kalerkantho


মারণাস্ত্রের জবাব ঘৃণার থুতুতে

মনু ইসলাম, বান্দরবান   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



মারণাস্ত্রের জবাব ঘৃণার থুতুতে

নো-ম্যানস ল্যান্ডে কোণাপাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এপারে বিজিবি, ওপারে মিয়ানমারের বিজিপি। মাঝখানে বাস্তুচ্যুত সাড়ে ৬ হাজার রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ। ছবি : কালের কণ্ঠ

বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত রেখা থেকে দুই দিকের দেড় শ গজ করে মোট ৩০০ গজ প্রশস্ত এলাকাকে ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’ বলা হয়। আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, সীমান্ত রেখার দুই দিকের এই এলাকায় কোনো দেশের নিরাপত্তা বাহিনী ঢুকতে পারে না। তাই শত্রু বা বহিরাগত অনুপ্রবেশ ঠেকাতে মধ্য রেখা থেকে দেড় শ গজ ভিতরে পাকা পিলারে তারকাঁটার নেট লাগিয়ে অস্ত্র হাতে পাহারা দিচ্ছে মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)।

কাঁটাতারের বেড়ার গা ঘেঁষেই নো-ম্যানস ল্যান্ডের মায়ানমার অংশের দেড় শ গজ বিস্তৃত ভূমিতে আশ্রয় নিয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নাগরিক।

কাঁটাতারের দুই পাড়ের লোকজনই একই দেশের মানুষ। কিন্তু ওপারের সৈনিকরা এ পারের স্বদেশীদের দিকে উঁচিয়ে রেখেছে মারণাস্ত্র। আর এপাড়ের মানুষ ওপারের দিকে তাকিয়ে ছিটাচ্ছে ঘৃণার থুতু। ওপারের সৈনিকরাও স্বদেশী রোহিঙ্গাদের লক্ষ্য করে মদের খালি বোতল ছুড়ে মারছে। একই দেশের নাগরিক হয়েও তারা পরস্পরের চরম শত্রু আজ। নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থিত কোণাপাড়া রোহিঙ্গা শিবিরের ওপারে রোহিঙ্গা আদিবসতি তম্ব্রু রাইট, তম্ব্রু লেফট, মেধাইক, পানির ছড়া, মেদি, কুয়াংচি বং, গদুরা, কক্ক উইচা, জাইত্যা খালী, চাকমা কাটা ও ঢেকুবনিয়া গ্রাম। এসব গ্রাম সীমান্ত থেকে মাত্র আধা কিলোমিটার দূরে।

নিজ দেশের সরকারি বাহিনীর নির্যাতনে টিকতে না পেরে শত বছরের রক্ত-ঘামে গড়া প্রিয় দেশ ছেড়ে এখানকার নো-ম্যানস ল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছে সাড়ে ৬ হাজার মানুষ। তারা যাতে আবার দেশে ফিরতে না পারে-এর জন্যই এই কাঁটাতারের বেড়া, অস্ত্র উঁচিয়ে দিবা-রাত্রি পাহারা এবং ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক ছড়ানো।

এতদিন ছিল শুধু বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)। নতুন করে তাদের সাথে যোগ দিয়েছে সেনাবাহিনীর সদস্যরা। আন্তর্জাতিক দৃষ্টি এড়াতে তারা পাহারা দিচ্ছে বিজিপির পোশাক পরে।

কোণাপাড়া ক্যাম্প বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নের তম্ব্রু বাজারের কাছাকাছি। এর অবস্থান বাংলাদেশের শেষ প্রান্তে।

সীমান্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে রোহিঙ্গা নেতা দিল

মোহাম্মদ জানান, মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিজিপির পোশাক পরলেও টহল দলের সদস্যদের অস্ত্রশস্ত্র দেখে তারা যে সামরিক বাহিনীর সদস্য তা সহজেই শনাক্ত করা যায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাংলাদেশের একজন গোয়েন্দা সদস্য জানান, বিজিপি সব সময়ই জি-থ্রি রাইফেল ব্যবহার করে থাকে। আর বর্তমানে যারা প্রহরা দিচ্ছে তাদের সবার হাতে এমএ-১১, এমএ-২২ এবং রকেট লাঞ্চার। এসব অস্ত্র মিয়ানমার আর্মিই ব্যবহার করে। মিয়ানমার আর্মি ব্যবহার করা অস্ত্রের গায়ে ‘এমএ (গঅ)’ লেখা থাকে।

