kalerkantho


দেশে এ প্রথম

কাপ্তাই কায়াক ক্লাব, পর্যটনশিল্পে সম্ভাবনার হাতছানি

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



কাপ্তাই কায়াক ক্লাব, পর্যটনশিল্পে সম্ভাবনার হাতছানি

... কাপ্তাই হ্রদের ঘাটের গোড়ায় বাঁধা লাল-সবুজের কেতন। ছয়টি কায়াক নিয়ে শুরু করা এ যাত্রায় এখন ১৩টি। যুক্ত হচ্ছে আরো নানা নকশার কায়াক। উপরে ছোট্ট চারকোণা টেবিলে বসা থাকেন আবুল কালাম। তিনি আপনাকে শিখিয়ে দেবেন কীভাবে চালাবেন কায়াক। স্রোতে পানির সঙ্গে কীভাবে খেলবেন। পুরো দিক নির্দেশনা দিয়ে তবেই আপনাকে নামতে দেবে পানিতে। এর আগে আপনি সাঁতারে যতই দক্ষ দাবি করেন না কেন আপনাকে অবস্থা বুঝে পরিয়ে দেওয়া হয় লাইফ জ্যাকেট। এতে কায়াকিং ভয় কেটে যাবে মুহূর্তেই। ২৫০ টাকায় ঘণ্টা হিসেবে পাওয়া যায় কায়াক।  আর আধ ঘন্টা

১৫০ টাকা ...

 

ভিরদুপুরের রোদের আদুরে আমেজ। হিম হাওয়ায় কর্ণফুলীর সবুজাভ শীতল জল। পাহাড়ঘেরা জলের বুকে পিনপতন নীরবতায় ছুটছে কায়াক। ভেসে আসে কেবল জলের নাচন। জলজুড়ে একই সাইজের রঙ বেরংয়ের ছোট ছোট পানকৌড়ি যেন! কায়াকিং, কদিন আগেও খুব কম জানাশোনা এই গণ্ডিটা অল্প কদিনেই বেশ পরিচিতি হয়ে উঠেছে কাপ্তাই কায়াক ক্লাবের সুবাদে।

রানা, আবছার, পাভেল ও বাবর। একজন পেশায় ডাক্তার, দুজন ব্যবসায়ী, একজন মেরিন ইঞ্জিনিয়ার।

বাড়ি চারজনের চার জায়গায়। মিল এক জায়গাতেই ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করেন ভীষণ রকম। আর চারজনেরই নেশা সাইক্লিং। পরিচয়ের সূত্রও ঠিক সেখানে। চারজনই অ্যাডভেঞ্চার ক্লাব অব চিটাগাংয়ের মেম্বার। সেই থেকে সখ্যতা, হৃদ্যতা বন্ধুত্ব। বন্ধুরা মিলে কিছু করার প্ল্যান থেকেই মাথায় আসা কায়াকিং।

মেরিন ইঞ্জিনিয়ার বন্ধু আল আমিন পাভেলের করা নকশায় তৈরি কায়াক প্রথমে শুধু বিক্রিটাই মাথায় নিয়ে মাঠে নেমেই বুঝতে পারলেন, নিজ দেশেই কায়াক কায়াকিং পরিচিত হয়নি এখনো ততটাও! দেশের মাটি চষে বেড়ানো মানুষগুলোর কাছে ব্যাপারটা মন খারাপের হয়ে দাঁড়ালো। সেই থেকেই ভাবনা বদলে নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে নিল দেশে এবং দেশের তরুণ প্রজন্মের মাঝে কায়াকিংকে পরিচিত করে তোলার। যেই ভাবা সেই কাজ। এবার জায়গা নির্ধারণের পালা প্রথমে কক্সবাজারকেই নির্ধারণ করা হলেও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে জায়গা বদলে নির্ধারণ করা হলো শহর রাঙামাটির জীববৈচিত্র্য এবং গাছ গাছড়ার অভয়ারণ্য কর্ণফুলী আর কাপ্তাই লেকের মোহনা উপজেলা কাপ্তাই।

বন্ধুদের মধ্যে আবছার উদ্দীনের বাড়ি কাপ্তাইতে হওয়ায় কাজটা হয়ে গেলো আরো সহজ। তাঁর সার্বিক সহযোগিতায় কাপ্তাইয়ের ওয়াগ্গ্যায় কর্ণফুলীর তীর জুড়ে ছোটখাটো একটা ঘাট।

কাপ্তাই হ্রদের ঘাটের গোড়ায় বাঁধা লাল সবুজের কেতন। ৬টি কায়াক নিয়ে শুরু করা এই যাত্রায় এখন আছে ১৩টি কায়াক। সামনে আসবে আরো বিভিন্না নকশার কায়াক। উপরে ছোট্ট চারকোণা টেবিলে বসা থাকেন আবুল কালাম। আপনাকে নাম এন্ট্রি করার সাথে সাথে আরেকটি সাইন করতে হবে দায়ভার মুক্তির খাতায়।

