kalerkantho


রোহিঙ্গাদের চাল নিয়ে ‘চালবাজি’

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



রোহিঙ্গাদের চাল নিয়ে ‘চালবাজি’

কক্সবাজারের টেকনাফ-উখিয়ায় আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মাঝে চাল বিতরণ নিয়ে ‘চালবাজি’র অভিযোগ পুরনো। শুরু থেকেই দেওয়া হয়েছে নির্ধারিত পরিমাণের কম চাল। পরবর্তীতে এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ভেজাল অর্থাৎ পচা চালের মিশ্রণ। সর্বশেষ চালের বস্তায় মিলেছে ভূষি, পচা চাল ও তুঁষ। বিস্তারিত জানাচ্ছেন : তোফায়েল আহমদ, কক্সবাজার

 

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি) সূত্রে জানা গেছে, রোহিঙ্গা শিবিরে ১-৩ সদস্যের পরিবারে প্রতিমাসে ৩০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়। এছাড়া মাসে ৯ কেজি ডাল ও ৩ কেজি করে সয়াবিন তেল দেওয়া হয়।  অনুরূপভাবে রোহিঙ্গাদের ৪ থেকে ৭ সদস্যের পরিবারে দেওয়া হয় মাসে ৬০ কেজি চাল, ১৮ কেজি ডাল ও ৬ কেজি তেল। আবার ৮ এর অধিক সদস্যের পরিবারে দেওয়া হয় মাসে ১২০ কেজি চাল, ২৭ কেজি ডাল ও ১২ কেজি তেল। সেই সঙ্গে জ্বালানিসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য দেয় আন্তর্জাতিক নানা সংস্থা।

সর্বশেষ তথ্য মতে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মোট এক লাখ ৮৩ হাজার পরিবারের মাঝে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়। এ পর্যন্ত ১১ রাউন্ড খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে। অভিযোগ ওঠেছে, প্রতিরাউন্ডে চাল বিতরণের সময় রোহিঙ্গাদের চাল কম দেওয়া হয়। এভাবে প্রতিরাউন্ডে যদি প্রতি পরিবারে ২ কেজি করে চাল কম দেওয়া হয় তাহলে এক লাখ ৮০ হাজার পরিবারে কম দেওয়া হয় ৩ লাখ ৬৬ হাজার কেজি অর্থাৎ ৩৬৬ মেট্রিক টন চাল।

চালের সরকারি মূল্য হচ্ছে প্রতিকেজি ৩৯ টাকা। সেই হিসাবে ৩ লাখ ৬৬ হাজার কেজি চালের মূল্য এক কোটি ৪২ লাখ ৭৪ হাজার টাকার চাল কম দেওয়া হয় প্রতিরাউন্ডে। সেই হিসাবে ১১ রাউন্ডে এ পর্যন্ত ১৫ কোটি ৭০ লাখ টাকার চাল কম দেওয়া হয়েছে।

এদিকে রোহিঙ্গা শিবিরে ব্যাপক, অনিয়ম, দুর্নীতি ও ভেজাল চাল সরবরাহ নিয়ে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে কালের কণ্ঠের দ্বিতীয় রাজধানী প্রতিদিনে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। এর জের ধরে কক্সবাজারে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডাব্লিউএফপি) কর্মকর্তারা ঘটনার সরেজমিন তদন্ত শুরু করেছেন। গত রবিবার বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ঢাকার প্রধান অফিস থেকে কর্মকর্তারা কক্সবাজারে এসে বিভিন্ন খাদ্যগুদাম পরিদর্শন কাজ শুরু করেন।

রোহিঙ্গা শিবিরে চাল সরবরাহে অনিয়মের ব্যাপারে প্রথম থেকেই অভিযোগ ওঠেছে খাদ্য বিভাগের বিরুদ্ধে। সরকারের খাদ্য বিভাগের চাল সরবরাহের চুক্তি রয়েছে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সঙ্গে। প্রথমাবস্থায় সরকার ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা চাল সরবরাহ দেয় রোহিঙ্গাদের। এ সময় চট্টগ্রামের খাদ্যগুদাম থেকে কক্সবাজারের খাদ্যগুদামে রোহিঙ্গাদের চাল সরবরাহ দিতে গিয়ে ভয়াল জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়। ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা চাল বেশ উন্নতমানের। এসব চালের কেজিপ্রতি দামও ৫০ টাকার বেশি। এ সময় খাদ্য বিভাগের নিয়োজিত ঠিকাদাররা খাদ্য বিভাগেরই কর্মকর্তাদের যোগসাজশে বাইরের বাজার থেকে অনেক কম দামের নিম্নমানের চাল কিনে সরবরাহ দেয়। বাইরের বাজার থেকে কম দামে সরবরাহ দেওয়া সমপরিমাণ চাল খাদ্য গুদাম থেকে বেশি দামে বাইরের বাজারে বিক্রি করে দিয়ে ঠিকাদার ও খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা ভাগাভাগি করেন।

