই সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী রাঙ্গুনিয়া, রাউজান, হাটহাজারী, পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, কাপ্তাইসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের প্রায় অর্ধকোটি মানুষ প্রতিনিয়ত ভোগ করছে এই নারকীয় যন্ত্রণা। এই জনদুর্ভোগ সৃষ্টির জন্য ওয়াসা কর্তৃপক্ষের অবহেলাকে দায়ী করেছে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ।

জানা যায়, চট্টগ্রাম ওয়াসার ‘শেখ হাসিনা পানি শোধনাগার’ প্রকল্পের পাইপলাইন সংস্থাপনের জন্য চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়কে অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি, কাজের দীর্ঘসূত্রতা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়সারা মনোভাবের কারণে রাঙ্গুনিয়ার গোডাউন হতে মোহরা রাস্তার মাথা পর্যন্ত প্রায় ২৬ কিলোমিটার সড়কজুড়ে অগণিত খানাখন্দকে বিপর্যস্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে ওঠেছিল। গত বছরের নভেম্বরের রাউজান-

রাঙ্গুনিয়াবাসী অতি দুর্ভোগে অতিষ্ঠ হয়ে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল। ওই সময় আন্দোলনকারীরা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফয়জুল্লাহ ও প্রকল্প প্রধান ইয়াকুব সিরাজদৌল্লাহর পদত্যাগ ও রাস্তা সংস্কারের দাবিতে সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন ও ওয়াসা অফিস ঘেরাওয়ের আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। তখন ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জনরোষে পড়ে সড়ক সংস্কারের কাজ শুরু করলেও অদৃশ্য কারণে রাউজান অংশে কাজ বন্ধ রাখে। এতে ধীরে ধীরে সড়কটিতে খানাখন্দক বেড়েই চলেছে। ফলে প্রতিনিয়ত মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে যাত্রীসাধারণ গন্তব্যের পানে ছুটে চলছে। বিগত ছয় বছর যাবৎ ওয়াসার পাইপলাইন সংস্থাপন কাপ্তাই সড়কে যাতায়াতকারীদের দুঃখে পরিণত হয়েছে।

সড়কটি সংস্কারের বিষয়ে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ, চট্টগ্রাম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জুলফিকার আহমেদ বলেন, ‘আমি নিজে পরিদর্শন করেছি, সড়কটির পাহাড়তলী, নোয়াপাড়াসহ বিভিন্ন অংশে বেহাল দশা। মানুষের চলাচলের উপযোগী নয়। ২০১৩ সাল হতে চুক্তি অনুযায়ী সড়কটি সম্পূর্ণ দায়ভার এককভাবে ওয়াসা কর্তৃপক্ষের। তাদের দায়সারা কাজের কারণে এই জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। তাদের বারবার চিঠি দিলেও তারা এতে কোনো কর্ণপাত করে না। সর্বশেষ ২০-২৫ দিনে পূর্বেও সড়কটি সংস্কারের ব্যাপারে চিঠি দেওয়া হয়েছিল।’

২৩ জুলাই সরেজমিন দেখা যায়, মদুনাঘাট বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র হতে হয়ে চট্টগ্রাম প্রযুক্তি ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট) এর গেট পর্যন্ত সড়কটি যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। সড়কের পশ্চিম হতে মদুনাঘাট, জিয়াবাজার, বৈজ্জ্যাখালী, মিয়ারঘাটা, নোয়াপাড়া সিএনজি স্টেশন, নোয়াপাড়া কলেজ, আমেনা বশর বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্র, পথেরহাট, মিয়া মার্কেট, ব্রাহ্মণহাট, কালুমরার টেক, ধরের টেক, গশ্চি নয়াহাট, দমদমা, রাউজান পিংক সিটি-২, পাহাড়তলী বাজারের রাউজান-রাঙ্গুনিয়া সার্কেল কার্যালয় চুয়েট পর্যন্ত সড়কটি অগণিত খানাখন্দকে পরিপূর্ণ। বিশেষে করে পাহাড়তলী বাজারের পশ্চিম হতে চুয়েট পর্যন্ত ছোট ছোট একাধিক গর্ত ছাড়াও ডোবা সদৃশ প্রায় ১৫টি গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব গর্ত যেন  একেকটা মৃত্যুকূপ। এই অংশগুলোতে বিটুমিনের অস্তিত্বও নেই। বৃষ্টির পানিতে সড়কটি কাদা-পানিতে একাকার হয়ে যায়। হেঁটে চলার উপায় নেই। এমনকি গাড়ি চলাচলে বেশ বিঘ্ন ঘটছে। যাত্রীসহ গাড়ি হেলেদুলে চলছে। যাত্রীরা দুর্ভোগ সহ্য করতে না পেরে গালমন্দ করছে। এছাড়া সড়কের দক্ষিণাংশে পাইপ সঞ্চালনের পর দায়সারা ইট সলিং করে দীর্ঘ সময় ফেলে রাখার ফলে দেবে গিয়ে উঁচু-নিচু হয়ে বিভিন্ন স্থানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের এই অংশটি গাড়ি চলাচলের উপযোগী না হওয়ায় চালকেরা তুলনামূলক ভালো অংশে গাড়ি চলাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার সম্মুখীন হচ্ছে।