কথা হয় ফাত্রা ঝিরি গ্রামের জুবাইদা বেগমের সঙ্গে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘এখান থেকেই আমরা আমাদের নিজ গ্রাম দেখছি। শূন্য পড়ে থাকা বাড়ি-ঘরের জন্যে কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু ওরা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আমাদের যেতে দিচ্ছে না।’ তিনি বলেন, ‘এপারে মাত্র দেড় শ গজ দূরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের বিজিবি জওয়ানরাও আমাদের বাংলাদেশে ঢুকতে দিচ্ছে না। তাই আমরা এখন নো-ম্যানস ল্যান্ডের মিয়ানমার অংশে আটকে আছি।’

রোহিঙ্গা নেতা আবদুল আলীম বলেন, ‘দেশ থেকে বের করে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েও ওরা সন্তুষ্ট নয়। তাই আমাদের ওপর আবারও অত্যাচার চালাতে মই লাগিয়ে তারা কাঁটাতারের বেড়া টপকে নো ম্যানস ল্যান্ডে ঢুকতে চাচ্ছে।’

বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা নাগরিক নুরুল আলম বলেন, ‘‘ওরা নরকের কীট। তাদের দেখলেই ঘৃণায় আমার গা ‘শিরশির’ করে।”

এদিকে মিয়ানমার সেনা সদস্যদের গত বৃহস্পতিবারের সশস্ত্র মহড়া এবং কাঁটাতারের বেড়া টপকে নো-ম্যানস ল্যান্ডে ঢুকে পড়ার অপচেষ্টার পর পরিস্থিতি মনিটর করতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবির পক্ষ থেকে সীমান্ত রেখার দেড় শ গজ দূরে বাংলাদেশ ভূ-খণ্ডে কোণাপাড়া ও ঘুমধুম অভিমুখী ৩টি ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা বসানো হয়েছে। এসব ক্যামেরা বসানোর পর বিজিপির পোশাক পরা সেনা সদস্যরা পাহাড়ের বাংকারে ঢুকে গোপন পজিশনে রয়েছে।

আলীমা খাতুন নামে একজন রোহিঙ্গা নারী বলেন, ‘কেরা (সিসি ক্যামেরা) লাগানোত্তুন মগ আর্মিরা কচ্চপের মত লুয়াই গেচে। সুযোগ পাইলে তারা আবার কল্লা বাইর কইরবো।’

আলীমা বেগমের আশঙ্কা-সুযোগ বুঝে যেকোনো সময় মিয়ানমার আর্মি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঢুকে পড়ে অত্যাচার চালাতে পারে। তাই অন্যান্য রোহিঙ্গাদের মতো তাদেরকেও কুতুপালং বা অন্য কোনো আশ্রয় শিবিরে নিয়ে যাবার দাবি জানান এই নারী।

এদিকে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-এর একটি সূত্র জানায়, কোণাপাড়ার কাছাকাছি যে তিনটি সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে-সেগুলোর সাথে ‘ইনফারেড’ সংযুক্ত করায় রাতের অন্ধকারেও সীমান্ত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে। ফলে কাঁটাতারের বেড়া টপকানোর আতঙ্ক ছড়ানো ঠিক নয়।

কোণাপাড়ায় নিরাপত্তাহীনতা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বান্দরবানের জেলা প্রশাসক দিলীপ কুমার বণিক বলেন, ‘প্রত্যাবাসনের বিষয়ে দুদেশের মধ্যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছে। মিয়ানমার প্রথমে জিরো লাইনের রোহিঙ্গাদের নিয়ে যেতে চায়।’

দিলীপ কুমার বণিক জানান, ২৭ মার্চ থেকে সীমান্তে বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ টহল শুরু হলে আতঙ্ক কেটে যাবে। তিনি বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশা করছি, খুব শিগগিরই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হবে। তাই এখন এদেরকে কুতুপালং সরিয়ে নেওয়ার দরকার হবে না।’


মন্তব্য