kalerkantho


কাপ্তাইয়ে মাল্টাচাষে সাফল্য কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে

দ্বিতীয় রাজধানী ডেস্ক   

১৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



কাপ্তাইয়ে মাল্টাচাষে সাফল্য কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে

রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে গবেষণালব্ধ বারি মাল্টা-১ পাকলে বিদেশি মাল্টার মতো কমলা রঙ হয় না। এটি সবুজের ওপর সামান্য বাদামি রঙ ধারণ করে। তবে আমদানি করা মাল্টা অপেক্ষা রসালো ও সুমিষ্ট। বিদেশি মাল্টাতে টিএসএসের পরিমাণ ৬ হলেও রাইখালীতে উদ্ভাবিত মাল্টায় এর পরিমাণ ৮ বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। পুষ্টিগুণও অপেক্ষাকৃত বেশি। প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন : জিগারুল ইসলাম, রাঙ্গুনিয়া

কাপ্তাইয়ের রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে মাল্টাচাষে ব্যাপক সাফল্য এসেছে। এ সাফল্য এলাকার কৃষকদের মাঝে সৃষ্টি করেছে ব্যাপক উৎসাহ। উৎসাহী কৃষকরা মাল্টার চাষের প্রতি ঝুঁকছেন।

বাগান করে মাল্টার আবাদে লাভবান হওয়ার প্রত্যাশা জেগেছে কৃষকদের মাঝে। তাই বীজ, চারা কিংবা কলম সংগ্রহের জন্য কৃষকরা ছুটছেন রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে। কৃষকের এ আগ্রহ কাপ্তাইয়ের কৃষিক্ষেত্রে ব্যাপক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে।

বিদেশি রসালো ফল মাল্টার দেশীয় চাহিদার সিংহভাগই নির্ভর করে আমদানির ওপর। এ অঞ্চলে মাল্টার উৎপাদনে আমদানি নির্ভরতা কমবে বলে কৃষিবিজ্ঞানীরা মত প্রকাশ করেন। অভিযোগ রয়েছে, বিদেশ থেকে আমদানি করা মাল্টায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে পচন রোধে রাসায়নিক দ্রব্য ফরমালিনও ব্যবহার করা হয়। যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকারক।

পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে উদ্ভাবিত মাল্টার আবাদে ব্যাপক সাফল্যের প্রত্যাশা কৃষি বিজ্ঞানীদের। এ সাফল্যে স্থানীয়ভাবে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ প্রাকৃতিক উপায়ে পাকা তাজা মাল্টা ফলের প্রাপ্তিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। মাল্টা ফলের চাহিদানুযায়ী উল্লেখযোগ্য পরিমাণ যোগান দেয়া যাবে।

রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে গবেষণালব্ধ বারি মাল্টা-১ পাকলে আমদানিকৃত মাল্টার মতো কমলা রং হয় না। এটি সবুজের ওপর সামান্য বাদামি রঙ ধারণ করে। তবে আমদানিকৃত বিদেশি মাল্টা অপেক্ষা রসালো ও সুমিষ্ট হয় এগুলো। মিষ্টির ক্ষেত্রে বিদেশি মাল্টাতে টিএসএস এর পরিমাণ ৬ হলেও রাইখালীতে উদ্ভাবিত মাল্টাতে টিএসএসের পরিমাণ ৮ বলে জানিয়েছেন কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা। পুষ্টিগুণও অপেক্ষাকৃত বেশি। রুচিপূর্ণ এই জাতের মাল্টা এখন বাজার দখল করতে যাচ্ছে।

এই বছর গবেষণা কেন্দ্রে ২০০টি গাছে প্রায় ৬০ হাজারটি মাল্টা ধরেছে। ৫-৬টি মাল্টাতে ১ কেজি হয়। স্থানীয়ভাবে এসব মাল্টা মাত্র ৫০ টাকা কেজিতে বিক্রি করা হচ্ছে। অথচ বিদেশি মাল্টা ১৫০ টাকা কেজি। এতে কাপ্তাইয়ের কৃষি এবং কৃষকের আর্থিক সমৃদ্ধির পথে গতি সঞ্চার করছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, গবেষণা কেন্দ্রের মাঠে মাল্টা ফলের দৃষ্টিনন্দন বাগান। অন্য বৃক্ষের নিচে ছায়াযুক্ত মাটিতেও মাল্টার প্রচুর ফলন হয়। রাইখালী পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে গবেষণালব্ধ এই সাফল্যের হাত ধরে কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে মাল্টার আবাদ সাড়া জাগিয়েছে। এতে বিদেশি রসালো ফল মাল্টার আবাদে কাপ্তাইয়ের পাহাড়ে বিপ্লব ঘটানোর সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।

