kalerkantho


দুই বছরে আড়াই হাজার অগ্নিকাণ্ড

৭ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



দুই বছরে আড়াই হাজার অগ্নিকাণ্ড

ছবি : রবি শংকর

চট্টগ্রাম বিভাগে গেল দুই বছরে প্রায় আড়াই হাজার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এতে ১০০ কোটি টাকার সহায় সম্পদ ছাই হয়ে যায়। হতাহতের ঘটনা ঘটে অর্ধশতাধিক। সার্বিক জনসচেতনতার অভাবে বেশির ভাগ অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। বিস্তারিত জানাচ্ছেন : মুস্তফা নঈম, চট্টগ্রাম

 

দেশের দ্বিতীয় রাজধানী চট্টগ্রামে দিন দিন বাড়ছে মানুষের বসতি। বাড়ছে কর্মক্ষেত্র। সঙ্গে বাড়ছে বহুতল ভবনের সংখ্যা। কিন্তু মাত্র ১০ শতাংশ বহুতল ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে। ভবন নির্মাণের আগে ‘সেফটি প্ল্যান’ কার্যকর করার নির্দেশনা থাকলেও অনেকাংশে তা পালন করা হয় না।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স সূত্রে জানা গেছে, ২০১৭ সালে চট্টগ্রাম বিভাগে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে এক হাজার ২৭৩টি। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলায় অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা ৬৬৩টি।

২০১৬ সালে এক হাজার ১২৭টি অগ্নিকাণ্ড সংঘটিত হয়। এর মধ্যে চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় ছিল ৪৯৮টি। পুরো বিভাগে এক বছরের ব্যবধানে অগ্নিকাণ্ডের সংখ্যা বেড়েছে ১০০টি আর চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় ১৬৫টি। চট্টগ্রামের পর বেশি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে কুমিল্লায় গত দুই বছরে ৫০২, নোয়াখালীতে ৪৪১ এবং কক্সবাজারে ২৩৬টি।

এসব অগ্নিকাণ্ডের মধ্যে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকেই শতকরা ৬০ ভাগ আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে জানিয়েছেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স, চট্টগ্রামের কর্মকর্তারা।

চুলার আগুন, সিগারেটের টুকরা, খোলা বাতির ব্যবহার এবং ঘর্ষণজনিত কারণেও অগ্নিকাণ্ড সৃষ্ট হয়ে বিপুল পরিমাণ সম্পদ পুড়ে গেছে। গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরণেও বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার কথা জানান সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে চট্টগ্রাম মহানগরীতে বিশেষ কিছু এলাকাকে অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হল হাজারী গলি, হকার্স মাকের্ট, রিয়াজউদ্দিন বাজার, তামাকুণ্ডী লেন, বাংলাবাজার, শেরশাহ, আমবাগান বস্তি, ঝাউতলা বস্তি, সাগরপার বস্তি, টেরিবাজার, চাক্তাই, মাইলের মাথা, মোগলটুলী, মুহুরীপাড়া, পানওয়ালাপাড়া, পাহাড়তলী এলাকা, কালুরঘাট মোহরা বস্তি, কালুরঘাট বরিশাল কলোনি, সেগুনবাগান বস্তি, কালুরঘাট কামালবাজার, মাঝিরঘাট, বউবাজার বস্তি, মিয়াখাননগর বস্তি, দেওয়ানহাট ও সুপারিপাড়া এলাকা।

সার্কিট ব্রেকারের কারণে বৈদ্যুতিক গোলযোগের সৃষ্টি হতে পারে বলে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তারা বলেন, একটা বাসায় বৈদ্যুতিক সংযোগ নেওয়ার সময় যে লোড নেওয়া হচ্ছে, তার চেয়ে দ্বিগুণ লোডের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি ব্যবহার করছেন বাড়ির মালিকরা। এ কারণেও বৈদ্যুতিক গোলযোগের সৃষ্টি হয়।

