kalerkantho


নোয়াখালী ভিক্ষুকমুক্ত করার কর্মসূচি

সামসুল হাসান মীরন, নোয়াখালী   

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



নোয়াখালী ভিক্ষুকমুক্ত করার কর্মসূচি

... নোয়াখালী জেলার ৯ উপজেলায় প্রাথমিক পর্যায়ে ৫৮২১ জন ভিক্ষুকের তালিকা করা হয়েছে। ৩ মার্চ সদর উপজেলার ১১ ইউনিয়নের ১২১ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের আওতায় আনার মধ্যে দিয়ে এ কর্মসূচি আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। অন্যদেরও পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসন করা হবে ...

 

নূর বেগম বয়স ৫০ এর কাছাকাছি। নোয়াখালী জেলার সদর উপজেলার পশ্চিমে দুর্গম পূর্ব চর মটুয়ায় থাকেন একটি জীর্ণশীর্ণ ঘরে। স্বল্প বয়সে স্বামী হারিয়ে চার সন্তান নিয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতেন। সন্তানদের মধ্যে দুজন বড় হলে এক পর্যায়ে তারাও জীবিকার তাগিদে অন্যত্র চলে যাওয়ায় নূর বেগম হয়ে পড়েন অসহায়। দুই কন্যা নিয়ে বিপাকে পড়েন। তাদের ভরণ-পোষণের জন্য একদিন বাধ্য হয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যান। নিজ ইউনিয়ন থেকে একটু দূরে অন্য ইউনিয়নসহ জেলা শহরে নেমে পড়েন ভিক্ষাবৃত্তিতে। ভিক্ষা করে গত ১০ বছর ধরে তিনি তাঁর দুই কন্যাসন্তান নিয়ে কোনো রকমে জীবন অতিবাহিত করছেন। যদিও ভিক্ষাবৃত্তি তাঁর কাছে খুবই খারাপ লাগলেও সন্তানদের বাঁচানোর তাগিদে বাধ্য হয়ে এটি এখন পেশা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাঝে-মধ্যে অসুস্থতার কারণে আবার বর্ষাকালে ঘর থেকে বের হতে না পেরে ওই সময়ে নূর বেগমকে সন্তান নিয়ে উপোসও থাকতে হয়।

কিছুদিন আগে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নূর বেগমকে ভিক্ষা করতে দেখে ডেকে বললেন, ‘তোমাকে উপার্জনের কিছু একটা ব্যবস্থা করে দিলে তুমি ভিক্ষা করা ছাড়বে কী না?’

উত্তরে নূর বেগম খুশিমনে চেয়ারম্যানের প্রস্তাব লুফে নেন। বলেন, ‘ভিক্ষা তো কেউ ইচ্ছে করে করতে চায় না। বেঁচে থাকতে যদি অন্য কোনো অবলম্বন থাকে, তাহলে কেউ করবে না।’

ইউপি চেয়ারম্যান নূর বেগমের নাম-ঠিকানা নিলেন। তাঁকে ৩ মার্চ সদর উপজেলায় আসতে বললেন। নূর বেগম বলেন, ‘সেখানে গিয়ে দেখি, বড় স্যার চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মহোদয় আছেন। তিনি আমার হাতে একটি ছাগল তুলে দিয়ে বললেন, ‘এখন থেকে আর ভিক্ষা করবেন না, ছাগল লালন করে জীবিকা নির্বাহ করবেন।’

জবাবে নূর বেগমও বললেন, ‘আমি চেষ্টা করব এ ভিক্ষার হাত কর্মীর হাত পরিণত করার।’ তিনি জানান, তাঁর মতো এ রকম ভিক্ষুকদের যদি টাকা-পয়সা দিয়ে কিছু করে দেওয়া যায় তাহলে কেউ আর ভিক্ষার ঝুলি হাতে নেবেন না।’

