kalerkantho


বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে এশিয়াটিক কালো ভালুক প্রজনন

মৌসুমি-পূর্ণিমার তিন বাচ্চা

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মৌসুমি-পূর্ণিমার তিন বাচ্চা

... চকরিয়ায় বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের পুরুষ ভালুক জ্যাকবনের দুই স্ত্রী মৌসুমি ও পূর্ণিমা। সম্প্রতি জ্যাকবন-মৌসুমি-পূর্ণিমার সংসারে জন্ম নিয়েছে তিন বাচ্চা। তবে বয়স ছয় মাস হওয়ার আগে এগুলোর লিঙ্গ নির্ধারণ করা যাবে না বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা ...

 

এশিয়াটিক ব্ল্যাক বিয়ার বা কালো ভালুক জুটি জ্যাকবন-মৌসুমি-পূর্ণিমার সংসারে জন্ম নেওয়া তিন বাচ্চা আলো ছড়াবে কক্সবাজারের চকরিয়ার বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কে। বিপদাপন্নের ঝুঁকিতে থাকা এই প্রজাতির ভালুক বর্তমানে গহিন জঙ্গলে দেখা মেলে কম। তাই সাফারি পার্কের আবদ্ধ পরিবেশে জন্ম নেওয়া এই তিন শাবককে বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা চালাচ্ছে পার্ক কর্তৃপক্ষ।

পার্ক কর্তৃপক্ষ জানায়, আবদ্ধ অবস্থায় সচরাচর বাচ্চা প্রসব করতে পারে না এশিয়াটিক ব্ল্যাক বিয়ার তথা কালো ভালুক। তবে আবদ্ধ অবস্থার মধ্যেও আবাসস্থলের কাছে মাটির সংস্পর্শে থাকলে গত খুঁড়ে সেখানে বাচ্চা প্রসব করে স্ত্রী ভালুক।

আর সেই সুযোগ হাতছাড়া করেনি সাফারি পার্কের পুরুষ ভালুক জ্যাকবনের দুই স্ত্রী মৌসুমি ও পূর্ণিমা। দুই মাস আগে দ্বিতীয়বারের মতো জন্ম নিয়েছে জ্যাকবন ও মৌসুমি-পূর্ণিমার সংসারে তিন বাচ্চা। যা সাফারি পার্ক তথা দেশি-বিদেশি পর্যটক-দর্শনার্থীদের জন্য একেবারেই সুখবর এবং বিরল ঘটনা। তবে বয়স আনুমানিক ছয় মাস না হওয়ায় এখনো পর্যন্ত লিঙ্গ নির্ধারণ করতে পারেনি পার্ক কর্তৃপক্ষ।

সম্প্রতি সাফারি পার্কের ভালুক বেষ্টনীর জ্যাকবন ও মৌসুমি-পূর্ণিমার খাঁচার কাছে গিয়ে দেখা গেছে, জ্যাকবনকে আলাদা খাঁচায় রাখা হয়েছে। আর দুই পাশে মৌসুমির ঘরে জন্ম নেওয়া দুই বাচ্চা ও পূর্ণিমা একটি বাচ্চাকে গর্তের ভেতর দুধ খাওয়াচ্ছে। সচক্ষে দেখা না গেলেও গর্তের ভেতর থেকে একটু একটু শব্দ বেরুচ্ছে দুধ খাওয়ানোর। এ সময় মৌসুমি ও পূর্ণিমা মানুষের গন্ধ পেয়ে গর্ত থেকে একবার বেরুচ্ছে আবার ঢুকে পড়ছে। এই অবস্থায় বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করেও বাচ্চার ছবি তোলা যায়নি। তবে আরো কিছুদিন পরে কৌশলে ছবি সংগ্রহ করা হয় ভালুকের তিন ছানার।

