kalerkantho


নাচে-গানে জনপ্রিয় তিন মুখ

সৌমিত্র চক্রবর্তী, সীতাকুণ্ড   

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



মুনমুন, সাথী ও স্মৃতা। সীতাকুণ্ডের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের তিন উজ্জ্বল নক্ষত্র। এ তিন শিল্পীর মধ্যে একটি বিষয়ে চমৎকার মিল। তা হলো তিনজনই নাচ ও গানে সমান দক্ষ। দীর্ঘদিন ধরে নিজ এলাকা ও আশপাশের জেলা-উপজেলাতে পারফর্ম করেছেন তাঁরা। এখন নতুন প্রজন্মকে শেখাচ্ছেন নাচ-গান। বিগত কয়েক বছরে তাঁদের হাত ধরে সীতাকুণ্ডের সাংস্কৃতিক অঙ্গন আলোকিত করেছেন বহু শিল্পী। যা দেখে এগিয়ে আসছেন আরো অনেকে।

শিল্পী মুনমুন ভট্টাচার্য সীতাকুণ্ড পৌরসদরের প্রেমতলা গ্রামের নান্টু বণিক ও পাখি বণিকের মেয়ে। ৮ বছর আগে তাঁর বিয়ে হয় মধ্যম মহাদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা যন্ত্রশিল্পী সমীরণ ভট্টাচার্যের সঙ্গে। সংসারে রয়েছে এক ছেলে। এই শিল্পী জানান, তাঁর বয়স যখন ৬-৭ বছর তখন থেকে নাচ শেখার মধ্য দিয়ে তাঁর সংস্কৃতির জগতে প্রবেশ। সেই সময় সীতাকুণ্ড সংগীত একাডেমির নৃত্যশিল্পী মো. শাওনের কাছে হাতেখড়ি হয়। তারপর ওই প্রতিষ্ঠানের হয়ে সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিয়মিত নৃত্য পরিবেশন করতে করতে পরিচিতি লাভের পাশাপাশি শুরু হয় গানের চর্চাও। পরে সব ধরনের গান ও নাচ দুই বিভাগেই সমান দক্ষ হয়ে উঠলে চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ডাক আসতে থাকে। এভাবেই অসংখ্য অনুষ্ঠানে নাচ ও গান করে সবার হৃদয় জয় করেন তিনি।

সেই ছোটবেলা থেকে বহু পুরস্কার বিজয়ী মুনমুন এখন নাচ ও গানের শিক্ষক। ভাটিয়ারী বিএমএ এলাকায় দুটি স্কুলে নাচ-গান শেখান তিনি। নাচ ও গান দেখে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি (বিএমএ) কর্তৃপক্ষ তাঁকে পুরস্কৃতও করেছেন। তবে তিনি সবচেয়ে বেশি সময় দেন নিজ এলাকায়। গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে এখানে মেঘমল্লার খেলাঘর আসরের নিয়মিত শিক্ষক হিসেবে দায়িত্বে আছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে তাঁর কাছ থেকে অসংখ্য শিল্পী নাচ, গান শিখে সীতাকুণ্ডের সর্বত্র আলো ছড়াচ্ছেন।

মুনমুন জানালেন, স্বামী-সন্তানের সংসার সামলেও তিনি এ জগতে আছেন নিয়মিত। স্বামী সমীরণ নিজেও যন্ত্রশিল্পী। তাই তাঁর সাথে বোঝাপড়াটা ভালোই। তিনি যথেষ্ট সাপোর্ট দেওয়ায় নাচ-গান চালিয়ে যেতে পারছেন। নাচে দীর্ঘদিন ধরে মঞ্চ কাঁপালেও এখন তিনি মঞ্চে নিজে নাচ করেন না, গান করেন নিয়মিত। তবে তাঁর প্রতিচ্ছ্ববি ভেসে উঠে ছাত্রীদের মাঝে। একজন ছাত্রী যখন ভালো পারফর্ম করে সবাই নাচ-গানের প্রশংসা করে তখই তিনি নিজেকে সার্থক মনে করেন।

শিল্পী মুনমুনের স্বামী যন্ত্রশিল্পী সমীরণ ভট্টাচার্য বলেন, ‘মুনমুন নৃত্যের মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক জগতে পদার্পণ করলেও এখন সে গানের শিল্পী হিসেবে অধিক পরিচিত। তার মাধ্যমে অনেক ছেলে মেয়ে নাচ-গান শিখে সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করছে। এ কারণে আমি তাকে সবসময় উৎসাহিত করছি। সে আরো অনেক দূর এগিয়ে যাক এটাই আমি চাই।’

