kalerkantho

অদম্য হাবিব

দ্বিতীয় রাজধানী ডেস্ক   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



অদম্য হাবিব

প্রতিবন্ধিতাকে জয় করেছে রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাজানগর এলাকার হাবিবুর রহমান। দুই হাত না থাকলেও সে থেমে থাকেনি। অন্য ১০ স্বাভাবিক ছেলে-মেয়ের মতো নিয়মিত কলেজে যায়, ল্যাপটপ ব্যবহার করে, মোবাইল চালায়, নিজ হাতে খাওয়া, নিজ হাতে লেখাপড়া-এমন কি ক্রিকেট, ফুটবল, ক্যারাম খেলার মতো শারীরিক কসরতপূর্ণ খেলাধুলায় নৈপুণ্য দেখায়। প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন : জিগারুল ইসলাম রাঙ্গুনিয়া (চট্টগ্রাম)

 

রাঙ্গুনিয়া উপজেলার দক্ষিণ রাজানগর ইউনিয়নের দক্ষিণ নিশ্চিন্তাপুর গ্রামের অটোরিকশাচালক মোহাম্মদ রমজান আলীর ছেলে হাবিবুর রহমান (১৭)। আর্থিক অনটনে দিন কাটালেও সে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। তার এক হাত পুরো নেই। অন্য হাত কনুই পর্যন্ত। কিন্তু উচ্চশিক্ষা অর্জনে তার অদম্য ইচ্ছা। বর্তমানে সে রাঙ্গুনিয়া কলেজের একাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র। বাড়ি থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে কলেজে নিয়মিত যাতায়াত করে হাবিবুর।

তার বয়স যখন ৫ বছর তখন রাঙ্গুনিয়া থেকে খাগড়াছড়িতে বেড়াতে যাওয়ার পথে রাঙামাটিতে সড়ক দুর্ঘটনায় তার একটি হাত সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, অন্যটিও থেঁতলে যায়। থেঁতলে যাওয়ার কারণে এক হাতের কনুই পর্যন্ত কেটে ফেলতে হয়।

বাবা মোহাম্মদ রমজান আলী অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে প্রতিবন্ধী হলেও কখনও দমে যায়নি। আমরা তাকে পড়ালেখার খরচ দিতে না পারলেও তার মেধার কারণে সকলের সহযোগিতায় সে পড়ালেখা ঠিকই চালিয়ে যাচ্ছে। উত্তর রাঙ্গুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে এসএসসি পর্যন্ত পড়ালেখা করার সময় পরিচালনা পরিষদের পক্ষ থেকে তাকে বিনা বেতনে পড়ালেখা এবং সরকারি উপবৃত্তির ব্যবস্থাসহ যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হয়।’

হাবিব দুই ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার ছোট। মেধাবী হাবিবকে কোনো প্রতিবন্ধকতা দমিয়ে রাখতে পারেনি। সব ধরনের প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে জীবন যুদ্ধে সংগ্রাম করে চলেছে সে।

ছেলে হাবিবুর রহমানের শিক্ষার জন্য মা রাশেদা বেগমের আগ্রহ বেশি।

তিনি জানান, তাঁর ছেলের দুই হাত না  থাকলেও ছোটবেলা থেকে সে সব কিছু নিজে করার চেষ্টা করত। প্রথম প্রথম সে নিজেই জামাকাপড় পরতে পারত না, বই খাতা নিতে পারত না। সব কিছু তাকে এগিয়ে দিতে হত। কিন্তু তার প্রবল ইচ্ছাশক্তি ও অদম্য আগ্রহ তাকে এত দূর নিয়ে এসেছে। অন্য স্বাভাবিক ছেলে-মেয়েদের মতো সেও নিয়মিত কলেজে যায়, কম্পিউটার ব্যবহার করে, মোবাইল চালায়, নিজ হাতে খাওয়া, নিজ হাতে লেখা এমনকি ক্রিকেট-ফুটবলসহ শারীরিক কসরতপূর্ণ খেলাধুলায় নৈপুণ্যও দেখায়। সে উচ্চশিক্ষিত হতে চায়। 

হাবিব বলেছে, ‘মা-বাবা ও সবার আন্তরিক সহযোগিতায় সে এত দূর এসেছে। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থামানোর চেষ্টা করলেও আমি থামতে চাই না। পরিবারের বোঝা হয়ে না থেকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই।’

ভবিষ্যতে সে একজন আদর্শ শিক্ষক হয়ে নিজের মতো শারীরিক প্রতিবন্ধীদের পাশে দাঁড়াতে চায়।

রাঙ্গুনিয়া কলেজের অধ্যক্ষ আবু ইউসুফ বলেন, ‘হাবিব নিজ উদ্যমে কারো সহায়তা ছাড়াই অন্য স্বাভাবিক ছেলে-মেয়েদের মতো নিজেই লেখে এবং পড়ে। হাবিব এসএসসিতে ৪.৮৬ পেয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছিল।

পিইসি পরীক্ষায় জিপিএ ৫ ও ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি এবং জেএসসি পরীক্ষায় ৪.৬৭ পায়। সে কলেজে নিয়মিত ক্লাস করে।’

তাকে উপবৃত্তিসহ সমস্ত সুযোগ-সুবিধা কলেজ কর্তৃপক্ষ দেবে বলে তিনি জানান।

বেসরকারি সংস্থা উইমেন এম্পাউয়ারমেন্ট অ্যান্ড চাইল্ড রাইটস্ (এওয়াক) এর সমন্বয়কারী সমীর বড়ুয়া বলেন, ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এওয়াক হাবিবকে শিক্ষা উপকরণ প্রদানসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা করে আসছে। ভবিষ্যতেও সংস্থাটি তাকে আরো সহায়তা করে যাবে।’

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামাল হোসেন বলেন, ‘হাবিব প্রতিবন্ধী হলেও স্বাভাবিকভাবে সবকিছু চালিয়ে যাচ্ছে। সে সমাজসেবা অফিস থেকেও নিয়মিত ভাতা পাচ্ছে। প্রতিবন্ধীদের সহায়তায় সরকার সবসময় তৎপর। প্রতিবন্ধীরা সমাজ ও পরিবারের কোনো বোঝা নয়, হাবিব তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’

‘দুরন্ত সাহস আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে কোনো অপূর্ণতা জীবনে এগিয়ে চলার পথে বাধা হতে পারে না। যেকোনো প্রয়োজনে তাকে আমার সাথে যোগাযোগ করতে বলেছি। তাকে সব ধরনের সহায়তা দেওয়া হবে’-যোগ করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা।



মন্তব্য