তাঁরা বলেন, বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের পর অগ্নিকাণ্ডের অন্যতম কারণ হল গ্যাসের আগুন, চুলার আগুন, সিগারেটের টুকরা, খোলা বাতির ব্যবহার এবং ঘর্ষণজনিত আগুন। অন্যদিকে বৈদ্যুতিক গোলযোগ সৃষ্ট হয় প্রধানত কয়েকটি কারণে। কারণগুলো হলো শর্টসার্কিট ও আর্ক ব্লাসড বা লো-ভোল্টেজ থেকে হাই ভোল্টেজে বিদ্যুৎ ওঠানামা করলে বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গ থেকে অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স, চট্টগ্রাম সূত্রে জানা গেছে, মোট ছয় কারণে চট্টগ্রাম অঞ্চলে গত বছরে অগ্নিকাণ্ডজনিত ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে বৈদ্যুতিক গোলযোগ থেকেই শতকরা ৬০ ভাগ আগুনের সূত্রপাত হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ আরো জানায়, বৈদ্যুতিক গোলযোগের আরেক বড় কারণ অরক্ষিত ফিটিংস। বিএসটিআইয়ের অনুমোদিত ক্যাবলে বৈদ্যুতিক ফিটিংসের নিয়ম থাকলেও বাড়ির মালিকেরা নিম্নমানের ক্যাবলে বৈদ্যুতিক ফিটিংস লাগান বাসা-বাড়িতে। আর বছরের পর বছর লাইন ওয়ারিংগুলো পরীক্ষা না করার জন্য বৈদ্যুতিক গোলযোগের সৃষ্টি হতে পারে।

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স, চট্টগ্রাম অঞ্চলের উপপরিচালক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা থেকে রেহাই পেতে হলে আমাদেরকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে। অগ্নি ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।’

তবে তাঁর দাবি, ‘অতীতে যেকোনো সময়ের চাইতে ফায়ার সার্ভিস এখন অনেক কার্যকর সেবা প্রতিষ্ঠান। এটি কেবল আগুন নেভানোর প্রতিষ্ঠান নয়, বহুমুখী সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হচ্ছে।’

তিনি জানান, কাপ্তাই লেকের কারণে রাঙামাটি জেলার অধিকাংশ উপজেলা জলবেষ্টিত। তাই সেখানে নৌ ফায়ার স্টেশন স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

তাঁর মতে, কক্সবাজার জেলায়ও নৌ ফায়ারস্টেশন স্থাপন জরুরি। আর চট্টগ্রামে যেহেতু দেশের প্রধান সমুদ্র বন্দরের অবস্থান, দেশি-বিদেশি বহু জাহাজের আগমন নির্গমন রয়েছে। এসব জাহাজের অগ্নিদুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে চট্টগ্রামে সমুদ্রগামী ফায়ারস্টেশন স্থাপন দরকার। যদিও সমুদ্রগামী জাহাজের অগ্নিনিরাপত্তার জন্য চট্টগ্রাম বন্দরের নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ জাহাজে অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটলে তখন ফায়ার সার্ভিসের করার কিছুই থাকে না।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানিয়েছে, নগরের সদরঘাট এলাকায় এক সময় একটি নৌ ফায়ারস্টেশন ছিল। এখন অফিস ও জনবল রয়েছে। কেবল জলযানের অভাবে কোনো কাজ করা যাচ্ছে না। সুউচ্চ বহুতল ভবন ও সমুদ্রগামী জাহাজের অগ্নিদুর্ঘটনায় আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের হেলিকপ্টার বিভাগ সংযোজন সময়ের ব্যাপার।

হাটহাজারীতে পাঁচ একর ভূমির ওপর চট্টগ্রাম অঞ্চলে ফায়ার সার্ভিসের একটি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হবে বলে জানা গেছে। এর প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। কক্সবাজারেও একটি ট্রেনিং সেন্টার গড়ে তোলা হবে।

সবাইকে আরো বেশি সচেতন হতে হবে

মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন

উপপরিচালক, ফায়ার সার্ভিস, চট্টগ্রাম অঞ্চল

 

অগ্নিকাণ্ড থেকে রেহাই পেতে হলে আমাদের আরো বেশি সচেতন হতে হবে। বহুতল ভবনে অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। এ ব্যাপারে আইন পুরোপুরি কার্যকরে পদক্ষেপ নিতে হবে।

আর অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ফায়ার সার্ভিস এখন অনেক বেশি কার্যকর সেবা প্রতিষ্ঠান।


মন্তব্য