এ ধরনের অভিযোগের প্রমাণ মিলেছে গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০ টনের চাল বোঝাই একটি ট্রাক আটকের পর। চট্টগ্রাম খাদ্য বিভাগ নিয়োজিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান আসাদ ট্রেডিং বাইরের বাজার থেকে নিম্নমানের কম দামের চাল এবং পচা চাল মিশিয়ে ওই পরিমাণ চালের ট্রাক কক্সবাজার কস্তুরাঘাট খাদ্যগুদামে পাঠিয়েছিল। সন্ধ্যার পর কক্সবাজার শহরে পণ্যবাহী ট্রাক ঢুকতে ট্রাফিক পুলিশকে ৫০০ টাকা দিতে হয়। তাই চাল বোঝাই ট্রাকের চালক পুলিশকে ৫০০ টাকা দেওয়া থেকে রেহাই পেতে ট্রাকটি কক্সবাজার সদর উপজেলা পরিষদ ভবন সংলগ্ন খাদ্য গুদামের সামনে রাখেন।

গোপন সূত্রে ভেজাল চাল আসার সংবাদ পেয়ে ওই দিন সন্ধ্যায় অভিযান চালিয়ে কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নোমান হোসেন প্রিন্স ট্রাকটি জব্দ করেন।

এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমার বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয়েছে, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডাব্লিউএফপি) লোগো সম্বলিত বস্তায় ভেজাল চাল কি করে থাকে! আটক করা ট্রাকের কয়েকটি বস্তা খুলেই আমি হতবাক। সব কটি বস্তায় পচা চাল!’

ইউএনও জানান, ভেজাল চালের ট্রাক আটকের পর কক্সবাজার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে এগুলো খাদ্য বিভাগের নয় বলে জানান। পরে চট্টগ্রাম আঞ্চলিক খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তা কক্সবাজারে আসার পরই স্থানীয় খাদ্য বিভাগ স্বীকার করে আটক চাল খাদ্য বিভাগেরই।

রোহিঙ্গা শিবিরে চাল সরবরাহে ‘চালবাজি’র ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে আন্তর্জাতিক সংস্থা ডাব্লিউএফপির এদেশীয় কতিপয় কর্মকর্তার বিতর্কিত ভূমিকা। এ কারণে চাল সরবরাহের কাজে নিয়োজিত সংস্থাটির বিতর্কিত কর্মকর্তারা সংবাদকর্মীদের এড়িয়ে চলেন। সংস্থাটির লজিস্টিক সাপোর্টে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের কাছে চালের বিষয়েও কোনো তথ্য জানতে চাইলে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহারেরও অভিযোগ রয়েছে। লজিস্টিক সাপোর্টের সঙ্গে জড়িত সংস্থাটির কর্মকর্তা এস কে হাসানের বিরুদ্ধেও রয়েছে এন্তার অভিযোগ।

জানা গেছে, সরকারি খাদ্যগুদামে ৫০ কেজির বস্তা থেকে যখন ৩০ কেজির বস্তা করা হয় তখনই মাপে কম দেওয়া হয়। কক্সবাজার কস্তুরাঘাট খাদ্যগুদামে এ প্রতিবেদক একাধিকবার গিয়ে ৩০ কেজির বস্তায় ২/১ কেজি চাল কম পেয়েছেন। বিষয়টি খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে অনেকবার অবহিত করার পরও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।

রোহিঙ্গা শিবিরে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির চাল বিতরণের সময় ২৫ কেজির বস্তায় ২২/২৩ কেজি এবং ৩০ কেজির বস্তায় ২৮/২৯ কেজি পাওয়ার কথা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নিকারুজ্জামান। তিনি জানান, একাধিকবার রোহিঙ্গা শিবিরে চাল বিতরণ কেন্দ্রে গিয়ে তিনি রোহিঙ্গাদের চালের বস্তা নিজ উদ্যোগে মেপে দেখেছেন। প্রায় প্রতিটি বস্তায় চালের পরিমাণ কম পাওয়া গেছে।

