kalerkantho


অপর্ণাচরণ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

এলোচুলে চঞ্চলা কিশোরী!

চট্টগ্রাম নগরীর নারী শিক্ষার অন্যতম দুটি সেরা প্রতিষ্ঠান ডা. খাস্তগীর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় এবং অপর্ণাচরণ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ। পুনর্মিলনী উপলক্ষে গত শুক্র ও শনিবার এই দুই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা দেশ-বিদেশের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসেন ক্যাম্পাসে। অনেকে স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে অশ্রুসিক্ত হয়ে পড়েন। সবার সারাক্ষণ কাটে মহাআনন্দে। বিস্তারিত জানাচ্ছেন : চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি মোবারক আজাদ। ছবি তুলেছেন : রবি শংকর

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



এলোচুলে চঞ্চলা কিশোরী!

‘স্মৃতিময় বন্ধনে, স্মৃতিময় প্রাঙ্গণে’ এই স্লোগানে প্রতিষ্ঠার ৯০ বছর পর প্রথমবারের মতো বীরকন্যা ওয়াদ্দেদারের স্মৃতিধন্য স্কুল অপর্ণাচরণ সিটি করপোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় দুই দিনব্যাপী পুনর্মিলনী উৎসবের আয়োজন করে। প্রথমদিন শুক্রবার দুপুর থেকে স্কুল প্রাঙ্গণে ছিল ঢোলের বাজনা আর নানা বয়সী নারীর উচ্ছ্বাস। আনন্দ-উল্লাসে মেতে ওঠে পুরো ক্যামপাস। একেকজন যেন বেণী দোলানো চঞ্চলা কিশোরী! কারণ তাঁরা সবাই যে আজ স্কুলে তাঁদের স্মৃতিময় প্রাঙ্গণে ফিরে এসেছেন। বর্তমানে এঁদের কেউ

ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার, কেউ ব্যাংকার, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের, কেউ বা স্কুল-কলেজের শিক্ষক। কেউ কেউ সরকারি-বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। আবার কেউ বা স্বামী-সন্তান-সংসার নিয়ে পাকা গৃহিণী হয়ে সংসার সামলাচ্ছেন। পুনর্মিলনীতে তাঁরা সব পরিচয় ছাড়িয়ে অপর্ণাচরণ স্কুলের একসময়ের চঞ্চলা বালিকা হয়ে মেতে উঠলেন!

বিকেল তিনটায় চট্টগ্রামের সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন কবুতর ও বেলুন ওড়ানোর মাধ্যমে পুনর্মিলনী উৎসব উদ্বোধন করেন। এরপর রঙিন বেলুন, ব্যানার, ফেস্টুন, বিভিন্ন ব্যাচের সন অঙ্কিত সাইনবোর্ড প্রদর্শনের মাধ্যমে এক বর্ণাঢ্য র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি ডিসি হিল পর্যন্ত গিয়ে আবার স্কুলে এসে শেষ হয়। র‌্যালিতে বয়স্কদের মধ্যে  হাঁটতে অক্ষম প্রাক্তন ছাত্রীদের ঘোড়ার গাড়ি, ভ্যান ও রিকশাযোগে অংশ নিতে দেখা যায়। র‌্যালি শেষে প্রাক্তন ছাত্রীরা স্কুলে ফিরে এসে ফটোসেশন, আড্ডা ও সান্ধ্য খাবারে অংশ নেন। এভাবেই প্রথম দিনের প্রোগ্রাম শেষ হয়। দ্বিতীয় দিনের প্রোগ্রামের জন্য প্রাক্তন ছাত্রীরা আনন্দ-উচ্ছ্বাসে স্কুল প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে।

দ্বিতীয় দিন শনিবার। স্কুলের নিজস্ব মাঠ নেই বলে কর্তৃপক্ষ সমাপনী দিনের উৎসব নিয়ে যান নগরীর লাভলেনে স্মরণিকা কমিউনিটি সেন্টারে। সেখানে প্রাক্তন ছাত্রীদের মিলন মেলায় তাঁদের আনন্দোৎসবে মেতে উঠার পাশাপাশি বিষাদেও ভেঙে পড়তে দেখা গেছে।