মুনমুন একজন অসাধারণ শিল্পী উল্লেখ করে ভূয়সী প্রশংসা করেন মেঘমল্লার খেলাঘর আসর, সীতাকুণ্ড শাখার সাধারণ সম্পাদক সুজিত পাল। তিনি বলেন, ‘মুনমুন অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন শিল্পী। সে মেঘমল্লার খেলাঘর আসরের শিশু-কিশোরদের যেভাবে নাচ-গান শিখিয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে আলোকিত করছে তাতে আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ। তার উত্তরোত্তর সমৃদ্ধি কামনা করছি আমি।’

মুনমুনের মতোই সীতাকুণ্ডের নৃত্যশিল্পীদের আলো দেখাচ্ছেন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রিয় মুখ পৌরসদর মধ্যম মহাদেবপুর গ্রামের এম গোলাম মাওলা ও মাহফুজা মাওলা লাকীর মেয়ে ফিরোজা আক্তার সাথী। ২০০১ সালে সাত বছর বয়সে সীতাকুণ্ড সংগীত একাডেমির শিক্ষক মো. আজম উদ্দিনের কাছে ক্লাসিক্যাল ও কত্থক নৃত্য শেখার মধ্য দিয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আসেন তিনি। ধীরে ধীরে নাচে দক্ষতা অর্জনের পর সংগীত একাডেমি, শৈল্পিক, সীতাকুণ্ড বালিকা বিদ্যালয়, আলপনা সংগীত একাডেমিসহ বিভিন্ন সংগঠনের হয়ে স্থানীয় মঞ্চ, চট্টগ্রাম টেলিভিশন, চট্টগ্রামের ডিসি হিলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ অনেক মঞ্চে নৃত্য পরিবেশন করে সুনাম কুড়ান তিনি। নৃত্যশিক্ষা গ্রহণ করেন চট্টগ্রাম শিল্পকলা একাডেমির শিক্ষিকা প্রমা আবন্তীর কাছে। বর্তমানে সাথী একজন দক্ষ নৃত্যশিল্পী হিসেবে অনেককে নাচ শেখাচ্ছেন। উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি, আলপনা সংগীত একাডেমি, চট্টগ্রামের ইউনাইটেড রেসিডেন্সিয়াল স্কুলসহ বিভিন্ন সংগঠনের ছাত্র-ছাত্রীদের নাচ শেখাচ্ছেন তিনি। তাঁর অনেক ছাত্রী নৃত্য পরিবেশন করে সুনাম কুড়িয়েছেন। এঁদের মধ্যে অন্যতম ঐশী, শ্রামান্তা, প্রিমা, মীম, সৃষ্টি, কথা ও হুমায়রা। ঐশী মল্লিক আলপনা সঙ্গীত একাডেমিতে নাচও শেখাচ্ছেন। সাথীর হাত ধরে এভাবেই অনেক নৃত্যশিল্পী সীতাকুণ্ডের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন।

নাচে ব্যাপক সুনাম কুড়ালেও গানেও কম যান না সাথী। তিনি জানান, নাচের পাশাপাশি আধুনিক, পল্লীগীতি ও চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানও করেন। এভাবে সঙ্গীতাঙ্গনে সুনাম কুড়ানোর পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছেন তাঁর মা মাহফুজা মাওলা লাকী। তিনি অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে সাথীকে নাচ-গান শিখিয়েছেন। যা তাঁর মনোবলকে দৃঢ় করেছে। আর সুদীর্ঘ এ পথচলায় তাঁকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন সীতাকুণ্ডের সংগীত গুরু প্রদীপ ভট্টাচার্য, মো. হাশেম ও সাংবাদিক শেখ সালাউদ্দিন। তাঁরা নিজেরা অনেক মঞ্চে তাঁকে সুযোগ করে দেওয়াসহ নানাভাবে উৎসাহিত করায় তিনি এ পর্যন্ত আসতে পেরেছেন বলে জানান।

