kalerkantho

পাহাড়কাটা থামছেই না

ছোটন কান্তি নাথ, চকরিয়া (কক্সবাজার)   

১৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



পাহাড়কাটা থামছেই না

কক্সবাজারের চকরিয়ায় কোনো অবস্থাতেই থামছে না পাহাড়কাটা। প্রতিনিয়ত উপজেলার বিভিন্ন স্থানে অব্যাহত রয়েছে পাহাড়কাটা। বন বিভাগ মাঝে-মধ্যে পাহাড়কাটা রোধে পাহাড়খেকোদের বিরুদ্ধে লোকদেখানো অভিযানের নামে তৎপরতা চালালেও তা কোনো কাজে আসছে না। বরং আরো বেপরোয়াভাব নিয়ে পাহাড়খেকোরা নির্বিচারে পাহাড়কেটে ডাম্পারভর্তি করে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে মোটা অংকের টাকা হাতাচ্ছে। বিশেষ করে উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়ন ও ফাঁসিয়াখালী উচিতার বিল মৌজার দিনরাত সমানে দেদার কাটা হচ্ছে পাহাড়।

অভিযোগে জানা গেছে, বন বিভাগের মালিকানাধীন সংরক্ষিত বনে অসংখ্য পাহাড়কেটে ডাম্পার ভর্তি করে বিক্রি করা হচ্ছে বছরের পর বছর ধরে। ইতোমধ্যে সংরক্ষিত বনের কয়েক একরেরও বেশি পাহাড়কেটে ফেলা হয়েছে। এভাবে সংঘবদ্ধ চক্রটি লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু জনবলের অভাব এবং প্রভাবশালীরা এসব মাটি বিক্রিতে জড়িত থাকার দোহাই দিয়ে এক প্রকার কুম্ভকর্ণের ভূমিকায় অবতীর্ণ রয়েছেন বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্তারা। এতে প্রতিনিয়ত সংরক্ষিত বনের পাহাড়কাটা প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে অব্যাহত রয়েছে।

খুটাখালী ইউনিয়নের পূর্ব নতুন পাড়ার সচেতন বাসিন্দারা অভিযোগ করেছেন, চকরিয়ার খুটাখালীর পূর্ব নতুন পাড়া এলাকায় ভয়াবহ পাহাড়কাটার ঘটনা ঘটছে।

বন বিভাগের সংরক্ষিত বনে এভাবে পাহাড়কাটার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। সেভ দ্য নেচার অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আ ন ম মোয়াজ্জেম হোসেন রিয়াদ বলেন, ‘প্রকাশ্যে কয়েক বছর ধরে খুটাখালীতে পাহাড়কাটা চলতে থাকলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না বন বিভাগ ও পরিবেশ অধিদপ্তর।’

তিনি বলেন, ‘সরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা অপরাধ বন্ধ না করে শুধু দায়সারা বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। যার কারণে পাহাড়কাটা কিছুতেই থামছে না।

দ্রুত এসব পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ড বন্ধের বিরুদ্ধে প্রয়োজনে আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের ফুলছড়ি রেঞ্জের ফুলছড়ি বনবিটের আওতায় থাকা পূর্ব নতুন পাড়া এলাকায় সংরক্ষিত বনে পাহাড়কাটা চলছে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা একাধিক ডাম্পার দিয়ে পাহাড়ের মাটি কেটে বিক্রি করে যাচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে কিছু অসাধু বন কর্মকর্তা নেপথ্যে পাহাড়কাটায় সহায়তা করেন বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। যার কারণে বছরের পর বছর ধরে পাহাড়কাটা হলেও এসব বন্ধ হচ্ছে না।

সূত্র আরো জানায়, স্থানীয় বন কর্মকর্তারা দায় এড়াতে একটি বন মামলা এবং বিভিন্ন দপ্তরে কয়েকটি চিঠি চালাচালি করেই চুপ থাকেন। এর মধ্যেই চলে সমানতালে পাহাড়কাটা। আর এসব বিষয়ে কথা ওঠলেই বলা হয়, জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে, জনবল না থাকায় পাহাড়কাটা বন্ধ করা যাচ্ছে না, জড়িতরা প্রভাবশালী হওয়ায় ভয়ে কিছু করা যাচ্ছে না বলে নানা অজুহাত দেখান সংশ্লিষ্টরা। এসব কথা বলেই পাহাড়কাটা ও বনভূমি দখলের মতো ঘটনা এড়িয়ে যাচ্ছেন খোদ বন কর্মকর্তারা।

কিন্তু স্থানীয় লোকজন ও পরিবেশবাদীরা বলছেন ভিন্ন কথা। তাঁরা বলেন, সরকারি লোকজন আন্তরিকভাবে চাইলে পারে না এমন কোনো কাজ নেই। এক্ষেত্রে স্থানীয় বন কর্মকর্তারা যদি পাহাড়কাটা বন্ধ করতে না পারেন তাহলে তারা খবর দিলেই তো বিশেষ টহল দলের লোকজন গিয়ে মাটিসহ গাড়ি জব্দ করতে পারে। পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও তাঁরা বিষয়টি জানাতে পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রেও তাঁরা চুপ থাকছেন। যার কারণে পাহাড় ও বনভূমি রক্ষা করা যাচ্ছে না।

একইভাবে ফাঁসিয়াখালী রেঞ্জের ফাঁসিয়াখালী বনবিটের উচিতার মৌজায়ও সংরক্ষিত বনভূমির অসংখ্য পাহাড় কেটে প্রতিনিয়ত মাটি বিক্রি করছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। যারা পাহাড়কাটার সঙ্গে জড়িত রয়েছে এখানে তারা এলাকায় বেশ প্রতাপশালী। তাই বন বিভাগের লোকজন প্রতাপশালীদের তৎপরতার মুখে অনেকটা পা ভাঙা মুরগির মতোই অসহায়।

যোগাযোগ করা হলে খুটাখালীর পূর্ব নতুন পাড়ায় পাহাড়কাটার বিষয়েও স্থানীয় বনবিট কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, ‘পাহাড়কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। তারা খুবই প্রভাবশালী। যার কারণে পাহাড় কাটা বন্ধ করা যাচ্ছে না।’

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ফুলছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘যারা পাহাড় কাটছে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। আমি নিজেও থানায় একাধিকবার গিয়ে ওসিকে অনুরোধ করেছি পরিবেশ বিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা নিতে। ওসি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন পাহাড়কাটায়

যারা জড়িত রয়েছে তাদেরকে শিগগিরই গ্রেপ্তার করা হবে।’

একই প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজারের সহকারী পরিচালক সাইফুল আশ্রাব সাংবাদিকদের বলেন, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে পাহাড়কাটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কক্সবাজার উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা হক মাহবুব মোর্শেদও সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইতোমধ্যেই ঘটনাস্থলে বন বিভাগের একটি দল পাঠানো হয়েছে। যারা পাহাড়কাটার সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এমনকি বন বিভাগের কোনো কর্মকর্তার গাফিলতি থাকলে তদন্ত করে দেখা হবে।’



মন্তব্য