এখানে গেট পেরিয়ে ঢোকতেই দেখা গেল, দর্শক সারিতে ১৯৫০ সন থেকে ২০০০ পর্যন্ত আলাদা আলাদা বুথ তৈরি করা হয়। এখানে ৬০টি ব্যাচের প্রাক্তন ছাত্রীদের আইডি কার্ড দেখিয়ে ম্যাগাজিন, ব্যাগ, ক্যাপ ও খাবারের টোকেন নিতে দেখা গেছে। আরেকটু ভেতরে ঢোকে মঞ্চের সামনে বিভিন্ন ধরনের ব্যানারে ‘ফুল ফুটুক আর না ফুটুক আজ বসন্ত’, ‘এসো মোরা গাই সাম্যের গান’, ‘ভুলো না আমায়’, ‘সখি স্মৃতির পাতায় দিও মোরে একটু ঠাঁই’ এ ধরনের লেখায় ছেয়ে গেছে।

ঢাকা থেকে এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে আসা স্কুলের ১৯৭৪ ব্যাচের প্রাক্তন ছাত্রী ও সংস্কৃতিকর্মী নিলুফা বেগম বললেন, ‘অনেক ভালো লাগছে, কল্পনাও করতে পারিনি এত সুন্দর একটা পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান হতে পারে। প্রথমে এ পুনর্মিলনীতে আসব কি আসব না এই নিয়ে দ্বিধা ছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে এখানে আসা আমার সার্থক হয়েছে। না আসলে অনেক কিছুই মিস করে ফেলতাম।’

১৯৮০ সালে লতিফা চৌধুরী মাধ্যমিকের গণ্ডী পেরিয়েছিলেন। শুধু এই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কলকাতা নদীয়ার মায়াপুর থেকে এসেছেন এই প্রাক্তন ছাত্রী। তিনি বলেন, ‘আবেগের টানে এই স্মৃতিবিজড়িত স্কুলে এসেছি। সিনিয়র-জুনিয়র অনেককে পেয়ে আমি আত্মহারা। কারণ অনেকের সঙ্গে আজ ৩৭ বছর পর দেখা হয়েছে। প্রিয় বান্ধবী বা সহপাঠীর সঙ্গে বছরের পর বছর দেখা করার সুযোগ হয়নি। যখন এ সুযোগ আসে তখন সত্যি তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আমি চাই, এরকম পুনর্মিলনী প্রতি পাঁচ বছর অন্তর অন্তর হোক।’

১৯৭৯ ব্যাচের প্রাক্তন ছাত্রী মেরী অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে এই অপর্ণাচরণ স্কুলের কৈশোরের বান্ধবীদের সঙ্গে স্মৃতির পাতায় দুঃখ-সুখগুলো আবারও ভাগ করে নেওয়ার জন্য এসেছেন। বললেন, ‘আশির দশকের অনেক কিছুই বদলে গেছে। শুধু পরিচিত বান্ধবীদের আড্ডায় অল্পক্ষণে কৈশোরে ফিরে যাওয়ার চিত্র পাল্টায়নি। বান্ধবী মানু মজুমদার, শিখা দাশ ও দীপা রাণীর সঙ্গে সেই স্কুল জীবনের না বলা অনেক কথা শেয়ার করছি। তাদের কাছে পেয়ে মনে হচ্ছে এই বয়সে আবারও যেন স্কুলের ছাত্রী হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছে যেন শিক্ষকদের শাসনগুলো কানে বাজছে।’

২০০০ ব্যাচের সাথী বড়ুয়া পেশায় একজন ব্যাংকার। তিনি বললেন, ‘আমি যদিও চট্টগ্রাম থাকি। অনেক বান্ধবীর সঙ্গে ফেসবুক, মোবাইলে যোগাযোগ হলেও বহুদিন পর তাদেরকে সরাসরি দেখতে পেরেছি। এই দুটা দিন পুরো কৈশোরের বন্ধুদের মতো চলেছি।’