জেলা প্রশাসনের সার্বিক তত্ত্বাবধানে নোয়াখালী জেলা ভিক্ষুকমুক্ত করার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। ৩ মার্চ শনিবার সকাল ১১টায় নোয়াখালী সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে সদর উপজেলা পরিষদ ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচি অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ভিক্ষুকদের স্বাবলম্বী করার ওই কর্মসূচিতে নূর বেগমের মতো অনেকের হাতে তুলে দেওয়া হয় বিভিন্ন সামগ্রী।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে উপজেলার ১২১ জন ভিক্ষুকের হাতে রিকশা, ছাগল, হাঁস-মুরগি, সেলাই মেশিন, শাড়ি-চুড়ি, চায়ের ফ্লাক্স-কাপ ও হোগলা পাতা তুলে দেন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান।

নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মো. মাহবুব আলম তালুকদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট শিহাব উদ্দিন শাহীন, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ কে এম জহিরুল ইসলাম, জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী ড. মাহে আলম। আরো বক্তব্য দেন সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার কামাল উদ্দিন, এওজবালীয়া ইউপি চেয়ারম্যান আবদুজজ্জাহের প্রমুখ। এছাড়া পুনর্বাসিত ভিক্ষুক মোহাম্মদ মিরন ও বিবি হালিমা তাঁদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন।

অনুষ্ঠানে ভিক্ষুক পুনর্বাসন কর্মসূচির ওপর বিশেষ নিবন্ধ প্রজেক্টরের মাধ্যমে উপস্থাপন করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবদুর রউফ মণ্ডল। স্বাগত বক্তব্য দেন সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফুল ইসলাম সরদার। অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সদর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার মো. কামাল উদ্দিনসহ জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা, কর্মচারী এবং সদর বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের সব চেয়ারম্যান।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমি বিভাগীয় কমিশনার হিসেবে গত ১১ সেপ্টেম্বর যোগদান করে বিভাগের ১১ জেলায় ভিক্ষাবৃত্তি বন্ধে ৬ মাসের মধ্যে অর্থাৎ আগামী ১১ মার্চের মধ্যে তা বাস্তবায়নের জন্য সকল জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দিয়ে চিঠি পাঠাই। যা ইতোমধ্যে বাস্তবায়ন হতে শুরু করেছে। কমিটমেন্ট থাকলে সব কিছুই সম্ভব। এই মার্চ মাসে আমরা বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উেক্ষপণ করব। এ মাসে আমরা মধ্যম আয়ের দেশের স্বীকৃতি পেতে যাচ্ছি। আমরা আর ভিক্ষুক দেখতে চাই না।’

তিনি মনে করেন, বিত্তবানরা তাঁদের জাকাতসহ দানের টাকা দিয়ে হতদরিদ্রদের পুনর্বাসন করলে এদেশ জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হবে। ‘ইনশাল্লাহ সবার সহযোগিতা পেলে আমরা অচিরেই ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে বিশ্বের দরবারে আরো মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব।’-যোগ করেন বিভাগীয় কমিশনার আবদুল মান্নান।

নোয়াখালী জেলা প্রশাসক মো. মাহবুবুল আলম তালুকদার বলেন, ‘এর আগে আমি ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসক হিসাবে দায়িত্ব পালন করার সময়ে সেখানেও ভিক্ষুকমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা আর ভিক্ষুকের জাতি হিসেবে থাকতে চাই না।’

তিনি জানান, এই মহতী উদ্যোগে সাড়া দিয়ে তিনিসহ জেলা প্রশাসন ও জেলার সরকারি কর্মকর্তারা একদিনের বেতন দিয়েছেন। তাঁদের পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ এগিয়ে এসেছেন। এ কর্মসূচি সফল করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি ব্যক্তিদের নিয়ে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

নোয়াখালীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) উদয়ন দেওয়ান জানান, নোয়াখালী জেলার ৯ উপজেলায় প্রাথমিক পর্যায়ে ৫৮২১ জন ভিক্ষুকের তালিকা করা হয়েছে। ৩ মার্চ সদর উপজেলার ১১ ইউনিয়নের ১২১ জন ভিক্ষুককে পুনর্বাসনের আওতায় আনার মধ্যে দিয়ে এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। বাকি ভিক্ষুকদেরও পর্যায়ক্রমে পুনর্বাসন করে নোয়াখালী জেলাকে ভিক্ষুকমুক্ত করা হবে।


মন্তব্য