kalerkantho


ঝরে পড়া শিশুর আলোর পথে ফেরা

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড (চট্টগ্রাম)   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ঝরে পড়া শিশুর আলোর পথে ফেরা

চায়ের দোকানের কর্মচারী নাদিম আহমেদ (১১) এখন স্কুলছাত্র। ময়লা থালা-বাসন ধোয়া ও আবর্জনা পরিষ্কারের কাজ বাদ দিয়ে স্কুলে যাচ্ছে সে। আর তাকে চমৎকার এ সুযোগ করে দিয়েছেন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও তাঁর স্ত্রী। তাঁরা নাদিমকে গাজীপুর থেকে সীতাকুণ্ডে এনে একজন সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে বিদ্যালয়ে ভর্তি করান। যা এলাকায় ব্যাপক প্রশংসিত হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ সালের দিকে ঢাকার গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলায় সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সীতাকুণ্ডের বর্তমান ইউএনও নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া। সেই সময় একদিন শ্রীপুর উপজেলা পরিষদের চায়ের দোকানের ক্যান্টিনে ৫-৬ বছর বয়সী একটি শিশুকে কাজ করতে দেখেন তিনি। যে বয়সে শিশুরা স্কুলে যায়, সহপাঠীদের সাথে খেলাধুলা হৈ হুল্লোড়ে সময় কাটায় সেই বয়সী একটি শিশুকে চায়ের দোকানে কাজ করতে দেখে মর্মাহত হন তিনি।

এক পর্যায়ে শিশুটিকে কাছে ডেকে কথা বলেন। এ সময় জানতে পারেন শিশু নাদিমের জীবনের করুণ ট্র্যাজেডি। শিশুটি তাঁকে জানায়, তাদের বাড়ি ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলায়। সে ওই এলাকার মো. এমদাদুল হক ও মোছামৎ তাসলিমার ছেলে। জম্মের পরপরই নাদিমের মা মারা যান। বাবার দ্বিতীয় সংসার আছে। তিনি দরিদ্র হওয়ায় সংসারের সবার মুখে খাবার তুলে দিতে পারেন না। তাই এই বয়সে সংসার বাঁচাতে তাকেও চায়ের দোকানে কাজে যোগ দিতে হয়েছে।

বয়স অল্প হলেও হতভাগ্য শিশু নাদিমের মাথার ওপর চেপে বসা সংসারের বোঝা পীড়া দেয় নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়াকে। তিনি সিদ্ধান্ত নেন যেকোনোভাবে ছেলেটিকে একটি সুন্দর জীবন উপহার দিতে হবে। যাতে সমাজের আর পাঁচজনের মতো সেও মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে। সেদিন ঘরে ফিরে স্ত্রী নাদিয়া আহমেদের সঙ্গে বিষয়টি আলাপ করেন। সব শুনে আগ্রহী হয়ে উঠেন তিনিও। নাদিমের বিষয়টি পরে নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া নিয়ে তার বাবার সঙ্গে কথা বলেন। তাঁকে বলেন, যদি তিনি চান তাহলে নাদিমকে তিনি নিজে নিয়ে গিয়ে নিজ বাড়িতে রেখে পড়াশোনা করাবেন। তার খাওয়া-দাওয়া, পড়াশোনাসহ যাবতীয় খরচ তিনিই বহন করবেন। এসব শুনে রাজি হয়ে যান নাদিমের বাবা। এরপর শুরু হয় নাদিমের নতুন জীবন। প্রথম দিকে ঘরে ইউএনওর স্ত্রী নাদিয়া নিজেই পড়াতে থাকেন তাকে। পরে প্রাইভেট শিক্ষক রেখে তাকে অক্ষরজ্ঞান শিক্ষা দিতে থাকেন তাঁরা। বর্ণ পরিচয় শেষ করে তার নাম পরিচয় লেখা, বর্ণ লেখা, প্রাথমিক অংক শেখার পর গতবছর নাদিমকে সীতাকুণ্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়।

এদিকে চায়ের দোকান থেকে এনে একটি ছেলের উজ্জ্বল ভবিষ্যত তৈরির লক্ষ্যে ইউএনও পরিবারের এ উদ্যোগে মুগ্ধ সীতাকুণ্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। উচ্ছ্বসিত নাদিমও। আলাপকালে সে জানায়, জম্মের পরেই তার মা মারা যান। সৎ মা আছেন। সংসারে অভাব অনটন লেগে ছিল। তাই বাবাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে চায়ের দোকানের ক্যান্টিনে কাজ করত সে। তবে অন্য ছেলেরা যখন স্কুলে যেত তার মন খারাপ হয়ে যেত। একদিন ইউএনও নাজমুল ইসলাম তাকে নিয়ে আসেন। তিনি অফিসের কাজে বাইরে থাকেন বেশি। তাঁর স্ত্রী নাদিয়া আহমেদ তাকে সার্বিক সহযোগিতা করেন। এমনকি স্কুলে অভিভাবক হিসেবেও আছে নাদিয়া আহমেদের নাম। তারা পড়ার সুযোগ দেওয়ায় খুব খুশি সে।

জানতে চাইলে ইউএনও নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়ার স্ত্রী নাদিয়া আহমেদ বলেন, ‘নাদিমকে আমাদের ঘরে আনার পর তার মধ্যে পড়াশোনার অনেক আগ্রহ দেখি। তাই আমিই তাকে পড়াতে থাকি। মাসে ২ হাজার টাকা বেতনে প্রাইভেট মাস্টার রেখে প্রাথমিক পাঠ শেষ করে গত বছর দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি করাই।’

উপজেলা নির্বাহী অফিসার নাজমুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘গত বছর দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার পর ভালোভাবে পাস করে এবার সে তৃতীয় শ্রেণিতে ওঠেছে। ছেলেটির জীবন সুন্দর ও আলোকিত হোক এটাই আমার চাওয়া। এ জন্য আমার যেমন আন্তরিকতা আছে তাঁর চেয়েও বেশি আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করছে আমার স্ত্রী।’

নাদিমের স্কুল সীতাকুণ্ড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নুর নাহার বেগম রিনা বলেন, ‘নাদিমকে এখানে ভর্তি করানোয় আমি বেশ খুশি। ঝরে পড়া একটা শিশু নতুন করে আলোর পথে ফিরল এর চেয়ে বড় আর কি হতে পারে। সমাজের সবার এভাবে এগিয়ে আসা উচিত।’

এদিকে চায়ের দোকান থেকে নিয়ে এসে নাদিমকে স্কুলে ভর্তি করানোয় ইউএনওর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান নাদিমের নানা রমজান আলী। তিনি বলেন, ‘তিনি যে তাকে শুধু স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন তা-ই নয়। নিয়মিত নাদিমের পরিবারের খোঁজ-খবর নেন এবং তাদেরকে নানাভাবে সহযোগিতা করেন। তা না হলে দরিদ্র নাদিম কোনোদিনই আলোর পথ দেখত না।’



মন্তব্য