সাফারি পার্ক সূত্র জানায়, মৌসুমি ও পূর্ণিমার ঘরে জন্ম নেওয়া তিন বাচ্চার মধ্যে পূর্ণিমার ঘরে জন্ম নেওয়া বাচ্চাটিকে মা তেমন দুধ খাওয়াতে পারছিল না। পার্ক সংশ্লিষ্টদের তীক্ষ্ন পর্যবেক্ষণে বিষয়টি ধরা পড়ে। এর পর মায়ের কাছ থেকে বাচ্চাটিকে আলাদা করে ফেলা হয় এবং অন্তত ১৫ দিন আগে বাচ্চাটিকে নিয়ে যাওয়া হয় পার্কের বন্যপ্রাণী হাসপাতালের কোয়ারেন্টাইন শেডে। সেখানে পার্কের কর্মচারী দিদারুল আলমের তত্ত্বাবধানে দুই ঘণ্টা পর পর তোলা দুধ খাইয়ে বড় করে তোলা হচ্ছে দুই মাস বয়সের বাচ্চাটিকে। ছয়মাস পর্যন্ত এভাবে পার্কের কোয়ারেন্টাইন শেডে দুধ খেয়ে বেড়ে উঠবে ভালুকের এই শাবক।

মায়ের মমতা ও অধিকতর যত্ন-আত্তি দিয়ে বাচ্চাটিকে বড় করে তোলার দায়িত্বরত পার্কের কর্মচারী দিদারুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি এই পার্কে যেদিন থেকে কর্মরত আছি, সেইদিন থেকে একটার পর একটা প্রাণী আমার সংস্পর্শ পেয়েছে। সর্বশেষ এশিয়াটিক ব্ল্যাক বিয়ার তথা কালো ভালুকের এই বাচ্চাটিকে প্রতি দুই ঘণ্টা পর পর দুধ খাইয়ে মায়ের মমতা দিয়ে বড় করে তুলছি। এর আগেও সিংহশাবক, বাঘশাবককে একই পন্থায় বড় করে তুলেছি।’ তিনি আরো বলেন, ‘ইতোপূর্বে পার্কের সিংহের বেষ্টনীতে মায়ের আক্রোশের মুখে পড়ে কয়েকটি বাচ্চা। সেসব বাচ্চাকে মায়ের মমতা দিয়ে লালন করে বড় করে তুলেছি। সেই সিংহের বাচ্চা যখন একটু একটু হিংস্র হয়ে উঠছিল তখন পর্যন্ত আমাকে একটা আঁচড়ও দেয়নি। কিন্তু অন্য মানুষ দেখলেই সেই বাচ্চা হিংস্র হয়ে হুঙ্কার দেওয়া শুরু করেছিল। একইভাবে ঢাকায় র‌্যাব কর্তৃক উদ্ধার করে এখানে পাঠানো তিন শাবক জয়, জুঁই ও জ্যোতিকেও লালন করে বড় করেছি। এখন তারাও প্রজনন করছে।’

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের অন্যতম উদ্যোক্তা এবং বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সাবেক প্রধান কর্মকর্তা বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. তপন কুমার দে কালের কণ্ঠকে জানান, এশিয়াটিক ব্ল্যাক বিয়ার তথা কালো ভালুক বর্তমানে বিপদাপন্ন অবস্থায় রয়েছে। এরা নিশাচর ও একাকী জীবন-যাপনে অভ্যস্ত। মূলত জঙ্গলাকীর্ণ খাড়া পাহাড়ই এদের অন্যতম আবাসস্থল।

তিনি আরো জানান, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেটের পাহাড়ি বনাঞ্চলে মাঝে-মধ্যে এদের দেখা মেলে। এরা দেখতে কুচকুচে কালো বর্ণের এবং দেহের বুকের অংশে ভি আকৃতির দাগ রয়েছে। উচ্চতায় চার থেকে ছয় দশমিক পাঁচ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। আর ওজন ৬ মাস পরবর্তী সর্বনিম্ন ৫০ কেজি থেকে সর্বোচ্চ ২৮০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। খাদ্যাভ্যাসে এই প্রজাতির ভালুক সর্বভূক।

বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের ভেটেরিনারি সার্জন (বন্যপ্রাণী চিকিৎসক) মো. মোস্তাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, জ্যাকবন ও মৌসুমি-পূর্ণিমার সংসারে জন্ম নেওয়া তিন বাচ্চাই বর্তমানে সুস্থ রয়েছে। তবে মা পূর্ণিমা তার বাচ্চাটিকে জন্মের দেড় মাসের মাথায় তেমন দুধ না খাওয়ানোতে দুর্বল হয়ে পড়ছিল বাচ্চাটি। তিনি আরো জানান, তাই বাচ্চাটিকে ১৫ দিন আগে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে নিয়ে আসা হয় হাসপাতালে। সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে বাচ্চাটিকে বড় করে তোলা হচ্ছে। হ্যান্ড রেয়ারিং পদ্ধতি তথা হাতে তোলা খাবারের অংশ হিসেবে ল্যাকটোজেন-১ দুধ খাওয়ানো হচ্ছে। এর পরেও মা যাতে প্রচুর পরিমাণে দুধ দিতে পারে সেজন্য অতিরিক্ত খাবার দেওয়া হচ্ছে পূর্ণিমাকেও। জন্মের সময় একেকটি বাচ্চা ৫০০ গ্রাম থেকে ৬০০ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে-যোগ করেন তিনি।

পার্কের কর্মকর্তা মো. মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী জানান, বিপদাপন্ন প্রাণীর তালিকায় থাকা এশিয়াটিক ব্ল্যাক বিয়ারের আবদ্ধ অবস্থায় প্রজনন সাফারি পার্কের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। কেননা আবদ্ধ অবস্থায় থাকার কারণে ঢাকা চিড়িয়াখানায় ভালুকের প্রজনন হয় না। সেখানে এই সাফারি পার্কের ভালুক বেষ্টনীর কাছে মাটির সংস্পর্শে থাকায় প্রজননের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। সেই টিলা মাটির ভেতর গর্ত খুঁড়ে ভালুক বাচ্চা প্রসব করে থাকে। এখানেও সেই সুযোগ পেয়ে হাতছাড়া করেনি জ্যাকবন ও মৌসুমি-পূর্ণিমা জুটি। তন্মধ্যে মৌসুমির ঘরে দুটি বাচ্চা এবং পূর্ণিমার ঘরে জন্ম নেয় একটি বাচ্চা। 

মাজহারুল আরো জানান, একটি প্রাপ্তবয়স্ক ভালুক প্রতিদিন আড়াই কেজি করে খাবার খেয়ে থাকে। তন্মধ্যে মধু, পাউরুটি, শসা, ডিম, কলা, মিষ্টি লাউ, গাজর অন্যতম। তিনি বলেন, ‘এর আগেও একবার এই প্রজাতির ভালুকের প্রজনন হয়েছিল পার্কে।’

চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা এবং বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্কের প্রকল্প পরিচালক এস এম গোলাম মওলা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দিন দিন এই পার্ক বন্যপ্রাণী সমৃদ্ধ পার্কে পরিণত হতে চলেছে। শুধু তাই নয় আগেও এই পার্কটি সিংহ, বাঘ, ওয়াইল্ডবিস্ট, জলহস্তী, হরিণসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর যথেষ্ট প্রজনন হয়েছে। সর্বশেষ প্রজনন হল বিপদাপন্নের ঝুঁকিতে থাকা এশিয়াটিক ব্ল্যাক বিয়ার প্রজাতির তিনটি বাচ্চা। যা আবদ্ধ অবস্থা সাফারি পার্কের ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা।’

এই কর্মকর্তা আরো জানান, পার্কে ভালুক আবদ্ধ অবস্থায় থাকলেও যখন সন্তান প্রসব করার সময় আসে তখন নিজেরাই খাঁচার কাছে বেষ্টনীর ভেতর টিলা শ্রেণির মাটির নিচে এক ধরনের ডেন (উঊঘ) তথা গর্ত খুঁড়ে লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। আর সেখানেই বাচ্চা প্রসব করে এবং

তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে রাখে বাচ্চাদের। যাতে কোনো মানুষের নজর না পড়ে।

 



মন্তব্য