কাপ্তাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তারিকুল আলম বলেন, ‘কাপ্তাইয়ে হলুদ বর্ণের মাল্টার জাত উদ্ভাবন প্রকৃতই একটি বড় সাফল্য। কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে এই মাল্টা জাত হিসেবে সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে সৃজিত বাগানের গাছে গাছে মাল্টা ফলের ব্যাপক সমারোহ।’

প্রায় ৫/৬ ফুট উচ্চতার ডালপালা আর সবুজ পাতায় পরিবেষ্টিত গুচ্ছ আকৃতির গাছে হলুদ মাল্টা ফলের ভারে প্রায় ন্যুব্জ হয়ে পড়ে প্রতিটি গাছ। প্রতিটি গাছে গড়ে শতাধিক মাল্টা ফল ধরে। ফলের আকৃতি ও গঠন বর্তমানে বিদেশ থেকে আমদানি করা মাল্টা অপেক্ষা হৃষ্টপুষ্ট এবং রসালো প্রকৃতির।

কম বৃষ্টিবহুল সুনির্দিষ্ট গ্রীষ্ম ও শীতকাল বিশিষ্ট শুষ্ক ও উষ্ণ জলবায়ু মাল্টা চাষের জন্য সবচেয়ে উপযোগী। বায়ুমণ্ডলের আর্দ্র্রতা ও বৃষ্টিপাত মাল্টা ফলের গুণাগুণকে প্রভাবিত করে। ঢালু এবং অম্লীয় মাটিতে মাল্টা ভালো জন্মে। মাল্টা গাছ জলাবদ্ধতা মোটেই সহ্য করতে পারে না এবং উচ্চমাত্রার লবণের প্রতি সংবেদনশীল। পার্বত্যাঞ্চলের হাজার হাজার একরের পাহাড়ি ভূমি মাল্টা চাষাবাদের জন্য খুবই উপযোগী, যাতে মাল্টার বাণিজ্যিকভিত্তিক আবাদে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে। মাল্টার আবাদ পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে পাহাড়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নে সাড়া জাগাতে পারে।

গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা জাহেদ হোসেন বলেন, ‘গাছ থেকে ছেঁড়া দেশীয় মাল্টা ফল কোনো প্রকার প্রযুক্তির ব্যবহার বা ফ্রিজিং করা ছাড়াই কমপক্ষে এক মাস স্বাভাবিক থাকবে। প্রতিটি গাছের উচ্চতা সর্বসাকুল্যে ৭ থেকে ৮ ফুট পর্যন্ত হতে পারে।’ একবার বাগান করলে প্রতি বছরই এই বাগান থেকে ফল পাওয়া যাবে বলে তিনি জানান।

গবেষণা কেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আলতাব হোসেন জানান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত বারি মাল্টা-১ এর চাষাবাদের জন্য কাপ্তাইয়ের মাটি ও প্রকৃতির অনুকূল পরিবেশ বিরাজমান।

পাহাড়ি অঞ্চলে এর চাষে সফলতা অর্জিত হয়েছে। পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে এই বারি মাল্টার আবাদে ৪ বছরের প্রতিটি গাছে ৩০০ এরও বেশি মাল্টা ধরেছে। এতে এলাকার কৃষক ও সাধারণ মানুষ খুবই খুশি।

ফলে কৃষকরা কলম সংগ্রহের জন্য গবেষণা কেন্দ্রে ছুটে আসছে। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী কলম না থাকায় চলতি বছর বাগান সৃজনের জন্য কেন্দ্র থেকে ১২ জন কৃষককে মাথাপিছু ৫০টি মাল্টা গাছের কলম সরবরাহ করা হয়েছে। আগামী বছর এর পরিমাণ কয়েক শ কৃষকের মাঝে কলম বিতরণ করা সম্ভব হবে বলে তিনি জানান।

পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সারাদেশে এ মাল্টা চাষ করা সম্ভব। দেশের বিভিন্ন স্থানে মাল্টার কলম নেওয়ার জন্য কৃষকরা ঝুঁকে পড়েছে।’

যে হারে কৃষকেরা কলম সংগ্রহ করে বাগান সৃজন করছে তাতে আগামী ৫ বছরের মধ্যে মাল্টা আমদানি করার প্রয়োজন হবে না বলে তিনি জানান। এতে বিপুল পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে।



মন্তব্য