রোহিঙ্গা শিবিরে চাল সরবরাহ করা হয়ে থাকে কক্সবাজারের কস্তুরাঘাট, উখিয়া ও টেকনাফ খাদ্যগুদাম থেকে। এসব গুদাম থেকে শিবিরে খাদ্য পরিবহনের দায়িত্বে রয়েছে বেসরকারি সংস্থা (এনজিও) সেভ দ্য চিলড্রেন, রিক, মুক্তি, শেট ও ইপসা। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সঙ্গে চুক্তি মতে এনজিওগুলো এ দায়িত্ব পালন করছে।

সর্বশেষ গত শনিবার কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুলের ফকিরপাড়ার একটি গুদামে অভিযান চালিয়ে ৬ হাজার ৮০০ বস্তা পচা চাল জব্দ করা হয়। কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নোমান হোসেন প্রিন্স একদল পুলিশ নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে গুদামটিতে অভিযান পরিচালনা করেন। অভিযানে আটক করা হয় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির নিয়োজিত চাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স সমতা ট্রেডার্সের সুপারভাইজার ইকবাল হোসেনকে। ভ্রাম্যমাণ আদালত আটক সুপারভাইজারকে এক মাসের কারাদণ্ড দেন।

অভিযোগ ওঠেছে, খাদ্য বিভাগকে বাদ দিয়ে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি কর্তৃপক্ষ নিজস্ব চাল সরবরাহকারী ঠিকাদার নিয়োগ করেও ভেজাল চাল সরবরাহ থেকে নিস্তার পাচ্ছে না। উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার জন্য আরো দুজন নিয়োগ করা ঠিকাদারের বিরুদ্ধেও এমন অভিযোগ ওঠেছে।

গত রবিবার খুরুশকুলের সমতা ট্রেডিংয়ের ভাড়া নেওয়া গুদাম পরিদর্শন করে দেখা গেছে, সেখানে ৩০ কেজি ও ৫০ কেজির চালের বস্তা ছাড়াও আরো বিপুলসংখ্যক বস্তাভর্তি পচা চাল রয়েছে।

খুরুশকুল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন জসিম জানিয়েছেন, গুদামটিতে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির চাল প্যাকেটজাত করার সময় টেকনাফ ও চট্টগ্রামের বাজার থেকে নানা রকমের চাল কিনে আনা হয়। উত্তরবঙ্গ থেকে শ্রমিক এনে ভালো চালের সঙ্গে পচা চাল মিশিয়ে ৩০ কেজির চালের বস্তা ডাব্লিউএফপিকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান সমতা ট্রেডার্সেও মালিক কাউসার আলম খান বাবলু এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘বস্তাভর্তি চাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে বুঝিয়ে দেওয়া হয় ডাব্লিউএফপিকে। এখানে পচা চাল সরবরাহের কোনো সুয়োগ নেই।’

 

ভেজাল চাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে

রোহিঙ্গাদের জন্য আনা ভেজাল চাল কয়েক দফা অভিযান চালিয়ে জব্দ করেছেন কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নোমান হোসেন প্রিন্স। এ প্রসঙ্গে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মাঝে ভেজাল চাল সরবরাহ দেওয়ার বিষয়টি কিছুতেই সহ্য করা হবে না। রোহিঙ্গা শিবিরে আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডাব্লিউএফপি) চাল সরবরাহ দেওয়ার দায়িত্বে থাকলেও এ কাজে দেশেরও ভাবমূর্তির বিষয় জড়িত। তাই দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার মতো কাজ কাউকে করতে দেওয়া হবে না।’

ইউএনও জানান, ভেজাল চাল সরবরাহকারী সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করা হবে। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি ভেজাল চাল বোঝাই ২০ মেট্রিক টন চাল নিয়ে যে ট্রাক আটক করা হয়েছিল সে ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদককে জানানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। কক্সবাজার জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া রয়েছে। অপরদিকে ১০ মার্চ কক্সবাজার সদরের খুরুশকুলে আটক হওয়া ৬ হাজার ৮০০ বস্তা চালের বিষয়েও জেলা প্রশাসককে জানানো হয়েছে। জব্দ করা চালগুলো খুরুশকুল ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের জিম্মায় আছে।

 

মো. নোমান হোসেন প্রিন্স

সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, কক্সবাজার



মন্তব্য