kalerkantho


টুকরি বানিয়ে লেখাপড়ার খরচ চালায় প্রতিবন্ধী রুমা

জীবনযুদ্ধে হার মানেনি রুমা। সব বাধা অতিক্রম করে ভাগ্য উন্নয়নে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে। নিজের দুটি হাত সচল রেখেছে বাঁশ বেতের সংমিশ্রণে টুকরি তৈরিতে। প্রতিবন্ধী ও বেকার নারীদের জন্য রুমা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। রাঙ্গুনিয়ার পোমরা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির ছাত্রী সে। প্রতিবেদনে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন : জিগারুল ইসলাম, রাঙ্গুনিয়া

৩ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



টুকরি বানিয়ে লেখাপড়ার

খরচ চালায়

প্রতিবন্ধী রুমা

তিন মাস বয়সে দোলনা থেকে পড়ে ডান পায়ের হাঁটুতে ব্যথা পায় রুমা আকতার। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পা অকেজো হয়ে যায়। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটলেও হাঁটু থেকে ডান পা বাঁকাতে পারে না। পা সোজা করে রাখতে হয় সবসময়। দৈনন্দিন চলাফেরা ও স্কুলে যাতায়াতে তাকে ভীষণ কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করতে হয়।

বাড়ি থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ হেঁটে স্কুলে যেতে হয় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। আবার পাহাড় চূড়ায় অবস্থিত বিদ্যালয়টির শতাধিক সিঁড়ি মাড়াতে হয় তাকে। এ যেন এক কষ্টের নরক যন্ত্রণা! দারিদ্র্যতাযুক্ত পরিবারের মেয়ে রুমাকে পড়ালেখার খরচ জোগাতে হয় মায়ের সাথে বাঁশ-বেত দিয়ে টুকরি তৈরি করে। টুকরিতেই তাদের অন্ন জোগানোর ভাগ্য নির্ধারিত।

তবে জীবনযুদ্ধে হার মানেনি রুমা। সব বাধা অতিক্রম করে নিজের ভাগ্য উন্নয়নে পড়ালেখা চালিয়ে যাচ্ছে সে। আর সমাজের অসহায় মানুষের মনে প্রেরণা জোগাতে নিজের দুটি হাতকে সচল রেখেছে বাঁশ বেতের সংমিশ্রণে টুকরি তৈরিতে। প্রতিবন্ধী ও বেকার নারীদের জন্য রুমা এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। ইচ্ছা শক্তির জোরে রুমা আকতার রাঙ্গুনিয়ার পোমরা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির ছাত্রী। মায়ের সাথে টুকরি বানিয়ে সে লেখাপড়ার খরচ চালায়।

সম্প্রতি রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের মধ্যম নোয়াগাঁও তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, উঠানে মায়ের সাথে টুকরি বানাচ্ছে রুমা। সকাল থেকে দুটি টুকরি বানিয়েছে। প্রতিদিন গড়ে সে চারটি টুকরি বানায়।

জানতে চাইলে রুমা আকতার (১৭) জানায়, ছোট বয়সে বাবা জালাল উদ্দিন তাদের ছেড়ে চলে যান। তাঁর কোনো খোঁজ-খবর নেই। তিন বোনের মধ্যে সে মেজ। অভাব অনটনের সংসারে এক বেলা খাবার জোটে তো অন্য বেলা জোটে না। মায়ের কষ্ট দেখে মাকে সাহায্য করতে গিয়ে সে টুকরি বানানো শিখেছে। ৯ বছর বয়স থেকে সে টুকরি বানায়। পাশাপাশি লেখাপড়াও চালিয়ে যাচ্ছে। তাঁর আয় থেকে চলে পড়ালেখার খরচ। এখন সে পোমরা উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির ছাত্রী। পড়ালেখায় এতোদূর আসার পেছনে তাঁর মা ও বেসরকারি সংস্থা এওয়াক সহযোগিতা করেছে। বড় হয়ে সে উচ্চতর শিক্ষা অর্জন করতে চায় বলে জানান।

রুমার মা ফাতেমা বেগম বলেন, ‘৩ মেয়ের মধ্যে রুমা পড়ালেখায় ভালো বলেই তাঁকে স্কুলে দেওয়া হয়েছে। বড় মেয়ে তেমন পড়ালেখা করেনি। তাঁকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে। ছোট মেয়ে ৭ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিল। টাকার অভাবে আর পড়ালেখা করাতে পারছে না। রুমা নিজে টুকরি বানিয়ে পড়ালেখার খরচ চালায়। পড়ালেখার জন্য সে অবসর পেলেই টুকরি তৈরিতে হাত চালায়।’ মেয়ের ভবিষ্যতের জন্য কষ্ট হলেও তার পড়ালেখা চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়েছেন ফাতেমা বেগম।

এওয়াকের সমন্বয়কারী সমীর বড়ুয়া শিমুল বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের সহায়তায় এওয়াক সবসময় পাশে আছে।

রুমার পড়ালেখার আগ্রহ দেখে তাকে শিক্ষা উপকরণ দিয়ে সহায়তা করা হয়। তার পড়ালেখা চালিয়ে যাওয়ার জন্য তার মাকে উৎসাহ দিচ্ছি আমরা।’ ভবিষ্যতেও এওয়াক রুমার পাশে থাকবে বলে তিনি জানান। 

রাঙ্গুানিয়া পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘এলাকায় কোটার চেয়ে বেশি প্রতিবন্ধী থাকায় সবাইকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। রুমার ব্যাপারে সমাজসেবা অফিসে তাগাদা দেওয়া হয়েছে। দ্রুত সে প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় আসবে।’ তবে প্রতিবন্ধী রুমাকে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সোর্স থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

পোমরা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তৌহিদুল ইসলাম টিপু বলেন, ‘রুমা প্রতিবন্ধিতাকে জয় করে একজন মেধাবী ছাত্রী হিসেবে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবন্ধিতা কোনো সমস্যা নয়। সবার সহযোগিতা পেলে যে কেউই ভালো করবে। এখন দেশের অনেক কিছু বদলে গেছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য অনেক সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এওয়াকের প্রধান

নির্বাহী শফিউল আজম সিরাজী বলেন, ‘শিশুদের আমাদের বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা দিতে হবে। বিষয়টা যখন চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলাম। তাদের সমাজে মেশাতে হবে। তখন এই শিশুদের নিয়ে আমরা মাঠে যেতে পারতাম না। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এই পর্যন্ত এসেছি। এনজিওর মাধ্যমে ট্রেনিং নিয়ে অনেকে বিভিন্ন ব্যবসায় যুক্ত হয়েছে। আমরা চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে স্পেশাল এডুকেশনের শিশুদের সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলেছি।’

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের

সহায়তায় সরকার সব সময় কাজ করছে। প্রতিবন্ধীদের প্রতিমাসে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। তাঁদের জন্য বিনা মূল্যে থেরাপি সেন্টার খোলা হয়েছে।

টুকরি বানিয়ে লেখাপড়ার খরচ চালানো কষ্টসাধ্য ব্যাপার।’

রুমা প্রতিবন্ধীদের জন্য দৃষ্টান্ত বলে তিনি জানান।



মন্তব্য