চট্টগ্রাম-কাপ্তাই সড়ক দিয়ে নিয়মিত যাতায়াতকারী রাঙ্গুনিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আলী শাহ বলেন, ‘ওয়াসা প্রকল্পটি চট্টগ্রামের ব্যাপক জনগোষ্ঠীর জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদ। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, ওয়াসা কর্তৃপক্ষের শামুক গতিতে কাজের কারণে দীর্ঘ চার-পাঁচ বছর ধরে মানুষ অত্যন্ত অমানবিক কষ্ট ভোগ করছে। রাস্তাটি সংস্কারের জন্য আমরা ২০১৭ সালের শেষের দিকে একাধিক সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, ওয়াসা কার্যালয় ঘেরাওর আল্টিমেটামসহ নানা কর্মসূচি গ্রহণের মাধ্যমে ওয়াসার বিরুদ্ধে সোচ্চার হই। এতে ওয়াসা কর্তৃপক্ষ জনরোষের চাপে পড়ে রাস্তা কিছুটা সংস্কার করলেও এখন বাজার এলাকা ও সড়কের একপাশ কোথাও দুপাশ বেহালদশায় ফেলে রেখেছে, যা চলাচলের অনুপযোগী। দেখে মনে হয় রাস্তার কোনো অভিভাবক নেই। এটা তাদের গাফিলতি বৈ কিছু নয়। ওয়াসা আন্তরিক হলে ১৫ দিনের মধ্যে কাপ্তাই সড়ক পুনঃসংস্কার হতে পারে। সামনে আমাদের নির্বাচন। এই নির্বাচনকে সামনে রেখে ওয়াসার মাঝে ঘাপটি মেরে থাকা স্বাধীনতাবিরোধী বিএনপি-জামায়াতপন্থী কর্মকর্তারা এই অঞ্চলে সরকারের অভূতপূর্ব উন্নয়নকে জনগণের চোখ হতে আড়াল করার অপচেষ্টায় দায়সারাভাবে কাজ করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছে। শিগগিরই কাজ শুরু না করলে আবার কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।’

এ ব্যাপারে ওয়াসার প্রকল্প পরিচালক ইয়াকুব সিরাজদৌল্লাহ বলেন, ‘আমাদের পাইপলাইন স্থাপনের কাজ হয়ে গেছে দুই একটা ক্রচিং এর কাজ চলছে। অল্প সময়ের মধ্যে শেষ হবে। এ ছাড়া বৃষ্টির জন্য সংস্কারের কাজ বিঘ্ন ঘটছে। আর পাহাড়তলীতে সওজর ড্রেন নির্মাণের কাজ বুঝিয়ে দিলে আমরা কাজ শুরু করব।’

পাহাড়তলী বাজারে সওজর ড্রেন নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাশেম কনস্ট্রাকশনের পরিচালক ও স্থানীয় চেয়ারম্যান রোকন উদ্দিন বলেন, গত ৮ মে আমরা ড্রেনের কাজ ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে বুঝিয়ে দিয়েছি। তাদের গাফিলতির কারণে মানুষ সীমাহীন কষ্ট ভোগ করছে। গাড়ির ঝাঁকুনির কারণে কয়েকদিন আগে একজন প্রসূতি সন্তান প্রসব করেছেন। এর মধ্যে অনেক ছোটখাটো দুর্ঘটনাও ঘটেছে।

উল্লেখ্য, হাটহাজারী, রাউজান এবং রাঙ্গুনিয়ার দক্ষিণাংশ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর চট্টগ্রাম শহরের সাথে যোগাযোগেরও একমাত্র পথ কাপ্তাই সড়ক। এছাড়া, কাপ্তাই, রাজস্থলী ও বিলাইছড়ি জনগোষ্ঠীর চট্টগ্রাম শহরে যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম এই সড়ক। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, জীবতলী সেনাক্যাম্প, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর শহীদ মোয়াজ্জম ঘাঁটি, বিজিবির কাপ্তাই ঘাঁটি, রাউজান তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, কর্ণফুলী পেপার মিল, কর্ণফুলী জুট মিল, ফোরাত কার্পেট মিল, ইস্টার্ন ক্যামিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ, কোদালা চা বাগান, রাঙ্গুনিয়া শেখ রাসেল এভিয়ারি পার্ক, জুম রেস্তোরাঁ ছাড়াও অসংখ্য পর্যটন কেন্দ্রে যাতায়াতের একমাত্র পথ এটি। যা ওয়াসার অপরিকল্পিত, অবহেলা ও কাজের দীর্ঘসূত্রতার কারণে খানা খন্দকে বিধ্বস্ত হয়ে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।



মন্তব্য