আইসিএবির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট পারভীন মাহমুদ। ১৯৭০ ব্যাচের এ ছাত্রী বললেন, ‘আমাদের মাঠে টিনের ছাউনির ক্লাসরুম বানানো হয়েছে। এটা খুবই কষ্টের। মাঠ নেই বলে আমাদের কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া করে পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান করতে হচ্ছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘স্কুলটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি প্রীতিলতার স্মৃতিধন্য একটি ঐতিহ্য। একে সংরক্ষণের দায়িত্ব নিতে হবে।’

এই পুরো দুইদিন পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানের সমন্বয়ক নাজনীন কামাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেড় হাজারের বেশি শিক্ষার্থী মিলনমেলায় যোগ দিয়েছেন। তা একমাত্র সাহসী পদক্ষেপ ও প্রত্যয়ী উদ্যোগের জন্য সম্ভব হয়েছে। এই অনুষ্ঠানকে সফল করার জন্য অনেক উপ-কমিটি করা হয়েছে যার মধ্যে অনেক সিনিয়র আপুরা দায়িত্ব নিয়েছেন।’

প্রফেসর রীতা দত্ত ছিলেন প্রকাশনায়। এছাড়া মিসেস আইভি হাসান সাজসজ্জা, তথ্য ও প্রচারে জ্যোত্স্না কায়সার, সাংগঠনিক আমাতুল নূর সেতু, ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনে জোবাঈদা, অ্যাপায়নে মুক্তা, শৃঙ্খলা কমিটিতে রুহী, স্বাস্থ্যসেবা কমিটিতে ছিলেন ড. হৈমন্তী। র‌্যালি কমিটি সঞ্চালনায় ছিলেন কলি ও বাচিক শিল্পী সুতপা।

স্কুলটির প্রথম পুনর্মিলনীর আহ্বায়ক ড. জয়নাব বেগম কালের কণ্ঠকে বললেন, ‘নবীন-প্রবীণদের মধ্যে একটা মেলবন্ধন হয়েছে। বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ছিলেন ১৯২৭ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলের প্রথম প্রধান শিক্ষক। স্বাভাবিকভাবেই সেই গর্বে গর্বিত সাবেক ছাত্রীরা। প্রীতিলতা আমাদের জন্য গৌরবের। তিনি প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন। এরপর প্রণতি সেন ছিলেন ৩৯ বছর। আমরা এ পুনর্মিলনীর মাধ্যমে স্কুলের জন্য কিছু করতে চাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘২০১৭ সালের ৩১ মার্চ ৯০ বছরের এই প্রাক্তন ছাত্রী পরিষদ গঠিত হয়। এই পরিষদ গঠনের মাধ্যমে আজকে এই বিশাল মিলনমেলা সম্ভব হয়েছে। আশা করি যুগের পর যুগ এই শিক্ষাঙ্গনের শিক্ষার্থীরা মিলনমেলার এই ট্রেডিশনকে ধরে রাখবে।’

দেশের নামকরা অভিনেত্রী চিত্রলেখা গুহ, নজরুলসংগীত শিল্পী মৃণালিনী চক্রবর্তীও তাঁদের কৈশোরের বান্ধবীদের দেখা পেয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত।

সকাল থেকেই শুরু হওয়া  আলোচনা সভার পরে থিম সং, সংবর্ধনা আড্ডা, ফটোসেশন ও স্মৃতিচারণ করতে করতে বিকেল গড়িয়ে যায়। এর পর শুরু হয় প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পরিবেশনায় মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। চলে সন্ধা সাতটা পর্যন্ত। পরে ডকুমেন্টারি, রাতের ডিনার ও র‌্যাফল ড্র শেষে আবারও আপন ঠিকানায় যাওয়ার জন্য একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আবেগপ্লুত হয়ে পড়েন সবাই। বাস্তবতার টানে আবারও দেখা হবে এই ভেবে মিলনমেলা যেভাবে শুরু হয়েছিল সেভাবে ভাঙতে শুরু করে।



মন্তব্য