মুনমুন ও সাথীর পরের প্রজম্ম হিসেবে গান ও নাচে আলো ছড়াচ্ছেন সীতাকুণ্ডের দাশপাড়া গ্রামের সমীর সেনগুপ্তা ও উত্তরা সেনগুপ্তার মেয়ে স্মৃতা সেনগুপ্তা তুষিও। ৬ বছর বয়সে সীতাকুণ্ডের সাংস্কৃতিক সংগঠন মুকুল ফৌজে শিক্ষক সাগর সেনের কাছে নাচ ও শিল্পী উত্তরা আচার্যের গান শিক্ষা দিয়ে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে আসেন তিনি। এরপর মুকুল ফৌজের শিক্ষক সাগর সেন তাকে সীতাকুণ্ড, চট্টগ্রামের জেএম সেন হল, মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জসহ নানা মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ করে দেন। পরে সীতাকুণ্ডে কিছু কিছু অনুষ্ঠানে নাচ-গান করলেও বিভিন্ন মাধ্যমে মিরসরাইয়ের সাংস্কৃতিক জগতের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের কারণে সেখানেই প্রতিষ্ঠিত হতে থাকেন তিনি। মিরসরাইতে তাঁর সংস্কৃতিচর্চা আরো বেড়ে যায় নিজামপুর কলেজে ভর্তি হওয়ার পর। বর্তমানে বিবিএ সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী তুষি নিজামপুর সাংস্কৃতিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই সুবাদে সেখানেই নিয়মিত অনুষ্ঠান করছেন। বহুবার নাচ, গান উভয় বিভাগেই প্রথম হয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। ফলে সেখানে অনুষ্ঠানের চাপ ক্রমশ বাড়তে থাকে। নিজামপুর কলেজের প্রতিটি অনুষ্ঠান, জোরারগঞ্জ মেলাসহ এ উপজেলার বিভিন্ন প্রান্তের সব অনুষ্ঠানে নাচ-গান করতে হয় তাঁকে। এ শিল্পী জানান, বিবিএতে উঠার পর থেকে নৃত্য পরিবেশন কমিয়ে দিয়ে অনেককে নাচ শেখাচ্ছেন। কিন্তু গান করছেন নিয়মিতই। সীতাকুণ্ডের সুরাঙ্গন খেলাঘর ও প্রেমতলার এভারগ্রিন স্কুলেও ন নাচ-গান শিখিয়েছেন। এখন তাঁর বাড়িতে এসেও অনেকে নাচ শিখছে।

তুষি জানান, ঠাকুম্মা (বাবার মা) মীরা সেনগুপ্তার আগ্রহেই তিনি সাংস্কৃতিক জগতে আসেন। শুরু থেকে তিনি তাঁকে দারুণ উৎসাহ দিয়েছেন। পরে তাঁর মা-বাবাও তাঁকে সবসময় এগিয়ে যেতে প্রেরণা দিয়েছেন। তুষি নাচের পাশাপাশি গানে আসেন শিল্পী বিজন নন্দীর কাছে গান শিখে। এখন নাচ-গান উভয় বিভাগেই সমান পারদর্শী তিনি। এ কারণে মিরসরাইয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ব্যস্ত সময় কাটছে তাঁর। সম্প্রতি মিরসরাইয়ে দৈনিক যুগান্তর স্বজন সমাবেশ উপলক্ষে আয়োজিত হৈমন্তী সাহিত্য আসরে নাচ-গানেও প্রথম হন তিনি। সংস্কৃতিচর্চার প্রতি আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে ইতোমধ্যে সুপরিচিতি লাভ করা তুষি বলেন, ‘নাচ ও গানকে সঙ্গী করেই এগিয়ে যেতে চাই। এখন নিজে পারফর্ম করার পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের অনেককেই শেখাচ্ছি। তারা যদি সবার কাছে সুনাম কুড়ায় তবেই আমার চেষ্টা সার্থক হবে।’

তুষির বিষয়ে বলতে গিয়ে যুগান্তর স্বজন সমাবেশের হৈমন্তী সাহিত্য আসরের আয়োজক মিরসরাইয়ের সাংবাদিক পলাশ মাহবুব বলেন, ‘তুষি দারুণ সম্ভাবনাময় এক শিল্পী। নিজামপুর কলেজে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তার পারফরমেন্স দেখে আমরা সবাই মুগ্ধ হই। এখন আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের একজন সে। আমার বিশ্বাস সে আরো অনেক দূর এগিয়ে যাবে। সীতাকুণ্ড উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক সঙ্গীন গুরু প্রদীপ ভট্টাচার্য বলেন, এদের পারফরমেন্স খুবই ভালো। কিন্তু বাইরে অনুষ্ঠান করতে গিয়ে এলাকায় অনিয়মিত হয়ে পড়ছে তাঁরা। ওরা যদি নাচ-গান চালিয়ে যায় তাহলে অনেক দূর এগিয়ে যেতে পারবে বলে আমি মনে করি।’

 


মন্তব্য