আবুল কালাম বন্ধুত্বসুলভভাবে আপনাকে শিখিয়ে দেবেন কীভাবে চালাবেন কায়াক। স্রোতের বিপরীতে স্রোতের সাথে কীভাবে খেলবেন পানির সাথে।

পুরো দিক নির্দেশনা দিয়ে তবেই আপনাকে নামতে দেবে পানিতে। এর আগে আপনি সাঁতারে যতই দক্ষ দাবি করেন না কেন আপনাকে অবস্থা বুঝে পরিয়ে দিবে লাইফ জ্যাকেট। তাঁর সুন্দর সাবলীল দিক নির্দেশনাই আপনার জলে কায়াকিং ভয় কাটিয়ে দেবে মুহূর্তেই।

ঘণ্টা হিসাবে পেয়ে যাবেন কায়াক। ঘণ্টায় ২৫০ টাকা। আধ ঘণ্টা ১৫০ টাকা। এক ঘণ্টায় পাওয়া যাবে পাঁচ মিনিট বাড়তি কায়াকিং।

দেশের প্রথম এই কায়াকিং ক্লাবের রয়েছে নিজেস্ব ফেসবুক গ্রুপ পেইজ। বিভিন্ন দিবস এবং বিশেষ উপলক্ষে আয়োজন করে থাকে নানা ইভেন্ট। সামনে আসছে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন কায়াকিং। কিছুদিন আগেই মাত্র শেষ করল সবচেয়ে বড় ইভেন্ট কাপ্তাই-বিলাইছড়ি কায়াকিং। আছে মেম্বারশিপের ব্যবস্থাও। ৩০০০ টাকায় সদস্য হওয়া প্লাটিনাম মেম্বাররা পাবেন ১ বছর ফ্রি কায়াকিং এবং সাথে আগত মেহমানদের জন্য ৯টি কায়াকে ৩০% ডিসকাউন্ট। আর ১০০০ টাকায় সদস্যপ্রাপ্ত গোল্ড মেম্বাররা পাবেন প্রতিবার কায়াকিংয়ে ১০% ডিসকাউন্ট। ইতোমধ্যেই সাড়া ফেলে দেওয়া কায়াকিং ক্লাবের সূত্রে কাপ্তাইতেও বেড়েছে পর্যটক সমাগম। বিশেষ করে তরুন প্রজন্মের। চট্টগ্রামের সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় আর সময় কম লাগায় চট করেই ঘুরে যাচ্ছেন শিক্ষার্থীরাও। রুম্মান আফিফারা কজন বন্ধু মিলে এসেছে কায়াকিং করতে। বেশ উত্ফুল্ল চারজনই। স্বচ্ছ পানির হাওয়ায় মুগ্ধতার রেশ চোখে মুখে।

মূল সমস্যা কায়াকিং করতে আসা পর্যটকদের জন্য রাতে থাকার নেই স্থানীয় তেমন কোনো উন্নত ব্যবস্থা। কথা হয় কাপ্তাই কায়াক ক্লাবের অন্যতম একজন পেশায় ব্যবসায়ী ইউসুফ রানার সাথে। তিনি জানান শুরুর গল্পটা। স্বপ্ন আর ভালোবাসার জায়গা থেকেই শুরু করার গল্পটা সহজ ছিলো না অতটা।

এখনো সহজ নয় তত। বাধার মুখে পড়তে হয় প্রায়শই। লাভের চিন্তা করেন না শুধু ভাবেন দেশের পর্যটন শিল্প নিয়ে। ভাবেন দেশেই এত এত সম্ভাবনা থাকতে কেন ছুটিতে ছুটতে হবে বিদেশে! সেই ভাবনা থেকেই দেশের মাটিতেই উন্মুক্ত করতে চান পর্যটনশিল্পের নানা স্তর। ভাবনায় আছে ফ্লোটিং রেস্টুরেন্ট, রিভার ক্রুজও।

আসছে ফেব্রুয়ারির ২৪ তারিখ দেশের সর্বপ্রথম এই কায়াকিং ক্লাবের প্রথম বর্ষপূর্তি। এ উপলক্ষে থাকছে বিভিন্ন আয়োজনও। চার তরুণের এই ভাবনা ভালোবাসা স্বপ্ন এভাবেই এক এক করে হাজার তরুণে ছড়িয়ে এগিয়ে নিয়ে যাবে আমার দেশ, আমাদের সম্ভাবনা।

 


মন্তব্য